স্থাপনাগুলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা ইতিহাস
গৌরপ্রাঙ্গনের পশ্চিমে চৈতি বা চৈত্য
শান্তিনিকেতনে তিনটি মাটির বাড়ি আছে। তালধ্বজ এবং নতুন বাড়ি নামে পরিচিত বাড়িগুলিও মাটির কিন্তু এগুলি প্রচলিত মাটির বাড়ি। উত্তরায়নে শ্যামলী কলাভনে কালো বাড়ি এবং গৌরপ্রাঙ্গনের পশ্চিমে চৈতি বা চৈত্যর গঠনশৈলী সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। এর নির্মাণ কৌশলও সাধারণ নয়। নন্দলাল বসু, সুরেন কর, রামকিঙ্কর বেইজের মত প্রখ্যাত শিল্পীদের অভিনব সৃষ্টিই বাড়িগুলি।
মাটির বাড়িগুলি
শান্তিনিকেতনে যে সময়ে নূতন দালান-বাড়ি তৈরি হচ্ছে ঠিক সেই সময় নন্দলাল বসু অল্প ব্যয়ে মাটির বাড়ি তৈরির পরিকল্পনা করেন। মাটি ও আলকাতরার মিশ্রণে তৈরি হয় উপযোগী মাটি। মাটির বাড়িতে জল প্রতিরোধ করতে আলকাতরার প্রলেপ দেওয়ার ব্যাবস্থা করেন। গৌর প্রাঙ্গণের পিছনে চৈত্য গৃহটি নন্দলাল বসুর প্রথম স্থ্যাপত্য। নন্দলাল বসু এবং সুরেন করের পরিকল্পনার ফসল চৈত্য। নন্দলাল বসুর তত্বাবধানে ছাত্রছাত্রীরা নিজেরা তৈরি করেছিলেন। উপকরণ মাটি ও আলকাতরা (সূত্র – চিত্র কথা)। কাচের একটি ছোট্ট পাল্লা ছিল। ভিতরে পাঠভবনের ছেলে মেয়েদের আঁকা ছবি রাখা হত। নিয়মিত বদলে দেওয়া হত। গড়ন অনেকখানি বাংলাদেশের ছোটো চালা ঘরের মত। শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনের ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপত্যগুলি অমূল্য সৃষ্টি।

কালো বাড়ি
উত্তরায়নে শ্যামলী, কলাভবনের কালো বাড়ি এবং গৌরপ্রাঙ্গনের পশ্চিমে চৈতি’র মতো মাটির বাড়িগুলির গঠনশৈলী সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। নির্মাণ কৌশলও সাধারণ নয়।
কালো বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু হয় ১৯৩৪-এ তারপর নানা সময়ে কাজ চলেছে। আগেই নির্মিত হয়েছিল শ্যামলী। সেই অভিজ্ঞতাও এই বাড়ি নির্মাণে কাজে এসেছে। কালো বাড়ি এবং রবীন্দ্রনাথের বাসস্থান শ্যামলী এইভাবে নির্মিত হয়। স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য বস্তুর ব্যবহারে অল্প ব্যয়ে গৃহ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন নন্দলাল বসু। কালোবাড়ি প্রধানত ভাস্কর্য রামকিঙ্কর বেইজের হাতে নির্মিত। তিনি যখন এই নির্মাণে রত সেই সময় নন্দলাল বসু-র উক্তি “বিনোদ গিয়ে দেখো রামকিঙ্কর মাটির কাজ করছে, তার হাতের dexterity দেখে বুক কেঁপে যায়। একি আর এক জন্মের সাধনায় হয়েছে। অনেক জন্মের সাধনা নিয়ে কিঙ্কর জন্মেছে।” নন্দলাল বসুর তত্ত্বাবধানে কালো বাড়ি নির্মাণে হাত লাগিয়েছিলেন রামকিঙ্কর বেইজ, প্রভাস সেন ও সুখময় মিত্রের মতো ছাত্ররাও।
