হিমালয়ের অন্যান্য জনপদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এই আলমোড়া
রবীন্দ্রনাথ নাকি এখানে এসে দু’ঘণ্টা কোনও কথা বলেননি। দুর্গম পথের ভয় আর সৌন্দর্য দেখে এখনো বাকরোধ হয় অনেক পর্যটকের। রবীন্দ্রনাথ থেকে বিবেকানন্দ – সবার সৃষ্টিকর্ম আর তপস্যার ভিতর ছড়িয়ে আছে আলমোড়া নামক অতুলনীয় পার্বত্য জনপদটির অনেক স্মৃতি, অনেক গল্প। চির-দেবদারুর ছায়া আর মেঘ-কুয়াশায় মাখা এই শহরটির নীল আকাশপটে হিমালয়ের তুষারধবল পর্বতশৃঙ্গের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখার টানেই এখানে ছুটে আসেন পর্যটকেরা। কাশ্মীর থেকে আসাম পর্যন্ত সুবিস্তৃত হিমালয়ের কোনো অংশে এত ক্ষুদ্র পরিসীমার মধ্যে একসঙ্গে এত তুষারধবল গিরিশৃঙ্গ একসঙ্গে দেখা যায় না। পশ্চিমের যমুনা পর্বত বা বন্দরপুঞ্চ থেকে তুষারধবল এই পর্বতশৃঙ্গগুলিকে দেখে এক জার্মান অভিযাত্রী নাম রেখেছিলেন ‘দেবতাদের সিংহাসন’। শ্রীকান্ত, গঙ্গোত্রী, কেদারনাথ, বদ্রীনাথ, শতোপন্থ, কামেথ, দ্রোণগিরি, নন্দাদেবী, ত্রিশূল, নন্দকোট, পঞ্চশূল- পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে একই ফ্রেমের মধ্যে এতগুলি পর্বতশৃঙ্গ দেখলে চাইলে আলমোড়াই ভরসা। ইদানিং গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর দাপটে প্রতিবেশী দুই হিলস্টেশন নৈনিতাল আর কৌশানী এই ব্যাপারে আলমোড়ার চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে।
প্রাচীনত্বের গন্ধ মাখা রাস্তাঘাট, কূমায়ুনি ঐতিহ্যের কাঠের ঘর, অজস্র মন্দির আর হরেক জিনিসে সাজানো মস্ত বাজার – কূমায়ুনের অন্যান্য শহরের চেয়ে আলমোড়া বহুগুণ এগিয়ে। হিমালয়ের অন্যান্য জনপদের চেয়ে তার খাবারের স্বাদও অনেক এগিয়ে। সে জলখাবারের পরোটা-পকোড়াই হোক বা মান্ডোয়ার ক্ষীর বা শাল পাতায় মোড়া শিঙ্গোরি। মানুষের ভিড়ে ঠাসা বাজারের পথের দু’ধারে রঙ-বেরঙের শাল-চাদর-সোয়েটার দেখতে দেখতে, কাফল-আরু-অ্যাপ্রিকট-আখরোটের দরদাম করতে করতে দীর্ঘ পথ আর ফুরোয় না। সরকারি কিছু কাজ নিয়ে এসেছি। তাই থাকার ব্যবস্থা হয়েছে আলমোড়া রাজবাড়িতে। বর্তমানে এটি সার্কিট হাউস। তার ঘরে ঘরে ঐতিহ্য আর বৈভবের ছড়াছড়ি। সুবিশাল রাজকীয় আয়নায় উঁকি মারে ইতিহাসের কাহিনি।
আলমোড়া থেকে সামান্য দূরে কাটারমল সূর্যমন্দির
সারাদিন ঘুরেফিরে খিদে পেয়েছিল। প্রাসাদে মেহগনি কাঠের মস্ত টেবিল থাকলেও খাবারের ব্যবস্থা নেই। সুতরাং প্রাসাদ লাগোয়া কেয়ারটেকারের পাথরের ঘরে মাটির উনুন আর কাঠের আগুনে রান্নার ব্যবস্থা হল। সহধর্মিণীর তৎপরতায় মান্ডোয়ার ক্ষীর ভরা পাটিসাপটা হল। আর গাড়োয়ালি কেয়ারটেকারের গান “আচ্ছো রে আচ্ছো”র সঙ্গে বাংলা মিশিয়ে আমি কম্পোজ করলুম “আচ্ছো রে আচ্ছো/কোথায় চলে যাচ্ছো/পয়সা কোথায় পাচ্ছো”। মিশ্র পাহাড়ি আর দরবারি রাগে মেশানো সে গান শুনে কাছেই কোথাও হিমালয়ান হুইসলিং থ্রাস পাখিগুলি ভীত স্বরে ডাকতে শুরু করল।
