‘কারাগার’ জুড়ে রুদ্ধশ্বাস, মৌন অভিনয়ে মুগ্ধ করলেন চঞ্চল চৌধুরী

‘কারাগার’ ওয়েব সিরিজের একটি বঙ্গদর্শন-রিভিউ

হুদিনের পুরোনো এক কারাগারে বন্দি শয়ে শয়ে কয়েদি। কারাগার জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য রোমহষর্ক গল্প। আছে কারাগারবন্দি রাজনীতি। তবে কারাগারের সবচেয়ে রহস্যজনক জায়গা ১৪৫ নম্বর সেল। যা গত পঞ্চাশ বছর ধরে বন্ধ। রটনা আছে ওই সেলে যাকেই ঢোকানো হয়, সে-ই নাকি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। তাই সেই সেল বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কিন্তু একদিন হঠাৎ সেখানে ‘আবির্ভূত’ হলেন এক আগন্তুক। দরজার মরচে পড়া তালা ভাঙা হল। দেখা গেল, আগন্তুকের মাথাভর্তি সাদা চুল, মুখ জুড়ে গোঁফদাড়ি। গায়ের পোশাক অপরিচ্ছন্ন। এমনকি তার পোশাক অন্যান্য কয়েদিদের সঙ্গে মেলে না। গল্পের মোড় ঘুরে যায়।

সম্প্রতি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এবং ওয়েব সিরিজে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। শুধুমাত্র পরিচালনা বা অভিনয় শৈলীতে নয়, সামগ্রিক নির্মাণে। ‘হাওয়া’ (পড়ুন রিভিউ) চলচ্চিত্রের পর ‘কারাগার’ ওয়েব সিরিজ (Karagar Web Series)-ও মুগ্ধ করল দর্শকদের। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই দুটি কাজেই অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী, যিনি এই মুহূর্তে দুই বাংলার ‘সেনসেশন’। ‘হইচই’ ওটিটি প্ল্যাটফর্মে অগাস্ট মাসে মুক্তি পেয়েছিল ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় ‘কারাগার’-এর প্রথম সিজন। তথ্য বলছে, এই সিরিজের ভিউয়ার্স সাড়া জাগানো, এমনকি এই সিরিজের জন্য সাবস্ক্রিপশনও বেড়েছে হু-হু করে। কী এমন আছে এই ওয়েব সিরিজে?

আছে চঞ্চল চৌধুরীর (Chanchal Chowdhury) অসামান্য মৌন অভিনয়। শারীরিক অভিব্যক্তিতে তিনি প্রতিটি দৃশ্য জীবন্ত করে তুলেছেন। ঘটনার সূত্রপাত আকাশনগর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে। সেখানে হঠাৎ একদিন কয়েদি গোনার সময় জেলের প্রহরীরা আবিষ্কার করেন, একজন কয়েদি সংখ্যায় বেশি। যাকে পাওয়া গিয়েছে অভিশপ্ত ১৪৫ নম্বর সেলে। এখন প্রশ্ন উঠবে কেন ১৪৫! কোরানে জন্ম এবং মৃত্যু দুটি শব্দ উচ্চারিত হয়েছে ১৪৫ বার। তাই কারাগারের অন্যান্য কয়েদিরা মনে করছে আগন্তুক আসলে আল্লার দূত অথবা কোনো জিন। কিন্তু কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আগন্তুক মূক ও বধির। শুধুমাত্র লিখতে জানেন। বাংলা-ইংরেজি না, ফারসি ভাষা। যেখান থেকে উদ্ধার করা যায় মাত্র দুটি শব্দ ‘মীরজাফর’ এবং ‘২৫০’।

তাঁর কথা বোঝার জন্য এবং দর্শকদের কাছে উপস্থাপনের জন্য অসামান্য সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করা হয়েছে। ইন্টারপ্রিটার এসে আগন্তুককে প্রশ্ন করেন এবং উত্তরে জানা যায়, এই আগন্তুক নাকি পলাশির যুদ্ধের সময় মীরজাফরের রাঁধুনি ছিলেন এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করায় তিনিই নাকি মীরজাফরকে খুন করেছিলেন। সেই অপরাধে ২৫০ বছর ধরে তিনি কারাগারে বন্দি।

কোরানে জন্ম এবং মৃত্যু দুটি শব্দ উচ্চারিত হয়েছে ১৪৫ বার। তাই কারাগারের অন্যান্য কয়েদিরা মনে করছে আগন্তুক আসলে আল্লার দূত অথবা কোনো জিন। কিন্তু কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আগন্তুক মূক ও বধির।

রহস্য আরও জটিল হয়। প্রতি মুহূর্তে তৈরি হয় চাপা টেনশন। কারাগার ওয়েব সিরিজে সংশোধনাগারের নির্মম রাজনীতিকে প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। চমৎকার ভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে ইতিহাস। গল্পের ভিতরের রহস্যে অনেক স্তর থাকে, যেখানে ভায়োলেন্সকে চমৎকার ভাবে প্রয়োগ করার প্রবণতা দেখা যায়, বিশেষত থ্রিলারে। পরিচালক এখানে কোনো সাদামাটা গল্প বলতে চাননি, বরং চরিত্রের ক্রাইসিসকে আরও প্রকট ও প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। সংশোধনাগারের মধ্যে দেখানো হয়েছে বড়ো ধরনের সিন্ডিকেট গ্রুপ, যারা বিশেষ একটি মিশনকে সাকসেসফুল করতে চায়। আর সবটাই জড়িত কারাগারের সঙ্গে। উপস্থাপিত হয়েছে কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস।

 

 

সাতটি পর্বে কারাগার-এর প্রথম সিজন জমজমাট। বড়ো-ছোটো চরিত্রে যাঁরা অভিনয় করেছেন, সকলেই নিজগুণে অসামান্য কাজ করেছেন। উল্লেখ করতে হয় আফজাল হোসেন, ইন্তেখাব দিনার, বিজরী বরকতুল্লাহ, তাসনিয়া ফারিন, এফ এস নাঈম, এ কে আজাদ সেতুর কথা। বাংলাদেশের পটভূমিতে নির্মিত এই সিরিজটিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী। ‘তাকদীর’ (২০২০)-এর পর সৈয়দ আহমেদ শাওকী ও চঞ্চল চৌধুরী জুটির দ্বিতীয় ওয়েব সিরিজ এটি। চঞ্চল চৌধুরীর অন্যতম মাস্টারপিস হয়ে থাকবে ‘কারাগার’। মূক ও বধির চরিত্রে এই প্রথম তিনি অভিনয় করলেন৷ অভিনয়ের প্রতিষ্ঠান যদি কিছু হয়ে থাকে, তার অন্যতম নাম হিসেবে থাকবে চঞ্চল চৌধুরী। গল্প, চিত্রনাট্য এবং পরিচালনা সৈয়দ আহমেদ শাওকীর। প্রত্যেকটি পর্বের চমৎকার নামকরণ করেছেন তিনি — পুনরুত্থান (পর্ব ১), কুলাঙ্গার (পর্ব ২), জীবন ও মৃত্যু (পর্ব ৩), ইতিহাস ও রহস্য (পর্ব ৪), আলো ও ছায়া (পর্ব ৫), আত্মা ও ভূত (পর্ব ৬) এবং কুল হারানো ভেড়া (পর্ব ৭)। পরিচালক আশা জাগিয়েছেন। তাই দ্বিতীয় সিজনের অপেক্ষায় আপামর দর্শক।

Developed by DXDasia