
১৯৪৭-এর দেশভাগ তাঁকে কলকাতার পাট তুলতে বাধ্য করেছিল
দেশভাগের তীব্র ঢেউ যুগের পর যুগ ধরে প্রবাহমান। সাতচল্লিশের পার্টিশনের ধ্বংসাত্মক এজেন্ডা প্রভাব ফেলেছিল অনেককিছুতেই, অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছিল বাংলার সাংস্কৃতিক জগতেও। বাংলা ভাগাভাগির উন্মত্ততায় হারিয়ে গিয়েছিল যে ক’জন প্রতিভা—'মায়েস্ত্রো’, তাঁদের মধ্যেই অন্যতম এক জন বিশিষ্ট সুরকার, প্রশিক্ষক, পরিচালক, সংগঠক ও গায়ক আবদুল আহাদ। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রচার ও প্রসারে তাঁর ঐতিহাসিক অবদান ভুলে গেছে এই দেশ, এপার বাংলা।
রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রাণপুরুষ হিসেবে এবং আর যেসব অবদানের জন্য পঙ্কজকুমার মল্লিককে স্মরণ করা হয় এ দেশে, অনেকটা সেই সব অবদানের জন্যই আবদুল আহাদকে স্মরণ করা হয় বাংলাদেশে। যেভাবে দশকের পর দশক ধরে, অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর সঙ্গীত শিক্ষার আসরে পঙ্কজকুমার মল্লিকের কাছ থেকে বাংলা গানের তালিম পেয়েছে বাঙালি, একইভাবে বাংলাদেশের শ্রোতাদের বেতারের মাধ্যমে গানের ক্লাস করাতেন আবদুল আহাদ।
১৯২০ সালে, তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি রাজশাহীতে জন্মেছিলেন আহাদ। খুব ছোটবেলাতেই গানবাজনা রপ্ত করে ফেলেছিলেন। পড়তেন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে, যেখানে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন পরবর্তী কালের প্রখ্যাত সরোদিয়া রাধিকামোহন মৈত্র। ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে কলকাতায় সিটি কলেজে ভর্তি হন তিনি। সেসময় গানের তালিম নিতে শুরু করেন মনজু খান সাহেবের কাছে। ১৯৩৬ সালে ‘অল বেঙ্গল মিউজিক কম্পিটিশন’-এ অংশ নেন এবং ঠুমরী-গজল বিভাগে প্রথম স্থানাধিকারী হন। সঙ্গীত শিক্ষা চালিয়ে যেতে, ১৯৩৮ সালে বৃত্তি পেয়ে চলে যান শান্তিনিকেতনে। সঙ্গীত ভবনের প্রথম বাঙালি মুসলমান ছাত্র ছিলেন তিনি। থাকতেন কলাভবনের ছাত্রাবাসে। আহাদের একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন সুবিনয় রায়।
রাজেশ্বরী বাসুদেব, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়—সঙ্গীত ভবনে তাঁর সতীর্থদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই দু’জন। শিক্ষকদের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেছিলেন আহাদ। তাঁকে আলাদা করে তালিম দিতেন শৈলজারঞ্জন মজুমদার ও শান্তিদেব ঘোষ। এটা সেই সময়ের কথা, যখন ‘উত্তরায়ণ’ বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে ‘শ্যামা’-র মহড়া চলছে। সেই নাটকের সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে ছিলেন আহাদ। ‘বর্ষামঙ্গল’ থেকে ‘চণ্ডালিকা’— রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের চমকপ্রদ সৃজনশীল প্রবাহের ঘনিষ্ঠ প্রত্যক্ষদর্শী এবং সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন তিনি।
১৯৪১-এর ৭ আগস্ট অর্থাৎ বাইশে শ্রাবণে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণসংবাদ এসে পৌঁছলে শোকার্ত শৈলজারঞ্জন আহাদের হাতেই ‘সমুখে শান্তিপারাপার’ গানটির স্বরলিপি তুলে দিয়ে বৈতালিক পরিচালনার দায়িত্ব সঁপেছিলেন।
