পলাশের নেশায় ভরা অযোধ্যা পাহাড়

প্রকৃতি এখানে মোহময় রূপে সেজে উঠেছে

পুরুলিয়ার নাম করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছোটো-বড়ো টিলা আর পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা লাল মাটির রূপকথা। আদিবাসীরা মনের আনন্দে গান গেয়ে বেড়ান, শহুরে মানুষও সেখানে পৌঁছলে কৃত্রিমতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা খেপা বাউলকে জাগিয়ে তোলেন। কিংবা বলা যায়, পুরুলিয়ার স্বর্গীয় মায়ায় সেই বাউল জেগে ওঠে নিজেরই খেয়ালে। শিমুল-পলাশের জঙ্গল ভেদ করে ঢিমে তালে নদী বয়ে চলেছে, তার জল স্পর্শ করলে শহুরে ক্লেদ দূর হয়ে যায় এক লহমায়। ছৌ-এর আঙ্গিকে ধরা পড়ে জীবনের গূঢ় সত্য।

মহামহীয়ান নিসর্গ 

মার্বেল হ্রদ 

প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান অথবা যেতে চান পিকনিকে, দুয়েরই আদর্শ জায়গা পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়। এই পাহাড় ছোটোনাগপুর মানভূমির অন্তর্গত এবং পূর্বঘাট পর্বতমালার সম্প্রসারিত অংশ। প্রচুর শৃঙ্গ আছে পাহাড়টিতে। তার মধ্যে উচ্চতম হল গোরগাবুরু, মোটামুটি ৮৮৫ মিটার বা প্রায় ২৮০০ ফুট উঁচু। অযোধ্যা পাহাড়ের মাথাটি সমতল, যা হিলটপ নামে পরিচিত। 

পাখি পাহাড় 

বলশালী সৌন্দর্য

প্রস্ফুটিত পলাশ 

যাঁরা পর্বতারোহণ শেখেন, তাঁরাও এই পাহাড়ে যেতে খুব পছন্দ করেন। অযোধ্যা পাহাড়ে ওঠার জন্য অনেকগুলি গ্রাম্য রাস্তা আছে। তবে প্রধান রাস্তা দু’টি। একটি ঝালদা হয়ে, আরেকটি সিকরাবাদ হয়ে। 

রোমাঞ্চকর যাত্রাপথ 

মায়াবী প্রকৃতি 

স্থানীয় লোকেরা বলে থাকেন, ত্রেতাযুগে রামচন্দ্র ও সীতাদেবী বনবাসের সময়ে অযোধ্যা পাহাড়ে এসেছিলেন। সীতাদেবী তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লে রামচন্দ্র তির মেরে মাটির থেকে জল বের করেন। এখনও সেখানে অবিরত জলের ধারা বেরিয়ে আসছে। জায়গাটি সীতাকুণ্ড নামে খ্যাত। এটি আসলে আর্টেজীয় কূপ। তপ্ত গ্রীষ্মকালে আশেপাশের নলকূপ এবং জলের অন্যান্য উৎসগুলি থেকে কখনও কখনও জল মেলে না। কিন্তু হিলটপের কাছে সীতাকুণ্ড থেকে সর্বদাই ঠান্ডা জল পাওয়া যায়। 

রহস্যময়  

রঙিন নিসর্গ 

হিলটপ থেকে প্রকৃতির অসাধারণ দৃশ্য চোখে পড়ে। দেখতে পাবেন পাহাড়ের সারি আর জঙ্গল, তার মধ্যেই একের পর এক আদিবাসী গ্রাম। ময়ূর পাহাড় হিলটপ থেকে খুব দূরে নয়। সেখানে উঠে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন। হনুমান মন্দিরও রয়েছে। 

পাখি পাহাড় দেখতে ভুলবেন না যেন। এই পাহাড়ের গায়ে কলকাতার একদল শিল্পী একঝাঁক উড়ন্ত পাখির ছবি খোদাই করে দিয়েছেন। এই পাহাড় যেন মানুষের মুক্তিকামী সৃজনশীলতার প্রতীক। চড়িদা গ্রামে গিয়ে সংগ্রহ করতে পারেন ছৌ মুখোশ। সুবর্ণরেখা নদীর আপার ড্যাম এবং লোয়ার ড্যাম যেমন দেখবেন, মার্বেল লেকেও ঘুরে আসবেন। পাথরের মাঝখানে স্বচ্ছ টলটলে জলের বিশাল জলাশয়। দেখেই চোখ জুড়িয়ে যাবে। কাছেই রয়েছে বামনি ঝর্না। এছাড়া টুরগা ঝর্না এবং খয়রাবেড়া ড্যামেও যেতে পারেন। 

বামনি ঝর্না 

ফটোগ্রাফির আদর্শ পরিবেশ  

বসন্তকালে যদি অযোধ্যা পাহাড়ে যান, পলাশ এবং শিমুল ফুলের সৌন্দর্য প্রাণ খুলে উপভোগ করতে পারবেন। এছাড়া বর্ষাকাল এবং শীতকালেও আলাদা আলাদা মায়াবী রূপে সেজে ওঠে অযোধ্যা পাহাড়। জংলি পশুপাখিরও দেখা মিলতে পারে এখানে। যাঁরা ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফি ভালোবাসেন, ক্যামেরাবন্দি করার অসংখ্য দৃশ্য পেয়ে যাবেন।

 

অযোধ্যা পাহাড়ের অবস্থান 

কোথায় কোথায় যাবেন
অযোধ্যা পাহাড় থেকেই চলে যাওয়া যায় জয়চণ্ডী পাহাড়, বড়ন্তি, শুশুনিয়া, গড় পঞ্চকোট, ঘাটশিলা প্রভৃতি জায়গায়।
কীভাবে যাবেন
হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে করে গিয়ে আপনাকে নামতে হবে পুরুলিয়া অথবা বরাভূম স্টেশনে। হাওড়া-চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার অথবা রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস ধরতে পারেন। অযোধ্যা পাহাড়ে যাওয়ার দুটি প্রধান রাস্তা। একটি ঝালদা (পুরুলিয়া শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার) হয়ে, আরেকটি সিকরাবাদ (পুরুলিয়া শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার) হয়ে। গাড়ি ভাড়া করে সহজেই যেতে পারবেন। এছাড়া কলকাতার এসপ্ল্যানেড থেকে পুরুলিয়া যাওয়ার বাস ছাড়ে। ইচ্ছে করলে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে সড়কপথে চলে যেতে পারেন। দুর্গাপুর ব্যারেজ পেরিয়ে বাঁকুড়া হয়ে অযোধ্যা পাহাড়।
কোথায় থাকবেন
অযোধ্যা হিলস ফরেস্ট গেস্ট হাউজ কমপ্লেক্সে থেকে অনায়াসে ঘুরতে পারেন চারপাশের জায়গা। যোগাযোগ –
West Bengal Forest Development Corporation Limited
KB 19, Sector 3, Salt Lake
Kolkata 700106
Phone: 033-23350064, +91 7604044479
E-mail: helpdesk@wbfdc.com
এছাড়াও পুরুলিয়া শহরে বেশ কিছু হোটেল এবং রিসর্ট আছে। সেগুলির একটিতেও থাকতে পারেন।
Developed by DXDasia