প্রসঙ্গত, কালো বাড়ির কিছু মূর্তি অযোধ্যা গ্রামের পিতলের রথের নকশার আদলে নির্মাণ করেন রামকিঙ্কর। অযোধ্যা বীরভূমের ইলামবাজারের কাছের একটি গ্রাম। মাটি ও জল প্রতিরোধের জন্য আলকাতরার মিশ্রণে তৈরি হয়েছিল কালো বাড়ি। বাড়ির দেওয়াল জুড়ে অসাধারণ শিল্পকর্মের প্যানেল। প্রতিটি প্যানেলে খোদিত আছে গল্প। একসময় কলাভবনের সিনিয়র ছাত্রদের ছাত্রাবাস ছিল কালো বাড়ি। এখন বন্ধ আছে। এই ধরনের বাড়ি সংরক্ষণ করাও একটি চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে পুরাতত্ত্ব বিভাগ বাড়িটির সংস্কারের কাজ করেছে।

শ্যামলী
উত্তরায়নে মোট পাঁচটি বাড়ি আছে। একটি সম্পূর্ণ মাটির। এই বাড়ির নাম শ্যামলী। শ্যামলী বাড়ি একটি ব্যতিক্রমী শিল্প কর্মের অনন্যসাধারণ সাক্ষী। এই সৃষ্টির কোন বিকল্প নেই। হয়ত এধরনের কাজ আর হবেও না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৃষ্টপোষকতার সাথে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু এবং সুরেন করের মত কালজয়ী শিল্পীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই বাড়ি। শান্তিনিকেতনের উল্লেখযোগ্য দ্রষ্টব্য। বাড়ির দেওয়াল শুধুমাত্র নয় বাড়ির ছাদ ও মাটির। শিল্পী এবং স্থপতি সুরেন কর বাড়ির নক্সা তৈরি করেন। সুরেন কর উত্তরায়নের সমস্ত বাড়িরই নকশা সুরেন করের। নির্মাণ কৌশলে অভিনবত্ব আছে। মাটি ,গোবর, আলকাতরার সঙ্গে বেনা ঘাস মিশিয়ে মাটির হাঁড়ির ওপর হাঁড়ি সাজিয়ে মাটি দিয়ে দেওয়াল তৈরি হয়েছে। ছাদে মাটির হাঁড়ি উপুড় করে ব্যবহার হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন খড়ের চালের পরিবর্তে মাটির চালের বাড়ি। আগুন লাগার আশঙ্কা থাকবে না। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে এই প্রযুক্তির ব্যবহার সাধ্যের বাইরে। নন্দলাল বসু সুরেন করের তত্ত্বাবধানে গৌর মণ্ডল বাড়িটির নির্মাণে সাহায্য করেছেন বলে জানা যায়। এই বাড়িতে শোবার ঘর, স্নানের ঘরের সাথে বসবার ঘর এবং বারান্দাও আছে। সামনে ছোট্ট গোলাকার উঠান। শ্যামলী দেখার আনন্দ শুধু ব্যতিক্রমী নান্দনিক প্রযুক্তি নয়। দেওয়াল জুড়ে কলাভবনের ছাত্র ছাত্রীদের সৃষ্টি রিলিফগুলি সমান দ্রষ্টব্য। শান্তিনিকেতনে সেই সময় রবীন্দ্রনাথের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভারত বিখ্যাত দিকপালদের কর্মক্ষেত্র। শ্যামলীর এই কাজ নন্দলাল বসুর নির্দেশনায় সম্ভব হয়েছিল। ছাত্রছাত্রীদের কাজ তো আছেই। সেই সঙ্গে রামকিঙ্কর বেইজের এবং নন্দলাল বসুর কাজও শোভাবর্ধন করেছে এই অভিনব স্থাপত্যের। ১৩৪২-এর ২৫ বৈশাখ জন্মদিনে শ্যামলীতে প্রবেশ করেন কবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক।
“আমার শেষ বেলাকার ঘরখানি
বানিয়ে রেখে যাব মাটিতে
তার নাম দেব শ্যামলী”
