ভারত তথা বাংলা সঙ্গীতজগতের এক অতুলনীয় জ্যোতিষ্ক
৯ মে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন আর ১০ মে পঙ্কজ কুমার মল্লিকের। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালন করা হবে আর পঙ্কজবাবু ব্রাত্য থাকবেন তাও কি সম্ভব! এই দুই প্রতিভার জন্ম হয়েছিল বোধহয় একে অপরের সঙ্গে জুড়ে থাকার জন্যই। আত্মার যোগাযোগ যাকে বলে। তিরিশের দশকে পঙ্কজ মল্লিক যেমন রবীন্দ্রনাথের গানকে সর্বপ্রথম নিতান্ত খেটে-খাওয়া বাঙালি থেকে শুরু করে বাংলার বাইরের বিপুল সংখ্যক শ্রোতার দরবারে পেশ করেছিলেন তেমনই, শোনা যায় রবীন্দ্রনাথও নাকি ভালোবেসে বলেছিলেন, জীবদ্দশায় যে সব গানে তিনি সুর করে যেতে পারবেন না, সেগুলিতে সুরযোজনার দায়িত্ব যেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক নেন।
পঙ্কজ কুমার মল্লিক। ভারত তথা বাংলা সঙ্গীতজগতের এক অতুলনীয় জ্যোতিষ্ক। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদকে তিনি সব পুরস্কার ও সম্মানের ঊর্ধ্বে মনে করতেন। নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে হয়েও দুনিয়াদারি নয় আজীবন সুরের জগতকেই প্রাধান্য দিতেন পঙ্কজবাবু। তাই তো, কলেজ পড়ুয়া পঙ্কজ একবার দুম করে একটা কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের গান-কবিতায় মুগ্ধ হয়ে সুর দিয়ে ফেলেন ‘শেষ খেয়া’ কবিতায়। শুধু সুর দিয়েই থেমে থাকেননি, গানটি তিনি প্রকাশ্যে গাইতেও শুরু করেন। যখন রবীন্দ্রনাথের কোনও গান প্রকাশিত স্বরলিপি ছাড়া গাওয়া যেত না, সেই সময়ই দুঃসাহসটি দেখিয়েছিলেন তিনি। গানপাগল মানুষ। তখনও নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে কাজ শুরু করেননি, প্রথম বার জোড়াসাঁকোয় গিয়ে রথীন্দ্রনাথের হালকা বকুনি শুনে, ‘ওটা রবি ঠাকুরেরই সুর, বন্ধুর কাছে স্বরলিপি আছে, পরে দেখাব’ গোছের একটা কিছু বলে সে বারের মতো ‘ম্যানেজ’ দিয়েছিলেন, এমনটাই জানা যায় দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের একটি লেখায়।
কিন্তু, পরের বার পঙ্কজ মল্লিক গিয়ে পড়লেন সোজা বাঘের মুখে। আর সেটাই বোধহয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। কবির ঘরে একটা বিরাট হ্যামিল্টন অর্গান থাকত। চোখের ইশারায় সেই অর্গানটি দেখিয়েছিলেন কবি। তটস্থ পঙ্কজ মল্লিক যাবতীয় সাহস সঞ্চয় করে গেয়েছিলেন ‘আমায় নিয়ে যাবি কে রে, দিনশেষের শেষ খেয়ায়, ওরে আয়, দিনের শেষে…’। শোনা যায়, গানটি শুনে রবীন্দ্রনাথ যেন ধ্যানস্থ হয়ে চুপ করে বসেছিলেন।
আরও কিছু ঘটনা। ১৯৩১ সাল। সবে পথ চলতে শুরু করেছে কলকাতা বেতার কেন্দ্র। অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন সেখানকার তরুণ ব্রিগেড। নেতৃত্বে স্টেশন ডিরেক্টর নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ মজুমদার। চলছে নানা পরীক্ষা। তার মধ্যেই ‘বেতার জগৎ পত্রিকা’র সম্পাদক প্রেমাঙ্কুর আতর্থী হঠাৎই বুদ্ধি দিলেন শ্রী শ্রী চণ্ডীর কাহিনি নিয়ে একটি গান এবং শ্লোক সংকলন রচনা করার। আইডিয়াটা বেশ মনে ধরে স্টেশন ডিরেক্টর নৃপেনবাবুর।
তার আগেই এই ভাবেই সরস্বতী শীর্ষক একটি সংগীত বিচিত্রা রচনা করেছিলেন বাণীকুমার। ‘বসন্তেশ্বরী’ নামের সেই প্রযোজনা বেশ সফল হয়। তার ওপর ভিত্তি করেই বাণীকুমার রচনা করলেন শারদ বন্দনার একটি গীতি আলেখ্য। ১৯৩২ সালের দেবী পক্ষের মহাষষ্ঠীতে সেটি প্রচারিত হয়। তখন সেই অনুষ্ঠানের নাম ছিল “মহিষাসুর বধ”। তারপর নাম হয় “মহিষাসুরমর্দিনী”। সেটা ১৯৩৭।
সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন বেতারের জনপ্রিয় গানের ক্লাসের মাস্টারমশাই পঙ্কজ কুমার মল্লিক। তখনই তিনি এক নাম। বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছেন। শারদপ্রাতের আলেখ্যতে প্রাণ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন তিনি। সেই সঁপে দেওয়ার জন্যই যে এক দিন চূড়ান্ত অপমানিত হতে হবে, কোনও কালে ভাবেননি। অথচ তাই-ই হল। তা’ও জীবনের একেবারে উপান্তে। শারদ উৎসবের এই প্রভাতী অনুষ্ঠান প্রাণ ছিল পঙ্কজ মল্লিকের। সন্তান স্নেহে গড়ে তুলেছিলেন প্রযোজনাটিকে। অনেক ঝড় সামলেছেন অনুষ্ঠানের জন্য। আনকোরা শিল্পীদের তালিম দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন অনুষ্ঠানের জন্য। দীর্ঘ কাল ধরে চলে আসা তাঁর স্বপ্নের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ হঠাৎ এক বার বন্ধ করে নতুন আকার দিয়ে সম্প্রচার করা হল। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকেও জানানো হয়নি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নতুন করে সুর দেন ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-তে। পরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ করেন উত্তমকুমারও (অনিচ্ছা স্বত্বেও)। এমনটা যে হবে, ঘুণাক্ষরে জানতেন না পঙ্কজবাবু। কিছু বলেননি শুধু ক্ষত রয়ে গেছিল পাঁজরে! উল্লেখযোগ্য বিষয় হল উত্তমকুমারের সেই ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ প্রত্যাখ্যান করেছিল জনতা।
বাবা মণিমোহন মল্লিকের সঙ্গীতের প্রতি গভীর আগ্রহ, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম এবং রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্য তাঁর ভিত পোক্ত করেছিল। ১৯২৭ সাল থেকে তিনি কলকাতার ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনে কাজ শুরু করেন। এই সংস্থা পরে অল ইন্ডিয়া রেডিও (এআইআর বা আকাশবাণী) নামে পরিচিত হয়। ২৪ বছর বয়সে রেডিওতে শুরু করেন সঙ্গীত শিক্ষার আসর। তখনকার স্টেশন ডিরেক্টর নৃপেন মজুমদারের আগ্রহে। সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান। প্রতি রবিবার সকালে রেডিয়োতে চলত গানের ক্লাস। শুধুমাত্র কলকাতা বেতারকে জনপ্রিয় করে তোলা নয়, সঙ্গীতচর্চাকে মধ্যবিত্ত বাঙালির মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে। তখন বাড়ির বাইরে গান শিখতে যাওয়া এত সহজ ছিল না।
অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল এই “সঙ্গীত শিক্ষার আসর”। টানা ৪৭ বছর ধরে তিনি রেডিয়োতে গানের ক্লাস নিয়েছেন বাঙালির জন্য। সমবেত কণ্ঠে শ্যামল মিত্র, অরুণকৃষ্ণ ঘোষ, ধীরেন বসু, রবীন বন্দোপাধ্যায়, ইলা বসু, আরতি মুখোপাধ্যায় প্রমুখ সেই অনুষ্ঠানে গাইতেন। পঙ্কজ মল্লিককে সহায়তা করতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সঙ্গতে সহায়তা করতেন মৃত্যুঞ্জয় বন্দোপাধ্যায়।
বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সঙ্গীত শিক্ষার আসরও। বাড়িতে চিঠি পাঠিয়ে। সেবারও রাতারাতিই। তাঁর নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন দিনটির কথা, “মীরাবাঈ ভজন শেখাতে আরম্ভ করেছিলাম। এমন সময় অকস্মাৎ এক দিন আমার বাসভবনের ঠিকানায় এল এক চিঠি, পত্রলেখক কলকাতা বেতার কেন্দ্রের তদানীন্তন স্টেশন ডিরেক্টর। … অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হল। এক বোবা যন্ত্রণা আমাকে নির্বাক করে দিয়েছিল।… যে মীরাবাঈ ভজনটি শেখাতে আরম্ভ করেছিলাম সেটিকে, বলা বাহুল্য, শেষ হতে দেওয়া হল না।’’
আর একবার ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম-ক্র্যাফট’-এর নাম বদলে হয়ে গিয়েছে ‘নিউ থিয়েটার্স লিমিটেড’। ওদের প্রথম সবাক ছবি ‘দেনাপাওনা’। কাহিনি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পরিচালক প্রেমাঙ্কুর আতর্থী। ক্যামেরাম্যান নীতিন বসু। ছবি মুক্তি পেল। কিন্তু, এ কী! ক্রেডিট টাইটেলে সহকর্মী বড়ালের নাম বড় বড় অক্ষরে। পঙ্কজ মল্লিকের নাম ছোট ছোট করে। আবারও দুঃখ পেয়েছিলেন।
গণ প্রতিবাদের উত্তাপে তাঁর সুরারোপিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ ফিরে এসেছিল ঠিকই, ফিরে পাননি অসমাপ্ত কাজ–বিস্ময়, অপমান, দুঃখ, ক্ষোভের দিনগুলি।
পঙ্কজ কুমার মল্লিক কেন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, আমার এই প্রশ্ন শুনে হেসে ফেলেন ব্যারিকেড ভাঙা গানওয়ালা কবীর সুমন। ক্ষীণ হাসি নিয়েই ৭৩-এর কণ্ঠস্বর ফোনের ওপার থেকে বলে ওঠে, “পঙ্কজ কুমার মল্লিককে নিয়ে কি আর বলবো। একমাত্র আমিই তো তাঁর কথা বলে এসেছি। আর তো কেউ বলে না! এখনও সকলে খুব ঘটা করে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করেন, অথচ পঙ্কজ কুমার মল্লিকের কথা কেউ বলেন না। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নিয়েও বাঙালি মাতামাতি করে থাকেন, অথচ কেউ জানেন না ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সুরকার কে। এই তো অবস্থা। একটা সময় এল যখন ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ উঠে গেল। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ রিরেকর্ড করা হল। পঙ্কজবাবুকে বাদ দিয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র সুর করার ভার দেওয়া হল, যিনি কিনা পঙ্কজ কুমার মল্লিকের ভাবশিষ্য। পঙ্কজ বাবু তখন বেঁচে ছিলেন। ১৯৭৭ সাল বোধহয়। আমি সেসময় জার্মানিতে থাকতাম, কলকাতায় এসেছিলাম মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে। খবরটা পেয়ে আমি রবীন্দ্রসদনে গিয়ে একা একা ‘প্রোটেস্ট’ করেছিলাম।”
পঙ্কজ কুমার মল্লিকের ‘কন্ট্রিবিউশন’ বলে শেষ করার নয়। অথচ… প্রতিবাদ প্রসঙ্গে মনে পড়ল। ২০০৫। একক অনুষ্ঠানের মঞ্চে গিটার হাতে কবীর সুমন গাইছেন ‘বন্দেমাতরম’। তবে, সে সুর অচেনা। কেউ গায় টায় না বিশেষ। চাঁচাছোলা উচ্চারণে কবীর গাইছেন। শ্রোতাদের কানে গমগম করছিল অন্যরকম সুর। যে গান নিজের সুরে গড়েছিলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক। ২০০৫, সালটি ছিল পঙ্কজবাবুর জন্মশতবর্ষ। সংরক্ষণ ও সচেতনতার অভাবে প্রজন্মের কাছে পঙ্কজ কুমার মল্লিক বিস্মৃত হয়েছে, এর প্রতিবাদে… সেদিন তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতেই ‘বন্দেমাতরম’ গেয়েছিলেন কবীর সুমন।
সূত্রঃ
আনন্দবাজার পত্রিকা, দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ, পঙ্কজ কুমার মল্লিক ফাউন্ডেশন
ঋণঃ
কবীর সুমন