রবীন্দ্রনাথের ‘প্যাট্রিয়টিজম’, ভারতমাতা, স্বদেশী সমাজ, পাপের মার্জনা, ভাষা আর সামান্য কৌতুক

বাংলার ভোট বাজারে বাঙালির 'গুরুদেব' রবীন্দ্রনাথ

বাঙালিরা যেমন মাতৃভাষাপ্রেমী, জাতিপ্রেমী, তেমনই উদার। কোনও অবাঙালি যদি মিষ্টি হেসে বলেন ‘হামি কলকাতার রসগুল্লা-মিষ্টি দহি খেতে খুব ভালবাসে’/‘বাংলা আমি তুমাকে ভালবাসে’ অথবা কোনও প্রবাসী বাঙালি বা কেউকেটা বাঙালি যদি বলেন ‘ইলিশ ভাপা, চিংড়ির মালাইকারি আর আলু-পোস্তটা এখনও ছাড়তে পারিনি’… ব্যস! বলাই বাহুল্য, চিন্তা-ভাবনা-কর্মের জন্য বাঙালি জাতি যেমন সারা বিশ্বে বন্দিত, তেমন তাদের আবেগও সর্বজনবিদিত। যেমন, আমেদাবাদে এসে মহান ভারতীয়দের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ‘বিবেকামুন্নন’- এর নাম নেন,  তাতে কি আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় স্বামী বিবেকানন্দর কথা বলা হচ্ছে! অথবা, ‘আত্মনির্ভর’ ভারতের কথা বলতে গিয়ে যখন বাংলা ভাষা তথা রবীন্দ্রনাথ কোট করে বলা হয়, 'চোলাই চোলাই বাজবে জোয়ের বেরি', আমরা বুঝে যাই ‘চলায় চলায় বাজবে জয়ের ভেরী’ই বলা হচ্ছে। এক্ষেত্রে, ভাষার প্রয়োগটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কে বলছেন সেটাই দ্রষ্টব্য। অত বড়ো বড়ো মানুষের মুখে একজন বাঙালির নাম উঠে আসা কি চাট্টিখানি কথা! স্যান্ডি সাহা, রোদ্দুর রায়, নাসিরুদ্দিন শাহ বা পাড়ার কেষ্টু-বিষ্টু হলে ব্যাপারটা অন্যরকম হত।

বাংলার ভোট বাজারে মাঝেমধ্যেই যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন বাঙালির 'গুরুদেব' রবীন্দ্রনাথ, তা দেখে জানতে বড় সাধ হচ্ছে, বাঙালি কি তাঁর ‘ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ’, ‘স্বদেশী সমাজ’, 'পাপের মার্জনা' ইত্যাদি প্রবন্ধ পড়েছেন? নিশ্চয়ই পড়েছেন। আসলে, প্রবন্ধগুলিতে রাষ্ট্র-বর্ণিত সিলেবাসের বিভিন্ন সাবজেক্ট রয়েছে, যেমন- ‘প্যাট্রিয়টিজম’, ভারতমাতা ইত্যাদি ইত্যাদি।

যেমন, ‘ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ একটি অনুচ্ছেদে লিখেছেন:

‘আমাদের প্রথম বয়সে ভারতমাতা, ভারতলক্ষ্মী প্রভৃতি শব্দগুলি বৃহদায়তন লাভ করিয়া আমাদের কল্পনাকে আচ্ছন্ন করিয়াছিল। কিন্তু মাতা যে কোথায় প্রত্যক্ষ আছেন, তাহা কখনো স্পষ্ট করিয়া ভাবি নাই-লক্ষ্মী দূরে থাকুন, তাঁহার পেচকটাকে পর্ষন্ত কখনো চক্ষে দেখি নাই। আমরা বায়রনের কাব্য পড়িয়াছিলাম, গারিবলডির জীবনী আলোচনা করিয়াছিলাম এবং প্যাট্রিয়টিজমের ভাবরস-সম্ভোগের নেশায় একেবারে তলাইয়া গিয়েছিলাম।

মাতালের পক্ষে মদ্য যেরূপ খাদ্যের অপেক্ষা প্রিয় হয়, আমাদের পক্ষেও দেশহিতৈষণার নেশা স্বয়ং দেশের চেয়েও বড় হইয়া উঠিয়াছে। যে দেশ প্রত্যক্ষ তাহার ভাষাকে বিস্মৃত হইয়া, তাহার ইতিহাসকে অপমান করিয়া, তাহার সুখ-দু:খকে নিজের জীবনযাত্রা হইতে বহু দূরে রাখিয়াও আমরা দেশহিতৈষী হইতেছিলাম।'

আবার, ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে লিখেছেন:

