থিয়েটার একটা জার্নি, একটা অভিজ্ঞতার যাপন । হরিপদ কেরানিও গ্রীক রাজার বেদনায় সামিল হয়

মানুষ ততক্ষণই সৎ যতক্ষণ না তাকে দাঁড়াতে হচ্ছে প্রলোভনের সামনে , ততক্ষণই  বিশ্বস্ত যতক্ষণ না সে বিকল্পের মুখোমুখি , ততক্ষণই নির্লোভ যতক্ষণ না সে সম্পদের অস্তিত্ত্ব জানতে পারছে । সেই লোকটা পাপের ঝুলি উপুড় করল হ্যাডলবার্গের সেই সব মানুষদের সামনে যারা এতদিন জানত তারা নিস্পাপ, রিপুজয়ী । বেবাক নষ্ট ক’রে দিল একটা শহর । এই লোকটার গল্প শোনায় অধ্যাপক । মধ্য পশ্চিম আমেরিকার এক কলেজ পড়ুয়াদের ।নিশ্চয় বলে সাদা – কালো, ভালো-মন্দ, পাপ-পুন্য প্রভৃতি আপাত নিরীহ কিন্তু বজ্রগর্ভী বাইনারি অপোসিটের কথা । শোনায় আশাবাদের কথা, আত্মউদ্বোধনের কথা । প্রতিষ্ঠান বিরোধী লেখক মার্ক টোয়েনকে ভয় পেয়েছে আমেরিকা সেকালে ।একালে তা পড়াতে দেখে আবারও ভয় পায় সিস্টেম । ভয় কে জয় করার উপায় উল্টে ভয় দেখানো ।নিরীহ শিষ্ট অধ্যাপক সাইলাস টিম্বারম্যানকে বলা হয় সিলেবাসের মধ্যে থাকুন ।  সিদ্ধান্তের টানাপোড়েনে বিক্ষত মানুষ । চিন্তার স্বাধীনতা , বাক্-স্বাধীনতা নাকি  নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপের জীবন । এ এক অস্তিত্ত্বের সংকট ।

এমনই এক দোলাচলতায় পড়ে শৈলেশ  । ক্লাসে সে পড়ায় রবীন্দ্রনাথ, পড়ায় বৃক্ষবন্দনা ।  পারে না কলেজের পেছনের পুরোন শালবন নিধনে শামিল হতে ।অধ্যক্ষ ডেকে পাঠান, ইউনিয়ন লিডার ভয় দেখায়, বাড়িতে আসে হুমকি টেলিফোন, মিথ্যে অভিযোগও সাজানো হয় । স্ত্রী নায্যত ভয় পান, আগলে রাখতে চান কিশোরী কন্যাকে , স্বভাবতই।   
শুরুর গল্পটির রচয়িতা মার্ক টোয়েন । সাইলাসের কাহিনি লিখেছেন হাওয়ার্ড ফাস্ট । সে উপন্যাসের আত্তীকরণ কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের , নাট্যনির্দেশনাও তাঁর । সব ক’টি গল্পই আসলে জেগে ওঠার । জাগিয়ে তোলার । তথাকথিত তারকাবিহীন এ নির্মাণও এক অর্থে জাগরণের কথা বলে, কলকাতার নাট্যদর্শককে জানায় কলকাতা কেন্দ্রিকতার বাইরের থিয়েটারচর্চার খবর ।

থিয়েটার একটা জার্নি, একটা অভিজ্ঞতার যাপন । হরিপদ কেরানিও গ্রীক রাজার বেদনায় সামিল হয় । কোজাগরী দর্শনে তাই একাত্ম হওয়া শৈলেশ-জাগরী-ময়ূরী-লীলাময়-বিনায়কের সঙ্গে । আমরা শৈলেশের ভয়ে ভীত হই , অন্তর্গত একক নিঃসঙ্গতাকে বদলাতে চাই যৌথ প্রতিবাদে । আগুনের মধ্যে একবার গিয়ে দাঁড়াতে পারলে আর ভয় কী! কলেজ রাজনীতি কেমন ক’রে বৃহত্তর রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, কেমন ক’রে প্রতিবাদী কণ্ঠগুলো টাকার ব্যাপার হয়ে ওঠে তা দেখতে দেখতে আমাদের আর ভয় করে না , শৈলেশের মতোই ।সদ্য কলেজে ওঠা তীর্থ কিংবা উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রী জাগরীর সাহসী পদচারণে মনে হয় এ সভ্যতার ধ্বংস দূরতর । সাহস জোগান রবীন্দ্রনাথ । জেগে থাকে তাঁর গান । একাকীত্বে । বিষণ্ণতায় । প্রতিবাদে । হাহাকারে । সংকট ঘনীভূত হয় , সব আলো নিবে আসে । মঞ্চে জেগে থাকে তাঁর আত্মপ্রতিকৃতি । পথ দেখায় । সাহস দেয় ।

মঞ্চসজ্জার প্রতীকেও বাহুল্যর বদলে সারল্য । চিন্তার স্বাধীনতা লেখা পোস্টারের পাশেই ক্ষমতাবানের কুঠার , কুঠারের চোখটি মনে করিয়ে দেয় প্যানঅপটিকনের নজরদারির কথা । আত্মজাগরণের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ সরে যেতে থাকে কুঠারের চোখ । সে স্থান নেয় একটি গাছ । গাছের নিচে সমারোহ । মানবতার, সঙ্গীতের, সহায়তার । তাই শৈলেশ স’রে গেলেও গান থামে না ।গান আসে কান্নার ভাষা হয়ে ।জাগরণের জন্য নাকি জাগরণ ঘটাতে না পারার? আর গাছের পাতা ; সেগুলো হয়ে যায় হাত । মুষ্টিবদ্ধ নয়, বন্ধুতার আশায় সে করতল প্রসারিত ।

মাটি তো আগুনের মতো হবেই যদি তুমি ফসল ফলাতে না জান, যদি তুমি বৃষ্টি আনার মন্ত্র ভুলে যাও তোমার স্বদেশ তাহলে মরুভূমি  … শিক্ষকরা সকলেই শিক্ষক পরিচয়ের যোগ্য কি না, এই আপাত নিরীহ প্রশ্নের আড়ালে জেগে থাকে চরম সত্য । জলের মতো প্রবাহিত হতে থাকে আশাবাদ , এক থেকে অপরে, এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে ।সতত জলসিঞ্চন শিকড়ে থেকে শিকড়ে , সত্ত্বায় ।।

 

Developed by DXDasia