৫ বছর পূর্ণ করলো শিল্পগ্রাম খোয়াবগাঁ
শহরের অনেক মানুষই সময় সুযোগ পেলে গ্রামের দিকে পাড়ি জমান। আর্বান দূষণ, কোলাহল যত বেড়েছে এই প্রবণতাও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। বছর পাঁচেক আগে চালচিত্র অ্যাকাডেমির সম্পাদক, শিল্পী মৃণাল মণ্ডল ঝাড়গ্রামের ছোট্ট গ্রাম লালবাজারে গেছিলেন সদলবলে। নিছক ঘুরে বেড়ানোর জন্য নয়। সুস্থ বাতাস, প্রকৃতির অকৃত্রিম সাজ উপভোগ করার সঙ্গে সঙ্গে মৃণালের অনুসন্ধানী শিল্পী-মন খুঁজে নিয়েছিল প্রান্তজনের যাপনকে। যে খোঁজ তাঁকে এক স্বপ্নের সন্ধান দিয়েছিল। ২০১৮ সালে মৃণাল ও চালচিত্র অ্যাকাডেমির অন্যান্য সদস্যারা মিলে একটি আস্ত গ্রামকে করে তোলেন ‘ওপেন স্টুডিও’। মৃণালের উদ্যোগে চালচিত্র অ্যাকাডেমির পরিচালনায় ঝাড়গ্রাম শহরের উপকণ্ঠে লোধাশবর অধ্যুষিত লালবাজার গ্রামকে দত্তক নিয়ে নাম দেওয়া হয় ‘খোয়াবগাঁ’। তারপর পাঁচ বছর কেটে গেছে। শিল্পগ্রাম হিসেবে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার পাশাপাশি খোয়াবগাঁ-র হাত ধরে কলঙ্ক ঘুচেছে ঝাড়গ্রামের আদি উপজাতি জনগোষ্ঠীর; তাঁদের চিন্তাধারা বদলে দিয়েছে রং-তুলি-ডোকরা।

বেশ কয়েক বছর ধরে চালচিত্র অ্যাকাডেমি লোকশিল্পের সঙ্গে মূল ধারার শিল্পীদের মেলবন্ধন ঘটানোর কাজ করে চলেছে। ঝাড়গ্রাম রেলস্টেশন থেকে চার কিলোমাটার দূরে জঙ্গলের ভেতরে ছোট্ট একটা গ্রাম লালবাজার। চারদিক জঙ্গলে ঘেরা। গ্রামে ঢোকা আর বেরোনোর রাস্তা একটাই। গ্রামটিকে দেখে মৃণাল ভেবেছিলেন, এঁদের জন্য কিছু করার প্রয়োজন আছে। গ্রামটাতে অন্য কিছুর সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন। সেখানে কচিকাঁচাদের সঙ্গে মিশে মৃণালরা ঠিক করেছিলেন, এঁদের নিয়ে শুরু করবেন ছবি আঁকার ক্লাস। যেমন ভাবা তেমনই কাজ। স্থানীয় শিল্পী রামেশ্বর সরেন আর যজ্ঞেশ্বর হাঁসদা ক্লাস নেওয়া শুরু করলেন প্রত্যেক শনিবার। সময় সুযোগ মতো কলকাতার শিল্পীরাও মাঝেমধ্যে গিয়ে তালিম দিতে থাকলেন। একদিন ছবি আঁকার পাশাপাশি শুরু হল কুটুম কাটাম। এদিকে সেই গ্রামের বাড়িগুলোতে মাটির দেওয়াল দেখে কয়েকজন শিল্পীর মাথায় আসে, সমস্ত গ্রামটা জুড়ে একটা ওপেন স্টুডিও তৈরি করলে মন্দ হয় না। তারপর গ্রামের দেওয়ালগুলো ভরে উঠতে লাগল রংবেরং-এর ছবিতে। গ্রামটির ঘরবাড়িগুলোকে দেওয়া হতে লাগল শৈল্পিক ভাষা। প্রথিতযশা শিল্পীদের পাশাপাশি সেই কাজে হাত লাগাল গ্রামের বড়োরা এমনকি কচিকাঁচারাও। গ্রামের সব বাড়ির দেওয়ালেই এখন লোধা শিশু, কিশোর-কিশোরীদের আঁকা দেওয়াল চিত্র। শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান হয়েছে গ্রামবাসীর। নামী শিল্পীদের থেকে প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন তাঁরা। গ্রামবাসীর হাতে গড়া কুটুম কাটাম, গালার পুতুল, ডোকরা শিল্পসামগ্রী বিক্রিও হয়।

