
এই বাংলায় স্থানবিশেষে বিখ্যাত সব পুজোগুলো ধরলে এককথায় যে নামগুলি আসে, তা হল কলকাতার দুর্গাপুজো, নবদ্বীপ-শান্তিপুরের রাস, চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর মতো একই সারিতে অবস্থান করে কাটোয়ার কার্তিক পুজো। যদিও সারা বাংলায় তা প্রচারিত কাটোয়ার কার্তিক লড়াই নামে। কার্তিক পুজো থেকে কার্তিক লড়াই কীভাবে হল এবং কীভাবেই বা তা সারা বাংলাতে প্রচার পেয়ে জনপ্রিয় কাটোয়ার লড়াই নামে আখ্যায়িত হল, আজ সেটুকুই তুলে ধরার চেষ্টা করব। এখন আমরা যদি ইতিহাসের পাতা ধরে হাঁটতে শুরু করি তাহলে আমাদের যেতে হবে সেই চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের যুগে, যখন ভারত ভ্রমণে বের হয়ে গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস এসে উপস্থিত হয়েছিলেন কাটোয়ার প্রান্তে। তিনি উল্লেখ করেছিলেন এক সমৃদ্ধ নগরের কথা, যার নাম ‘কটদুপা’। অর্থাৎ প্রাচীনকাল থেকেই কাটোয়া একটি সমৃদ্ধ নগরী ছিল, যা মধ্যযুগ এমনকি আধুনিক যুগেও কাটোয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসাবে তার অবস্থানকে ব্যক্ত করে। এই শহরের গায়ে অজয় ও ভাগীরথীর সংগমস্থল, মাত্র বারো কিমি দূরে মুর্শিদাবাদ, কুড়ি কিমি দূরে বীরভূম আর ভাগীরথীর ওপারে নদিয়া অর্থাৎ চারটি জেলার সংযোগস্থল।

এই অবস্থানগত গুরুত্বের জন্যই কাটোয়ার এত প্রশস্তি শোনা যায়। মধ্যযুগে কাটোয়াতে ব্যবসার সমৃদ্ধি হু-হু করে বাড়তে থাকে, কৃষিজ পণ্যাদি – যেমন পাট, রবিশস্য বা তৈলবীজের রপ্তানি আর আমদানির মধ্যে অন্যতম ছিল লবণ, কাঠের সামগ্রী, দেশলাই, খইল ইত্যাদি। লবণের ব্যবসা যে রমরমা ছিল তার কারণে আজও কাটোয়াতে ‘লবণগোলা’ স্থানটির নাম পাওয়া যায়। মধ্যযুগ পেরিয়ে কাটোয়া অঞ্চলে বিপুল পরিমাণে কাঁসাপিতলের ব্যবসার সমৃদ্ধি ঘটে। মূলত এই ব্যবসাগত কারণেই আমদানি ও রপ্তানির জন্য স্থলপথের তুলনায় জলপথকে বেশি ব্যবহার করা হত তাই ভাগীরথী ও অজয়ের তীরে কাটোয়ার বিভিন্ন ঘাটের গুরুত্ব বাড়তেই থাকে, যার মধ্যে অন্যতম হল কাটোয়ার আজকের জেটিঘাট। বিভিন্ন প্রদেশ থেকে বাণিজ্যের জন্য এখানে এসে উপস্থিত হতেন বিচিত্র সব বণিকের দল। তাদের খাওয়া-দাওয়া, থাকার জন্য স্থান যেমন তৈরি হল, তেমনি তৈরি হল তাদের আমোদপ্রমোদের জন্য বিশাল একটি বারবনিতাদের মহল্লা।
উল্টোদিকে এ-ও শোনা যায়, সেই সময়ের বাবু বা মহাজনদের ফুর্তির জন্যও প্রচুর রক্ষিতা থাকত আর তৎকালীন কাটোয়া মানে সাবেকি কাটোয়া, যেটি নিচুবাজার, বড়োবাজার, খড়ের বাজারের কিছু স্থানকে নিয়ে নির্মিত আর আজকের কাটোয়া মানে স্টেডিয়াম, স্টেশন বাজার, সার্কাস ময়দান, সুবোধ স্মৃতি রোড প্রভৃতি। এককালে সেখানে ছিল কিছু অঞ্চল বন আর কিছু অংশ কৃষিক্ষেত অঞ্চল। তাই ভাগীরথী তীরে (আজকের হরগৌরী পাড়াতে) সেই বারবণিতাদের অন্ধকার জীবনে একটা আশ্রয় খুঁজতে তারা তাদের প্রিয় বাবুদের কাছে বায়না করে সন্তানলাভের জন্য। কিন্তু সমাজব্যবস্থায় গণিকার সন্তানকে কেউ মেনে নেয় না। সেই বাসনা থেকেই তাদের বাবুরা নিষিদ্ধপল্লিতে কার্তিক পুজোর আয়োজন করে। কার্তিক এমনিতেই প্রজননের দেবতা, প্রাচীনকালে নিষিদ্ধপল্লিতে তাঁর পুজোও হত। অনেকে বলেন কার্তিক আসলে দক্ষিণ ভারতে পূজিত দেবতা মুরুগান, দ্রাবিড়ীয় প্রভাবেই বাংলায় তাঁর পুজো শুরু হয়। সে যাই হোক, কাটোয়ার নিষিদ্ধপল্লির সেই গণিকাদের বাসনার ঠাকুর নেংটো কার্তিক বা অনেকে বলেন খোকা কার্তিক ক্রমেই জনপ্রিয়তা লাভ করে, যার ধারা আজও বহমান।
