‘অগ্নিশুদ্ধি’ : কলকাতার পুজো-শিল্প ১

এস বি পার্কের এবারের থিম ‘অগ্নিশুদ্ধি’। প্রধান মাধ্যম হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছে টেরাকোটা-কে

তখন কালী স্টুডিওতে আঁকা হত সঙ্ঘশ্রীর পুজোর সিনারি। চন্দননগর থেকে শ্রীধর দাস আসতেন হাজার বাতির রোশনাই নিয়ে। সময় বদলে যায়। ক্রমে দেবীর এজমালি আলেখ্যতে যুক্ত হয়ে যান হরেক শিল্পী। আর্ট কলেজ থেকে পাশ করার পর শিল্পচর্চার এক অন্যতম ক্ষেত্র বলে গণ্য করে নেন পুজো-মাঠকে। এই কলকাতার পুজো-মাঠের শিল্পধারা নিয়ে বঙ্গদর্শনের ধারাবাহিক ‘কলকাতার পুজো-শিল্প’। পুজো-মাঠের অন্যতম কিছু শিল্পীর দৃশ্যভাষ্য ধরা থাকল এখানে। দেখাই যাক, কলকাতার পুজো, ভিড়ের অভিরুচির উপর নির্ভরশীল নাকি সেই অভিরুচির দিকনিয়ন্ত্রক সে। ঠাকুরপুকুর এস বি পার্কের পুজো নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে লিখছেন শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত।

কলকাতার বারোয়ারি পুজো হয় সাধারণত সরকারি রাস্তায় বা বর্তমান কেতাদুরস্ত নামধারী কোনো পার্কে। হাতে গোনা কয়েকটি সংগঠনের নিজস্ব মাঠ আছে। তা এই ‘এস বি পার্ক’ নামটার ওজন, অক্ষর সংখ্যা যতটা, সে তুলনায় পুজো-ক্ষেত্রর মাপ বেশ ছোট। পুজো-মাঠের কাজে বেশ কতকগুলি ক্ষেত্রর উপর জোর দিতে হয়। যেমন প্রথমেই দেখতে হয় জায়গাটির ভৌগোলিক অবস্থান। জনবহুল অঞ্চলে, অতি ব্যস্ত ডায়মন্ড হারবার রোডের পাশে, মেট্রোরেলের নির্মিয়মাণ উড়ালপুলের পূর্বধারে একখণ্ড জায়গায় এই পুজো শুরু হয় আজ থেকে ৪৭ বছর আগে।

 

আমার দীর্ঘলালিত একটা ইচ্ছা ছিল সে পুজোতে একবছর ধরে একটা কাজ করব মাঠের মাঝে। কিন্তু এই ব্যস্ত শহরের ব্যস্ত মানুষদের সে পরিসরটুকু নেই। তাই এখনও সে ইচ্ছার প্রতি সুবিচার করতে পারিনি। তবে এবছরের কাজটা বেশ বড় আকারের। পুজোতে কলকাতায় যে ধরনের কাজ হয় তার কতকগুলো ভাগ আছে। শিল্পীর ইচ্ছা, হাতযশ এবং সংগঠনের কর্তাদের অর্থকরী যোগান ও প্রশ্রয় এই দুয়ের উপরই সবটা নির্ভরশীল। খুব ব্রডলি যদি দেখি তাহলে আমার কাজের গতিপ্রকৃতি একটু ভিন্ন বলেই আমার ধারণা। আসলে আমি আমার কাজের মাধ্যমের ক্ষেত্রে অরিজিনালিটি-তে বিশ্বাস করি। ব্যাপারটা হল এরকম যে, আমরা যখন সিনেমার সেট দেখি তখন তা আলোকচিত্রের মাধ্যমে দেখি। ফলে সেক্ষেত্রে মেটেরিয়াল প্রক্সির উপস্থিতি থাকে। অর্থাৎ, একটা ঘর বা বাড়ি কাঠ প্লাস্টার বা প্লাইউড দিয়ে তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু পুজোর কাজের ক্ষেত্রে দর্শক সরাসরি নিজের চোখে দেখে উপস্থাপনাকে। তাই এখানে মেটেরিয়াল প্রক্সি খুবই দুরূহ কাজ। এইজন্য মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমি অরিজিনাল মেটেরিয়ালটাকে প্রয়োগ করি। যেমন লোহার ক্ষেত্রে লোহা বা পোড়া মাটির ক্ষেত্রে পোড়া মাটি, এটাই আমার কাজের ক্ষেত্রে প্রধান চরিত্রলক্ষণ। এবছরের পুজোর কাজের ক্ষেত্রে আমি প্রধান মাধ্যম হিসাবে সেরামিক্স বা টেরাকোটাকে নিয়েছি। মাটি পুড়িয়ে কীভাবেই বা টেরাকোটা করা হয় কিংবা সেরামিক্স করা হয় সেটা নিয়েই আমার কাজ। কাজটির পোশাকি নাম ‘অগ্নিশুদ্ধি’, আর এই কাজে আমাকে সাহায্য করেছেন দেবজিৎ চক্রবর্তী, অসীম পাল এবং আর্ট কলেজের কিছু ছেলেমেয়ে। 

৭৫ ফুট বাই ২৮ ফুট পরিসরের মধ্যে রচনা করতে চাইছি একটি স্থাপত্য, যা মণ্ডপ হিসাবে গণ্য করা যেতেই পারে। মণ্ডপস্থাপত্যের প্রতি সুবিচার করেও তার পরিসরকে সামান্য পরিমার্জনের লোভ সামলাতে পারিনি। ফলে একে এক নাগরিক হর্ম্য বা স্থাপত্যও বলা যায়।

(চলবে…)

Developed by DXDasia