গ্রামবাসীদের হাতে গড়া ডোকরা শিল্পকর্ম
লকডাউনে মাস্ক-ব্যবহারের জন্য সচেতনতা, কৃষিবিল প্রত্যাহার, সত্যজিৎ রায়-এর শতবর্ষ – আলপনা, অন্যান্য কারুকাজের সঙ্গে খোয়াবগাঁর দেওয়ালচিত্রে ফুটে ওঠে সমসাময়িক প্রসঙ্গ। এছাড়া সারা বছর ধরে বিভিন্ন কর্মশালা আয়োজিত হয় খোয়াবগাঁয়। এ বছরের শুরুর দিকেই ব্রোঞ্জের তৈরি ৫০টি আদিবাসী পুরুষ ও নারীর ভাস্কর্য নিয়ে খোয়াবগাঁ-য় ‘নীল গগনের নীচে’ শীর্ষক একটি কর্মসূচির মাধ্যমে পারস্পরিক ভাব আদানপ্রদানের জন্য এসেছিলেন বিশিষ্ট প্রবীণ ভাস্কর কে এস রাধাকৃষ্ণন। সাদা চাদর বিছানো তক্তপোশের উপর সেই সব ভাস্কর্য নিজেদের মতো করে সাজিয়ে দিয়েছিল ঝাড়গ্রাম শহর ও সংলগ্ন গ্রামীণ এলাকার বিভিন্ন স্কুলের পড়ুয়ারা। সেই কর্মসূচিতেই খোয়াবগাঁর শিল্পচর্চার প্রসারে নিজের সংস্থা থেকে আর্থিক অনুদান দেন রামকিঙ্কর বেইজ এবং শর্বরী রায় চৌধুরীর ছাত্র প্রখ্যাত এই ভাস্কর। এই সময় খোয়াবগাঁয়ে চালচিত্র অ্যাকাডেমির নতুন ভবনটিও উদ্বোধন করেন তিনি।
খোয়াবগাঁয়ে চালচিত্র অ্যাকাডেমির নতুন ভবন

কৃষিবিল প্রত্যাহারের পর দেওয়ালচিত্র
“শুরুতেই ওঁদের আর্থিক অবস্থার কথা ভেবে আমার মনে হয়েছিল, এমন কিছু শেখাতে হবে, যেটা খরচসাপেক্ষ নয়। ভেবে দেখলাম, জঙ্গল এলাকা হওয়ার সুবাদে কাঠের টুকরো, গাছের বাকল ইত্যাদি প্রাকৃতিক উপাদানের অভাব নেই এই গ্রামে। এইসব দিয়েই আমরা ওঁদেরকে প্রথম কুটুম কাটাম শিখিয়েছিলাম। বাঁশের কাজ, কাঠের কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মহিলাদের কাঁথা সেলাই, বাটিকের কাজ শেখানো হয়। ডোকরাটা এখন শিখছে। এটা আসলে খুব কঠিন একটা মেথড। প্রাচীনও। সেটা আত্মস্থ করা তো আর মুখের কথা নয়! গত তিনবছর ধরে কাজ চলছে। খোয়াবগাঁ-তে ওরা সবসময় থাকে না, নিজেদের আস্তানায় ফিরে যায়, অন্যান্য কাজ করে। তবে এই কর্মকাণ্ড দেখে অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছে, শিখছে, কাজ করছে কিন্তু, ডোকরাশিল্প পুরোপুরি আয়ত্তে আনতে সময় লাগবে ওদের।” বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন মৃণাল মণ্ডল।
কচিকাঁচাদের সঙ্গে মৃণাল মণ্ডল
পাঁচ বছর ধরে কাজটা চালিয়ে যাচ্ছেন। সুবিধা-অসুবিধার মুখোমুখিও তো হয়েছেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে কিছু? মৃণালের কথায়, “আমরা তো একটা আর্ট-কালেকটিভ, আমাদের কাছে আইডিয়া আছে, কাজ করার জন্য যন্ত্রপাতি আছে কম-বেশি। বৃহৎ পরিসরে ভাবার জন্য পরিকাঠামোগত যে অবলম্বন দরকার, সেটা নেই। পাঁচ বছর আগে নিজেরাই টাকাপয়সা জোগাড় করে শুরু করেছিলাম কিন্তু পাঁচ বছর কাজ করার পরও আমরা বড়ো