চার বছর শান্তিনিকেতনে কাটানোর পর, ১৯৪১ সালে কলকাতায় থিতু হয়ে সংগীত শিক্ষক হিসেবে ‘হিজ মাস্টার ভয়েস’(এইচএমভি)-তে যোগ দেন। শিক্ষক-শিল্পী-সঙ্গীত পরিচালকের বর্ণাঢ্য জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেন। পঙ্কজকুমার মল্লিক, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়েরা তাঁর পরিচালনায় রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করেন। ৭৮ আরপিএম স্পিডের রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড, যে রেকর্ডে রবীন্দ্রসঙ্গীতের পরিচয় রোমান হরফে লেখা ‘বেঙ্গলি টেগোর সং’, যার লেবেলে ‘কথা ও সুর: রবীন্দ্রনাথ’ ছাপা হত, এমন অসংখ্য রেকর্ডের লেবেলে রবীন্দ্রনাথের নামের পাশে একই মাপের হরফে লেখা থাকত ‘পরিচালনা: আবদুল আহাদ’। এমনকি বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতির সহযোগে বেরনো এ সব রেকর্ডের শিল্পী তালিকায় সুচিত্রা মুখোপাধ্যায়ও (তখনও ‘মিত্র’ হননি)। সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের ছোট মেয়ে সুচিত্রার প্রথম রেকর্ড, যাতে ছিল ‘মরণ রে’ আর ‘হৃদয়ের একূল ওকূল’— তার প্রশিক্ষক ছিলেন আহাদ। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক শান্তিদেব ঘোষের গলায় ‘কৃষ্ণকলি’র রেকর্ডও পরিচালকের নাম পাওয়া যায়- আবদুল আহাদ। কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রবল সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। একদিকে ‘গীতবিতান’-এর মতো রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গান শিখিয়েছেন, অন্যদিকে, রেডিয়ো স্টেশনে দাপটের সঙ্গে গান গেয়েছেন। আধুনিক গানে সুর দিয়ে বন্ধু সন্তোষ সেনগুপ্তকে দিয়ে গাইয়েছেন ‘আমি তুমি দুই তীর সুগভীর তটিনী’ গান, যা সেই সময় দারুণ জনপ্রিয় হয়।
টালিগঞ্জের সিনেমাপাড়ায় নাম লিখিয়ে ওবায়েদ-উল হক পরিচালিত ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’, ‘নবারুণ’ সহ আরও অনেক ছবিতেই সুরারোপ করতে থাকেন আহাদ। এমন সময়ে, ১৯৪৬ সালের ১৪ আগস্ট জিন্নার ডাকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভয়ানক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আহাদ বুঝে উঠতে পারেন না, ভারত ছাড়া অথবা ভারতে থাকা কোনটা ভালো হবে তাঁর জন্য। কাছের বন্ধু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ই তাঁকে কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। অবশেষে, দেশভাগ তাঁকে কলকাতার পাট তুলতে বাধ্য করে। আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছিল আহাদকে।
ঢাকায় গিয়েই বেতারে যোগ দেন সঙ্গীত বিভাগের প্রযোজক হিসেবে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সঙ্গীতজগতের দিকপাল হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন সেখানে। দীর্ঘ দিন ধরে ঢাকার বেতারে পরিচালনা করেছিলেন সঙ্গীতশিক্ষার আসর। ‘আমার সোনার বাংলা’ যে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে উঠল, তার নেপথ্যনায়কদের এক জন তিনি। আজ সারা বাংলাদেশ যে ভাবে গানটি গায়, তার পিছনে আবদুল আহাদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়, এই গানের চূড়ান্ত সুরটি তাঁরই দেওয়া। শিল্পী, শিক্ষক, সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে প্রবাদপ্রতিম এই মানুষটি ঢাকা বেতার থেকে যথাসময়ে অবসর নেওয়ার পরও সাত বার এক্সটেনশন পেয়েছিলেন।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘স্বাধীনতা দিবস’ পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করে। তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ১৯৯৪ সালের ১৫ মে। আবদুল আহাদ নামটি বিস্মৃত হলেও, দুই বাংলায় রবীন্দ্রসংগীতে তাঁর অসামান্য অবদান চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