পরদিন সকালে কোশী-কাটারমল সূর্যমন্দিরের পথে বেরিয়ে পড়লাম। বর্ষার মেঘ দিগন্ত ছেয়ে ফেলেছে। নইলে এ পথে নীল আকাশ জুড়ে পঞ্চচুল্লী পর্বতশৃঙ্গ স্বর্গীয় ছবি এঁকে রাখে। পার্থিব পথ অবশ্য নববর্ষার পরশে ফলে-ফুলে পল্লবিত। আম-ন্যাসপাতি-আঙুর-বেদানার প্রাচুর্যের পাশাপাশি লাউ-কুমড়ো-লালশাক-নটেশাকের বাড়বাড়ন্ত দেখে গ্রাম বাংলার স্মৃতি উঁকি মারে কোথাও। কবে যে ঘরে ফেরা হবে, কে জানে? ধূসর পাথরের আড়াল থেকে সূর্যদেবতা হাসেন। ছোট-বড় অনেক মন্দির অল্প পরিসরে। কালের প্রভাবে ক্ষয় হয়ে গিয়েছে পাথরের স্থাপত্যকর্ম। মন্দিরের বহিরঙ্গের দেবমূর্তিগুলি স্থান পেয়েছে গর্ভগৃহে। তামিলনাড়ুর কুম্ভকোণমের সূর্যনার-কোবিল ছাড়া ভারতের বাকি একুশটি সূর্যমন্দিরের কোথাও সূর্যপূজা হয় না। কিন্তু কাটারমলে দেখলাম মন্দিরগাত্রের বিষ্ণুমূর্তি এবং শিবমূর্তি গর্ভগৃহে নিয়ে গিয়ে পূজা করা হচ্ছে। মন্দিরের মূল দরজার কাছে খুলে ফেলা হয়েছে প্রসাদের দোকানও।
আরও পড়ুন
দিন দুয়েকের ঝালং
মন্দিরের চত্বর থেকে দূরের কোশী নদীর বাঁধ আর নদীর আঁকাবাঁকা পথ দেখতে দেখতে সময় যে কোথা দিয়ে চলে যায়, বোঝা যায় না। আবার গাড়িতে এসে বসি। জাগেশ্বরের পথে যাত্রা শুরু হয়। চির-গাছের অরণ্য ঘেরা মায়াময় এক পথের ধারে চোখে পড়ল প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি ফলক। লাখুডিয়ার গুহা। হিমালয়ের বিশাল শরীরে প্রত্নপ্রস্তরযুগীয় গুহাচিত্রের একমাত্র নিদর্শন এই লাখুডিয়ার। ক্ষীণ কয়েকটি জলধারার পাশে বিশাল এক প্রস্তরখণ্ড পাহাড়ের গায়ে ঝুলে পড়ে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জন্য আশ্রয় তৈরি করে দিয়েছে। আদিম সেই শিল্পীরা অত্যন্ত উজ্জ্বল রঙে এঁকে রেখেছে তাদের প্রাণের কথা। মৃগয়াকাহিনি থেকে জ্যামিতিক বিন্যাসে তারা যেন জীবনজিজ্ঞাসা এঁকেছে অনন্ত আগামীকালের জন্য। যুগযুগান্ত ধরে অপরিসীম উজ্জ্বলতায় অম্লান হয়ে রয়েছে সেই প্রাণের বার্তা। গুহাচিত্রের বয়স প্রায় দশ হাজার বছর। শেষ হিমযুগের অবসানে পৃথিবীর হাওয়া কবোষ্ণ হয়ে উঠতেই আদিম শিল্পীর দল এঁকে ফেলেছিল প্রাচীন এই গুহাচিত্র। বিমূর্ত সেসব ছবির রহস্য উদ্ধার করতে কালঘাম ছুটেছে প্রত্নবিদদের।
প্রত্নযুগীয় শিল্পীর চিত্রকর্মে ভরা লাখুডিয়ার গুহার দেওয়াল
সে ছবির আবেশ চোখে নিয়ে চির-অরণ্যের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলেছি। এত যে রূপময় হিমালয়, তার ভেতরেও এমন ছায়াচ্ছন্ন স্নিগ্ধ মায়ামাখা পথ আর দ্বিতীয়টি আছে কিনা সন্দেহ। দণ্ডেশ্বর মন্দির। ভূমণ্ডলের সবচেয়ে স্নিগ্ধ শিবমন্দির। যত আদিম মহাদ্রুমের শরীর ছোঁয়া আলো-অন্ধকারের স্বর্গীয় মায়াতরঙ্গ ক্ষণে ক্ষণে ছুঁয়ে চলেছে প্রাচীন পাথরের স্থাপত্যগুলিকে। স্নিগ্ধতম এক স্বচ্ছতোয়া বয়ে চলেছে। শান্ত মহাকাল যেন নিয়ে যাচ্ছেন সময়ের বিপরীতে ফুটে ওঠা অন্য এক পাহাড়ি ফুলে