কোনও সাহায্য সেভাবে পাইনি। বেশিরভাগই আসেন, দেখেন, বাহবা দেন। সাহায্য খুব কম মানুষের থেকেই পেয়েছি। যখন শুরু করেছিলাম এই ভাবনা ছিল না যে, বিক্রি করবো। পরে ওদের কাজ দেখে লোকজনের ভালো লেগেছে, মানুষ ওদের শিল্পকর্মসংগ্রহ করতে চেয়েছে বলেই বিক্রির ব্যাপারটা শুরু হয়। তবে শিল্পসামগ্রী বিক্রি করে পুরো ব্যাপারটা পরিচালনা করার মতো অর্থসংস্থান হবে, এমন ভাবনা মূর্খামি ছাড়া কিছু নয়। অসুবিধা একাধিক। প্রতিবছর দেওয়াল থেকে পুরোনো রং-ছবি তুলে নতুন করে কাজ করতে প্রচুর টাকা খরচ হচ্ছে। এই যে প্রচুর লোক জায়গাটাকে ভালোবেসে এখানে ঘুরতে আসছেন, সেসব দেখভালের তো একটা খরচ আছে। এছাড়া, খোয়াবগাঁয়ে আসার সোজা কোনও পথ নেই, বিকল্প পথ দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। এটা নিয়ে অনেক মিছিল, আন্দোলন করেছি আমরা একসময়। রাস্তার বদলে বছর দুই আগে খোয়াবগাঁ-কে দেওয়া হয়েছে ‘কর্ম প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী কেন্দ্র’।”
মৃণাল আরও বলেন, “সব ঠিকঠাক থাকলে খোয়াবগাঁয় ভবিষ্যতে কীভাবে আর্টিস্ট রেসিডেন্সি শুরু করা যায়, শিল্পকলার ছাত্রছাত্রী ও উদীয়মান শিল্পীদের কাজের সুযোগ করে দেওয়া যায় সেগুলো নিয়েও ভাবছি। উৎসাহী ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলছি। সেরামিক শিল্প নিয়েও কাজ করার ইচ্ছে আছে। দেখা যাক।”
২০১৮ সালে ১৫-১৬টা বাচ্চাকে নিয়ে যে আঁকার স্কুল শুরু, সেই স্কুলেই এখন শ’ দেড়েক বাচ্চা বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ পায়। এই গ্রামের দেখাদেখি লাগোয়া গ্রামগুলোতেও শুরু হয়েছে শিল্প-প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, ছড়িয়ে পড়ছে খোয়াবগাঁ’র ভাবধারা। এখন অনেকেই অ্যাডপ্ট করছেন এই শিল্পগ্রামের ভাবনা
২০১৮ সালে ১৫-১৬টা বাচ্চাকে নিয়ে যে আঁকার স্কুল শুরু, সেই স্কুলেই এখন শ’ দেড়েক বাচ্চা বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ পায়। এই গ্রামের দেখাদেখি লাগোয়া গ্রামগুলোতেও শুরু হয়েছে শিল্প-প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, ছড়িয়ে পড়ছে খোয়াবগাঁ’র ভাবধারা। এখন অনেকেই অ্যাডপ্ট করছেন এই শিল্পগ্রামের ভাবনা। মৃণাল বলেন “আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী একটা মডেল তৈরি করেছিলাম। একজন শিল্পী হিসেবে একটা প্র্যাকটিস হিসেবে নিয়েছিলাম খোয়াবগাঁ-র পুরো ব্যাপারটাকে। এটা আমার একটা সাইট-স্পেসিফিক কাজ ছিল বলা যেতে পারে, একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একটা সংলাপ। আমরা একটা রিসার্চ করেছি, যেটাতে ওরাও উপকৃত হয়েছে।”

কীভাবে উপকৃত হওয়ার কথা বলছেন, অর্থনৈতিক, সামাজিক নাকি মানসিক?