পরে এই কার্তিক পুজো নিয়ে শুরু হয় আভিজাত্য প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা, কোন বাবু বেশি খরুচে, কোন বাবু শ্রেষ্ঠ, এই বার্তা প্রতিষ্ঠাতে প্রত্যেক বাবু তার ঠাকুরের জন্য আলাদাভাবে বিচিত্র আলোক প্রদর্শন ও শোভাযাত্রার আয়োজন শুরু করে। এই শোভাযাত্রা ধীরেধীরে আভিজাত্যের লড়াইয়ে পরিণত হয়, যা আজকের ক্লাবভিত্তিক কার্তিক লড়াই। এই কার্তিক লড়াইয়ের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল আলো-প্রদর্শন বাদ দিয়েও পুরাণীয় কাহিনিভিত্তিতে ‘থাকা’র প্রদর্শন (থাকা হল একাধিক পুতুলের সমাহার)। এই ‘থাকা’তে ফুটে ওঠে পুরাণ গল্প ভিত্তি করে হিরণ্যকশিপু বধ, দেবরাজ ইন্দ্রের সভাসদসহ রাজসভা, অর্জুনকে কৃষ্ণের বিশ্বদর্শন করানোর মতো চিত্রকল্পগুলো। যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে থিমের পুজো হলেও থাকার চল আজও আছে সাবেক কাটোয়ার পুজোগুলিতে, যেমন শাঁখারি পট্টির থাকা, ঝংকার ক্লাবের থাকা প্রভৃতি। তবে থিমের পুজোতেও অনন্য প্যান্ডেল আর প্রদর্শনীর সাক্ষী থেকে চলেছে জয়শ্রী, জনকল্যাণ, দেশবন্ধু, ইউনিক, সংহতি বা পানুহাটের নিউ আপনজনের মতো ক্লাবগুলো। এখানে পুজোর পরেরদিন সেই আগেকার প্রথামতোই সন্ধ্যাতে নিজেদের ঠাকুর বের করে শোভাযাত্রার লড়াই হয়।
২০১৯ সালে কাটোয়াতে ছোটো-বড়ো মিলিয়ে পুজোর সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াইশোর উপর। যার মধ্যে পুরোনো পুজোগুলো হল (সুবোধ স্মৃতি রোডে উইলিয়াম কেরি জুনিয়ারের সমাধি আছে, তার স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এখানে হয়) সাহেব কার্তিক। যেমন সুবোধ স্মৃতি বামফ্রন্ট পার্টি অফিসের সামনে পুজো হয় জামাই কার্তিকের, তাঁতিপাড়ার রক্ষণশীল বনেদিয়ানার প্রতীক সাত ভাই কার্তিক, কাশিগঞ্জ পাড়াতে বাংরা-কার্তিক, এদের মধ্যে বাংরা-কার্তিকই সবচেয়ে পুরোনো। তবে সবচেয়ে বিচিত্র হল এখানে কার্তিককে দেওয়া ভোগ ও মানতের বস্তুগুলো। একজন বাচ্চাকে ভুলে রাখার মতোই শিশু কামনায় মানতকারীরা মোয়া, লাড্ডু, কদমাতে ভোগ দেয় আর মানতের সামগ্রী হিসাবে খেলনা বল, এমনকি বেলুন পর্যন্ত দেওয়া হয়। যে মানত বা বাসনায় এককালে বারবনিতাদের ঈপ্সিত খোকা কার্তিক নেংটা বেশে কাটোয়াতে পুজো পেয়েছিল, আজ তা কাটোয়ার ঘরে ঘরে পূজিত হচ্ছে। তার সঙ্গে এলাহি প্যান্ডেল আর চন্দননগরের আলোকসজ্জাতে পুজোর কইয়েকটা দিন কাটোয়া মায়ানগরী হয়ে ওঠে। নবাবি যুগে বর্গিদের আক্রমণে কাটোয়ার ধনদৌলত লুণ্ঠন, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া বা ধনীব্যক্তিরা কাটোয়া ছেড়ে বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে না পড়লে, সেই আভিজাত্যের প্রাচুর্যে কে বলতে পারে কাটোয়ার কার্তিক লড়াই আরও প্রসার লাভ করত না!