ভরা পথে। সামান্য এগোলেই জাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ। পার্বত্য নির্ঝরিণীর পাশে অজস্র স্থাপত্যে ভরা ছোট-বড় অনেক শিবমন্দির। এখানে তীর্থযাত্রীর ভিড় একটু বেশি। পুজো এবং আনুষঙ্গিক পূজাসামগ্রীর কেনাকাটা আর পর্যটকের কোলাহল পেরিয়ে এগিয়ে যেতে হবে পাহাড়ি চড়াই পথে। একই রকম নাগর স্থাপত্যের আরো প্রাচীন এক মন্দির, এর নাম বৃদ্ধ জাগেশ্বর। অতীতে নাকি জাগেশ্বর এখানেই বাস করতেন। পরে কালের প্রভাবে নীচে নেমে আসেন।
জাগেশ্বর থেকে আলমোড়ার পথে চিতই গোলু দেবতার মন্দিরে থামতেই হল। এই অঞ্চলে গোলু দেবতার অত্যন্ত প্রসিদ্ধি। এই দেবতার কাছে যা চাওয়া যায়, তাই নাকি পাওয়া যায়। কাগজে, স্ট্যাম্প পেপারে, চিঠিতে অসংখ্য মনোস্কামনা লিখে ঘণ্টা বেঁধে দিয়ে গিয়েছে ভক্তেরা। কয়েক লক্ষ ঘন্টা আর প্রার্থনাপত্র বাঁধা রয়েছে মন্দিরে। কার ট্রাভেলিং বিল আটকে গিয়েছে, কার চাকরি হয়নি, কার প্রেম ভেঙে গিয়েছে – সব সমস্যা সমাধানের জন্য কাতর প্রার্থনা। হিন্দি-ইংরেজি-কূমায়ুনি-গাড়োয়ালি-গুজরাতি কত ভাষায় মানুষ আবেদন করে গিয়েছে। বাংলা নেই দেখে মনে দুঃখ হল। পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে পরিষ্কার বাংলায় লিখে দিলুম- “জগতের দুঃখ দূর করো, হে গোলু দেবতা, মানুষে-মানুষে হিংসা দূর হোক। বিবেক দাও। সদবুদ্ধি দাও, এই ধরাতল কলঙ্কশূন্য করো”। গৃহিণী মৃদু হাসলেন।
চিতই গোলুদেবতার মন্দিরে অজস্র ঘন্টা ও প্রার্থনাপত্র
পরদিন সকালে আলমোড়া পার হয়ে চললাম বিনসরের অরণ্যে। আলমোড়া থেকেই দৃশ্যমান পঞ্চশূল এপথে আরো নয়নাভিরাম হয়। কিন্তু বর্ষার মেঘ আজকে তা প্রায় অদৃশ্য করে তুলেছে। পাহাড়ি ফুল আর পাখির বৈচিত্র্যে এপথ মনোরম। রাস্তায় কাসারদেবী মন্দিরে নেমে বিবেকানন্দের তপোস্থলের নির্জনতায় বসে থাকা যায় অনেকক্ষণ। এখান থেকে সূর্যাস্তদৃশ্য খুব সুন্দর। অদৃশ্য এক প্রপাতের শব্দ আর পাইন বনের পাহাড়ি শীতল বাতাস তার সঙ্গে থাকবে।
আলমোড়া থেকে বিনসরের পথে
বিনসরের জঙ্গলে জৈববৈচিত্র্য মুগ্ধ করার মতো। চিতাবাঘ, ঘাইমৃগী, চিতল হরিণ, কস্তুরী মৃগ, হিমালয়ান গোরাল, সুমাত্রান সেরাউ, উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি, লাল শিয়াল, হিমালয়ের কালো ভল্লুক এবং আরো বহু বিচিত্র পশুর বাস এই জঙ্গলে। তাদের অনেককে দেখা তো দূর অস্ত, নামই শুনিনি। অজানা পাখির ডাক শুনছি একটানা। টুনটুনি, দোয়েল, বসন্তবৌরি, কাঠঠোকরা, নাটহ্যাচ, টিয়া, ম্যাগপাই, মোনাল, ময়ূর, লাফিং থ্রাশ- এ অরণ্য পাখিদের স্বর্গরাজ্য। ছোট্ট একটা বাইনোকুলার দিয়েই চলতি পথে কত যে পাখি দেখে ফেললাম, তার ইয়ত্তা নেই। লোমওয়ালা একটা শেয়াল নির্ভয়ে বেশ খানিকটা পথ গাড়ির পাশে ছুটে ছুটে চলল। দেখা পেলাম একপাল হরিণেরও। সব দেখেশুনে নিজেকে মাঝে মাঝে রাজা-রাজা মনে হল। আর ঠিক তখনই গাছের ফাঁকে, মেঘের ফাঁকে উঁকি দিল হিমালয়ের রাজমুকুট।