“আমি বলবো, এই পাঁচ বছরে ওরা মানসিক ভাবে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছে। এটাই আমার কাছে অনেক বড়ো ব্যাপার। মানসিকতায় অনেকটা পরিবর্তন এসছে। এঁরা সকলেই লোধাশবর সম্প্রদায়ের, অপরাধপ্রবন উপজাতি হিসেবেই পরিচিত ছিল। প্রত্যেককে রোজ থানায় হাজিরা দিতে হতো। ছ’সাত বছর আগে ওরা তো কোনও আগন্তুকের সামনেই আসতো না। দেখলেই লুকিয়ে যেত। তারাই আজ অনেক স্মার্ট, সড়গড়। লোকজনের সঙ্গে কমিউনিকেট করে, নিজেদের মতো কাজ করে। খোয়াব গাঁ-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে, তথাকথিত শহুরে, শিক্ষিত সমাজের মানুষদের সঙ্গে ওঠাবসা, খাওয়াদাওয়া – কাজ করার এই যে প্র্যাকটিসটা চলেছে, তাতে ওঁদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে বলে আমার মনে হয়। এই যে পাঁচ বছর ধরে শিল্পকলার সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভাবে যুক্ত রইলো, এরপর ওঁরা এই কাজের সঙ্গে থাকুক বা না থাকুক, যে কাজই করতে সেখানেই ওদের পরিবর্তিত মানসিকতার প্রভাব পড়বে। যেমন এখানকার একটা বাচ্চা এখন ঠাকুর গড়তে শুরু করেছে। আমার ধারণা এভাবে আরও অনেকের মধ্যে দিয়ে একটা সুস্থ সামাজিক-মানসিক-শৈল্পিক পরিসর তৈরি করা সম্ভব। খোয়াবগাঁ-র খোয়াব বা স্বপ্নপূরণ হবে।” বলেন মৃণাল।

শহর-গ্রাম নির্বিশেষে দেওয়ালে দেওয়ালে রাজনৈতিক স্লোগান, ভোটপ্রচার, বিজ্ঞাপন যখন প্রায় দৃশ্যদূষণের পর্যায়ে পৌঁছেছে, খোয়াবগাঁর রঙিন, শিল্পকর্মে ভরাট দেওয়ালগুলো দুদণ্ড চোখের আরাম, মনের শান্তি পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। মৃণালের আর্জি, এই প্রকল্পের পাশে দাঁড়ান আরও মানুষ। কোনো সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য ছাড়াই তাঁরা এই উদ্যোগ নিয়েছেন। যাঁরা এই প্রকল্পে চালচিত্র অ্যাকাডেমিকে সহায়তা করতে ইচ্ছুক, তাঁরা +৯১ ৯৪৩৩২৪৫৫৭৪ নম্বরে ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন মৃণাল মণ্ডলের সঙ্গে।
ছবিঋণঃ চালচিত্র অ্যাকাডেমি