কেমন হল অর্জুন দত্তের ছবি ‘অব্যক্ত’
বলো ‘ছোটোবেলা’। ‘ছেলেবেলা’ বোলো না। ছেলেদের তো ছেলেবেলা থাকে। মেয়েদেরও কি তবে ছেলেবেলা থাকে! নাকি মেয়েদের থাকে ‘মেয়েবেলা’! এখানেই সমাজের চোখে ভাগ হয়ে যাচ্ছে ‘জেন্ডার’। ছেলে-মেয়ে বিভাজন রেখা রোজ হনন করছে একটা একরৈখিক সমাজব্যবস্থাকে। কিন্তু বেরিয়ে আসার উপায় কী! তাই ‘ছোটোবেলা’ বলাই ভালো বোধহয়। অনেক ছেলের শৈশব কাটে খেলনাবাটি আর পুতুলের বিয়ে দিয়ে। এই সিনেমাতেও ছোট্ট ছেলেটা ভালোবাসে পুতুলের বিয়ে দিতে। ভালোবাসে ডল হাউস। আড়ালে তারও ইচ্ছা হয় মায়ের মতো শাড়ি পরবে, ঠোঁটে লিপস্টিক দেবে, কপালে পরবে বড়ো কালো টিপ। কিন্তু মা এসব দেখলেই বকে। কেন? মায়েদেরও কিন্তু একটা ছোটোবেলা থাকে – মাতৃসুলভ ছোটোবেলা। বিয়ে নামক ‘প্রতিষ্ঠানের’ উপকরণ শাড়ি-সিঁদুর-শাঁখার ছোটোবেলা। এই ছেলেটির বাবার যে সমকামিতা মৃদুভাবে প্রকাশিত হয়েছে ছবিতে, তা অতুলনীয়। ছোট্ট ছেলেটির বাবা এবং বাবার এক ‘পুরুষ’ বন্ধুর ‘লাভস্টোরি’ আড়াল করে রাখতে চান মা। তাই ছেলের পুতুল খেলায় ঘোর আপত্তি তাঁর। কিন্তু ছোট্ট ছেলেটি কি লিঙ্গ রাজনীতির বিস্তৃত অধ্যায়ের ভাষা বোঝে! এই বোঝানোর দায় কার? এই ছেলে বড়ো হয়ে ওঠে। দিল্লিতে বড়ো চাকুরে হয়ে ওঠে। লিভ ইন সম্পর্কে যায়। কিন্তু বিয়ে করতে বড্ড ভয়। কারণ সে জানে তার বাবা-মা’র সম্পর্ক মধুর নয়।

‘অব্যক্ত’ ছবিতে পরিচালক অর্জুন দত্ত সূক্ষভাবে কয়েকটি ‘কেন’র প্রশ্রয় দিয়েছেন। কেন মা আর গান গায় না? কেন মা মামাবাড়ি যায় না? কেন ছেলেকে এত চোখে চোখে রাখতে চাইত মা? ছেলেরা পুতুল নিয়ে খেললেই মেয়ে হয়ে যায়? বাবা ভার্সেস রুদ্রকাকু, বাবা ভার্সেস মা, মা ভার্সেস ছোটোবেলার ইন্দ্র – সমান্তরালভাবে অনেকগুলো রেফারেন্স টেনেছেন পরিচালক। সুদক্ষভাবে বুনে গেছেন সম্পর্ক এবং একাকিত্বের জটিল তত্ত্বগুলি। এই গল্প আসলে আমাদের সব্বার। আমাদের প্রত্যেকের শৈশবের, বড়োবেলার। সামাজিক বাধানিষেধের বেড়াজালে বদ্ধ হয়ে মুক্তির উপায় খুঁজে চলা একদল মানুষের। মা নিজেকে চিনতে শেখেন, জানতে থাকেন উভকামী স্বামীকে, ছেলের মনস্ত্বত্ত্ব হাতড়ে খুঁজে বেড়ান। ফিরিয়ে আনেন স্বামীর প্রাক্তন ভালোবাসা রুদ্রকে। ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। বুকে টেনে নেন।

অর্জুন দত্তের ‘অব্যক্ত’ ছবির সবটা জুড়ে নজর কেড়েছেন অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়। তাঁকে ঘিরেই বর্ণিত হয়েছে তিন পুরুষের গল্প। ইন্দ্র-রুদ্র-কৌশিক (অনুভব কাঞ্জিলাল-আদিল হুসেন-অনির্বাণ ঘোষ)। গল্পের আবহে জায়গা করে নিয়েছে রবীন্দ্রনাথের গান আর তানপুরার মেজাজ। কয়েকবছর আগে ‘দ্য সিক্সথ এলিমেন্টস’ নামক একটি ছোটোছবি নির্মাণ করেছিলেন অর্জুন দত্ত। তখন থেকেই পরিচালনা এবং নতুন গল্প বলার মুনশিয়ানা দেখিয়েছিলেন তিনি। ‘অব্যক্ত’ আসলে কিছু কথা প্রকাশ না করতে পারার কাহিনি। এটা আসলে নিজের কাছে প্রকাশ না করতে পারা। সামাজিক বাধানিষেধের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে যন্ত্রণা আর আরামের দ্বন্দ্ব দ্বন্দ্ব খেলা। যেখানে পৃথিবীর সমস্ত জেন্ডারের ঊর্ধ্বে গিয়ে জিতে যায় ভালোবাসা।
অব্যক্ত | পরিচালনা- অর্জুন দত্ত | অভিনয়- অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়, অনুভব কাঞ্জিলাল, আদিল হুসেন | বঙ্গদর্শন রেটিং ৪/৫