৫৫ বছর পর, দেশ জুড়ে মুক্তি পাচ্ছে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র নতুন সংস্করণ

4k রেস্টোরেশনে এটি মুক্তি পাচ্ছে ৭ নভেম্বর

৯৬৮ সালে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত পলিফনিক আখ্যান ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-কে, ১৯৭০ সালে চলচ্চিত্রের ভাষা দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray)। কিন্তু খুব সচেতনভাবে কাহিনির কাঠামো এক রেখে চরিত্র, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, পরিণতি এমনকি কখনও চরিত্রের নামও বদলে দেন তিনি। যে যে বিন্দু থেকে তিনি সরে গেছেন, সেখানেই সত্যজিতের অরণ্যের দিনরাত্রি (Aranyer Dinratri) বানানোর উদ্দেশ্য লুকিয়ে। সেটি শুধুমাত্র সুনীলের উপন্যাস থাকে না, সত্যজিতের নিজের ডিসকোর্স হয়ে দাঁড়ায়। পঞ্চান্ন বছর পর, সেই ছবিই পুনরায় মুক্তি পেতে চলেছে দেশ জুড়ে।

সুনীলের কাহিনিতে চার চরিত্র যেখানে অ্যাডভেঞ্চার করতে বেরিয়েছিল জঙ্গলমহলে, উদ্দাম দুরন্ত চার বন্ধু যুবক, সত্যজিতে তা বই পড়ে ভালো লাগা থেকে বেড়াতে আসা চার যুবক; যারা দাম্ভিক, যাদের বেপরোয়া থাকাটাও আমেরিকার মতো প্রথম বিশ্বের ধনতান্ত্রিক দেশের হিপি কালচারের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে চেয়ে।

এ বছর কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-এর বিশেষ প্রদর্শনীতে ছবিটি 4k ফরম্যাটে পুনরায় দেখানো হয়, উপস্থিত ছিলেন ছবির দুই অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর এবং সিমি গারেওয়াল। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন খ্যাতনামা হলিউড পরিচালক ওয়েস অ্যান্ডারসন, যিনি নিজেও সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা-শৈলীতে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত। অরণ্যের দিনরাত্রি ছবির প্রযোজক সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পূর্ণিমা দত্ত। কান-এর পর ছবিটি প্রদর্শিত হয় টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-এ, যেখানে উত্তর মার্কিনি দর্শকেরাও সাদরে গ্রহণ করেন সত্যজিৎ রায়ের এই ক্লাসিককে। এবার ৭ নভেম্বর থেকে দেশের নির্বাচিত সিনেমা হলে মুক্তি পাচ্ছে অরণ্যের দিনরাত্রির নতুন সংস্করণ। কলকাতা, মুম্বই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু, পুনে-সহ একাধিক শহরে ছবিটি প্রদর্শিত হবে। ফিল্ম আর্কাইভ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই 4k রেস্টোরেশনে ছবির প্রতিটি ফ্রেম নতুন দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কালো-সাদা রঙের গভীরতা, আলোছায়ার খেলা, আর অরণ্যের নিস্তব্ধতা -এক কথায়, সব কিছু যেন আরও একবার নতুন প্রজন্মের চোখে জীবন্ত হয়ে উঠবে।

মনে রাখতে হবে ছবিটা তৈরি হচ্ছে ১৯৭০ সালে, বাংলা তথা ভারতের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সেটা অস্থিরতার কাল। বাংলায় নকশাল যুগ। একটি প্রজন্মের শিক্ষিত কিশোর-যুবকদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সময়। সে সময় নতুন প্রজন্ম কাঁপছে বুর্জোয়া হিপোক্রেসির আওতা থেকে বেরোনোর উত্তেজনায়, শোষণমুক্তির তাগিদে। কিন্তু তার পাশাপাশি এইরকম কিছু যুবক ছিল যারা বুর্জোয়া হিপোক্রিট। সুনীলের উপন্যাসে কয়েকটি সম্ভাবনা ছিল, সত্যজিৎ খুব সচেতনভাবে সেগুলোর প্রসার ঘটিয়েছেন সিনেমায় — গল্পকে একেবারে নব্বই ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিয়ে। এখানে সকলেই পাশ্চাত্যমুখী, সকলেই ধনতান্ত্রিক সভ্যতার। কয়েকটি চরিত্রে যেটুকু হিউমার রাখা হয়েছে তাও সফিস্টিকেটেড, অভিসন্ধিপ্রবণ। সুনীলের কাহিনিতে চার চরিত্র যেখানে অ্যাডভেঞ্চার করতে বেরিয়েছিল জঙ্গলমহলে, উদ্দাম দুরন্ত চার বন্ধু যুবক, সত্যজিতে তা বই পড়ে ভালো লাগা থেকে বেড়াতে আসা চার যুবক; যারা দাম্ভিক, যাদের বেপরোয়া থাকাটাও আমেরিকার মতো প্রথম বিশ্বের ধনতান্ত্রিক দেশের হিপি কালচারের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে চেয়ে। অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্ত হওয়ার থেকেও তাদের বিশ্বাস ও দেশের কোনো কিছুর মতো হওয়ার প্রতি। অরণ্যের দিনরাত্রি-র পরে আরও কিছু ছবিতে যুব প্রজন্মকে শিরদাঁড়া ভাঙা অবস্থায় দেখান সত্যজিৎ – এর পিছনে কি কোনো রাজনৈতিক সত্য লুকিয়ে নেই, কোনো ঐতিহাসিক সত্য? সেটাই হয়তো ভারতীয় বাস্তবতার প্রকৃত ছবি!

৭ নভেম্বর থেকে কলকাতায় এই ছবিটি দেখা যাবে দক্ষিণ কলকাতার প্রিয়া সিনেমাহলে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালে ছবিটি ২০তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-এ সেরা ছবির বিভাগে মনোনীত হয়েছিল। তার কয়েক দশক পর, ২০০৩ সালে পরিচালক গৌতম ঘোষ তৈরি করেন এর সিক্যুয়েল ‘আবার অরণ্যে’, যেখানে আগের চার বন্ধুদের জীবনের নতুন অধ্যায় ধরা পড়েছিল রঙিন ক্যানভাসে। এমনকী, ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের রেস্টর্ড ক্লাসিকস বিভাগে বিশেষ প্রদর্শনী হচ্ছে এই ছবির।
 

Developed by DXDasia