‘আমি স্পষ্ট করিয়া বলিতেছি রাজা আমাদিগকে মাঝে মাঝে লগুঢ়াঘাতে তাহার সিংহদ্বার হইতে খেদাইতেছেন বলিয়াই যে অগত্যা আত্মনির্ভরকে শ্রেয় জ্ঞান করিতেছে, কোনওদিনই আমি এরূপ দুর্লভ-দ্রাক্ষাগুচ্ছ-লুব্ধ হতভাগ্য শৃগালের সান্ত্বনাকে আশ্রয় করি নাই। আমি এই কথাই বলি, পরের প্রসাদভিক্ষাই যথার্থ ‘পেসিমিস্ট’ আশাহীন দিনের লক্ষণ। গলায় কাছা না লইলে আমাদের গতি নাই এ-কথা আমি কোনোমতেই বলিব না; আমি স্বদেশকে বিশ্বাস করি, আমি আত্মশক্তিকে সম্মান করি। আমি নিশ্চয়ই জানি যে, যে উপায়েই হউক, আমরা নিজের মধ্যে ঐক্য উপলব্ধি করিয়া আজ যে সার্থকতা লাভের জন্য উৎসুক হইয়াছি, তাহার ভিত্তি যদি পরের পরিবর্তনশীল প্রসন্নতার উপরেই প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তাহা পুন:পুন:ই ব্যর্থ হইতে থাকে। অতএব ভারতবর্ষের যথার্থ পথটি যে কী, আমাদিগকে চারি দিক হইতেই তাহার সন্ধান করিতে হইবে।’

তৃষ্ণার্ত হইয়া চাহিলাম একঘটি জল

তাড়াতাড়ি এনে দিলে আধখানা বেল।

কোনও তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি যদি তেষ্টায় কারো কাছে একঘটি জল চান এবং পরিবর্তে তাকে এনে দেওয়া হয় একটি বেল, এতে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির আনন্দিত হওয়ার যুক্তিসঙ্গত কোনও কারণ থাকে না। কিন্তু বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকলে এক সময় বাধ্য হয়ে মুখে হাসি নিয়ে জলের পরিবর্তে বেল-ই খেতে হয় তাকে।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘পাপের মার্জনা’ প্রবন্ধে লিখেছেন,

‘আমাদের প্রার্থনা সকল সময়ে সত্য হয় না, অনেক সময়ে মুখের কথা হয়—কারণ, চারি দিকে অসত্যের দ্বারা পরিবৃত হয়ে থাকি বলে আমাদের বাণীতে সত্যের তেজ পৌঁছয় না। কিন্তু ইতিহাসের মধ্যে জীবনের মধ্যে এমন এক একটি দিন আসে, যখন সমস্ত মিথ্যা এক মুহূর্তে দগ্ধ হয়ে গিয়ে এমনি একটি আলোক জেগে ওঠে যার সামনে সত্যকে অস্বীকার করবার উপার থাকে না। তখনি এই কথাটি বারবার জাগ্রত হয়: বিশ্বানি দেব সবিতর্দুরিতানি পরাসুব। হে দেব, হে পিতা, বিশ্বপাপ মার্জনা করো।’

একজন লেখক বেঁচে থাকেন তাঁর কলমের জোরে, কলম-নিঃসৃত ভাষায়। চারপাশে যা ঘটছে, তার পাশে রবীন্দ্রনাথের এই প্রবন্ধগুলি পড়লে-ভাবলে একথা বোঝা কঠিন হবে না যে, রবীন্দ্রজয়ন্তী-বাইশে শ্রাবণ-বসন্তউৎসব ইত্যাদি সারহীন ফাঁপা হট্টগোলের ভিতর দিয়ে অধুনা বাঙালি জাতির কাছে রবীন্দ্রনাথকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে সুবিধাবাদের ভাষায়, অনগ্রসর প্রাতিষ্ঠানিক হীনতায়; আর সেকারণেই দেশ ও দশের কাছে বাত্য থেকে যায় উপরে উল্লিখিত রবীন্দ্র-প্রবন্ধগুলি। চেতনা নয়, রবীন্দ্রনাথ বেঁচে আছেন শুধুমাত্র মুখস্থ করা দু-চারটি পঙক্তিতে। যতটুকু দরকার শুধু ততটুকুর মধ্যে কারারুদ্ধ হয়ে থাকা মানবজীবনের ধর্ম হতে পারে না। আমাদের দেহ সাড়ে তিন হাতের মধ্যে বদ্ধ হতেই পারে, তাই বলে ঠিক সাড়ে তিন হাত বাড়ি তৈরি করলে চলে না। একফালি নর্দমাও ‘প্রমোটার’দের নজর এড়ায় না আর, স্বাধীন চলাফেরার জন্য চেতনার মুক্ত উঠোনও আজ বিক্রি হয়ে গেছে। তাই নয় কি?

 

গ্রন্থঋণঃ

সংকলন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Developed by DXDasia