মহাত্মা গান্ধি এই বাড়িতে সস্ত্রীক থেকেছেন ১৯৪০-এ। তারপরেও এসেছেন। লালবাহাদুর শাস্ত্রী, মাদার টেরিজাও এই বাড়িতে এসেছেন।

ছাতিমতলা
ছাতিমতলা ও উপাসনা মন্দির
উপাসনা মন্দির এবং ছাতিমতলা শান্তিনিকেতনের প্রধান দ্রষ্টব্য। ছাতিমতলা শান্তিনিকেতনের পুণ্য স্থল হিসেবে চিহ্নিত। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জনহীন এই প্রান্তরে দেখেছিলেন দুটি ছাতিম গাছ। পরে এখানেই তাঁর সাধনার ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করেন। মতান্তরে, সেই সময় ব্রাহ্মসমাজ হয়ে উঠেছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের একটি আশ্রয়। রামমোহনের তিরোধানের পর মহর্ষি ব্রাহ্মসমাজের দায়িত্বভার নিয়ে তার একটি বীজ রোপণ করেন শান্তিনিকেতনে। ধীরে ধীরে সার-মাটি-জল দিয়ে লালন করে একটি ছায়াসুনিবিড় মহীরুহে পরিণত করেন। বৃহৎ শাখা-প্রশাখাময় সেই আশ্রয় হল শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলা। এর পরবর্তী পরিণত রূপ হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল শান্তিনিকেতনের ব্রহ্ম মন্দির বা উপাসনা গৃহ।

উপাসনা মন্দির
‘তিনি আমার প্রাণের আরাম মনের আনন্দ আত্মার শান্তি’— মহর্ষির জীবনবেদরূপ এই বাণীটি আজও অনুরণিত হয় এখানে। প্রতি বছর পৌষমেলার সূচনা এখানেই, ‘৭ই পৌষের উপাসনা’র মাধ্যমেই হয়। উপাসনা গৃহ, যাকে এখন আমরা শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যময় প্রাঙ্গণ ‘কাচমন্দির’ বলে জানি। বড়ো রাস্তার উপর এই মন্দির। ব্রহ্ম ধর্মের উপাসনার জন্য এই মন্দির নির্মিত হয় ১৮৯১ সালের ২১ ডিসেম্বর এই মন্দিরের শুভ উদ্বোধন হয়। মন্দির নির্মাণের খরচ হিসেবে তৎকালীন মূল্যে ১৫,০০০ টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। মন্দিরের গায়ে পূর্ব দিকে স্থাপিত হয়েছিল পঞ্চচূড়া— যার শীর্ষে তিনটি ছত্রে লেখা ছিল ‘ওঁ তৎ সত ঋতং সত্যং’। কালের ধর্ম গ্রাস করে বিস্মৃত করেছে সেই চূড়াকে, কিন্তু পুরনো দিনের ছবিতে তার স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। নানা রঙের বেলজিয়াম কাচ, টালির ছাদ, শ্বেত পাথরের মেঝে বিশিষ্ট বিগ্রহহীন এই মন্দিরটি জাতি-ধৰ্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য অবারিত। না থাকে কোনও দেববিগ্রহ, না থাকে নৈবেদ্যর ডালি। পূজার্চনা বা আরতি এখানে স্থান নেয় পবিত্র বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ আর সুললিত সঙ্গীতের মূর্চ্ছনায়। আচার্যপদে আসন গ্রহণ করেন কোনও জ্ঞানতপস্বী। মন্দিরে উপাসনা হয় বুধবার সকালে। বুধবার ছাড়া বছরের কয়েকটি নির্দিষ্ট দিনে উপাসনা হয়, যেমন- বর্ষ শেষ, বর্ষবরণ, ২৫ শে ডিসেম্বর। পাঠগ্রহণ শুরুর আগে ‘তাঁকে’ স্মরণ করে বৈতালিক আজও নিয়মিত হয়।