
ব্রহ্মপুত্র নদীর বুকের মধ্যে অবস্থিত মাজুলি পৃথিবীর বৃহত্তম নদীদ্বীপ। ভৌগোলিক অবস্থান মাজুলিকে এক অনন্য চরিত্র দিয়েছে। নদীর ক্রমাগত গতিপথ পরিবর্তন, বন্যা ও পলিসঞ্চয়ের ফলে মাজুলির ভূ-প্রকৃতি প্রতি বছরই নতুন রূপ ধারণ করে যা ভূতত্ত্ববিদদের কাছে এক জীবন্ত গবেষণাগার। চারদিক ঘেরা নদী, দ্বীপের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে থাকা ছোটো ছোটো বিলে, নালায় ও চরের বিস্তৃতি মাজুলিকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র জলভূমি-পরিবেশ। এখানকার মাটির উর্বরতা কৃষিনির্ভর জীবনে স্বচ্ছলতা এনেছে। বারবার ভূমিক্ষয় মানুষকে বাধ্য করেছে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে। এই টানাপোড়েনের মাঝেই মাজুলির সংস্কৃতি ও সভ্যতা গড়ে উঠেছে যেখানে প্রকৃতি শুধু পটভূমি নয়, জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০১৬ সালে অসম সরকার মাজুলিকে স্বতন্ত্র জেলা ঘোষণা করে। আগে মাজুলি জোরহাট জেলার অংশ ছিল। নতুন জেলার মর্যাদা পাওয়ার ফলে প্রশাসনিক সুবিধা যেমন বেড়েছে, তেমনি দ্বীপের পরিবেশ ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য আলাদা পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব হয়েছে।

সত্র হল মাজুলি ও অসমের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এটি শুধু মঠ নয়, বরং এক ধরনের শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের স্থান। এখানে সাধু বা ভক্তরা বসবাস করে, ভজন-কীর্তন, নাট্যকলা, নৃত্য ও ধর্মীয় আচার পালন করে। এছাড়াও, স্থানীয় মানুষের জন্য এটি শিক্ষা, নৈতিকতা এবং সংস্কৃতির এক সামাজিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
মাজুলির ইতিহাস অসমের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। পঞ্চদশ শতকে শ্রীমন্ত শংকরদেব ও তাঁর শিষ্য মাধবদেব এখানেই একতত্ত্ববাদ বা ‘এক শরণ নামধর্ম’-এর সূচনা করেন, যা পরবর্তীকালে অসমের সর্বাধিক প্রভাবশালী ভক্তি আন্দোলনে পরিণত হয়। মাজুলি হয়ে ওঠে এই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কেন্দ্রস্থল। শংকরদেবের প্রতিষ্ঠিত সত্র বা আশ্রমগুলো শুধু পূজা-অর্চনার স্থান নয়, বরং সংগীত, নৃত্য, নাটক, চিত্রকলা ও মুখোশশিল্পের শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও বিকশিত হয়। সত্র হল মাজুলি ও অসমের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এটি শুধু মঠ নয়, বরং এক ধরনের শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের স্থান। এখানে সাধু বা ভক্তরা বসবাস করে, ভজন-কীর্তন, নাট্যকলা, নৃত্য ও ধর্মীয় আচার পালন করে। এছাড়াও, স্থানীয় মানুষের জন্য এটি শিক্ষা, নৈতিকতা এবং সংস্কৃতির এক সামাজিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কামালাবাড়ি, গড়মুর, দক্ষিণপাট ও সামগুড়ি এই সত্রগুলো আজও সেই ঐতিহ্যের ধারক। মাজুলির মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সহাবস্থানে থেকে যে ভক্তিমূলক সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছিলেন, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আসামের জাতিসত্তার অংশ হয়ে ওঠে। মোগল আক্রমণ, ব্রহ্মপুত্রের ক্ষয়, রাজনৈতিক পরিবর্তন—সবকিছুর মাঝেও মাজুলি তার সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেছে। ফলে ইতিহাসে মাজুলি শুধু এক ভূখণ্ড নয়, বরং এক জীবন্ত উত্তরাধিকার—যেখানে ধর্ম, সমাজ ও শিল্প একসঙ্গে প্রবাহিত।

মাজুলির রাস উৎসব অসমের সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়। প্রতি বছর কার্তিক পূর্ণিমার সময় এখানে ধুমধাম করে রাস উৎসব পালিত হয়, যখন পুরো দ্বীপ ভক্তি, শিল্প আর আনন্দে জেগে ওঠে। মাজুলিতে প্রথম রাস উৎসব পালিত হয়েছিল দক্ষিণপাট সত্রে। ১৮৪০ সালে, সত্রের দশম সত্রাধিকারী বাসুদেব গোস্বামী এই উৎসবের আচার-অনুষ্ঠান শুরু করেন, যা পরবর্তীতে নাট্য ও সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার মাধ্যমে জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রথমদিকে এটি সীমিত আকারে কৃষ্ণলীলা মঞ্চায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, পরে তা সত্রভিত্তিক এক বিশাল উৎসবে পরিণত হয়। প্রতিটি সত্রে রাস পালনের ধরন আলাদা। কোথাও মুখোশনাট্য, কোথাও নৃত্যনাট্য, আবার কোথাও কাঠ, মাটি ও বাঁশের বিশাল স্থাপত্যে সাজানো জীবন্ত চিত্রমঞ্চ। এই বৈচিত্র্যই মাজুলির রাসকে অন্য সব অঞ্চলের রাসলীলা থেকে আলাদা করেছে। রাস উৎসব মূলত ভগবান কৃষ্ণের লীলা অবলম্বনে আয়োজিত হলেও, এর মধ্যে মিশে থাকে নাট্য, সংগীত, মুখোশ, নৃত্য ও লোকশিল্পের অনন্য সংমিশ্রণ। সামগুড়ি সত্রের মুখোশশিল্প মাজুলির অন্যতম গর্ব। এই শিল্পের ধারক-বাহক হিসেবে হেমচন্দ্র গোস্বামী জাতীয় স্তরে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর তৈরি বাঁশ, মাটি ও কাপড়ে নির্মিত মুখোশ শুধু ধর্মীয় নাটকে ব্যবহৃত হয় না, এখন তা আন্তর্জাতিক শিল্পমেলাতেও প্রদর্শিত হয়। এই মুখোশশিল্পই মাজুলির লোকঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পুনরুজ্জীবিত করে তুলছে।
আরও পড়ুন: কোচবিহারের রাসমেলার ইতিহাস
মাজুলিতে শুধু সত্রীয় ঐতিহ্য নয়, স্থানীয় মিসিং, ডেওরি, সোনোওয়াল কছারি, চুটিয়া প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর নৃত্য, সঙ্গীত ও পোশাকও রাস উৎসবে বিশেষ ভূমিকা নেয়। মিসিং সম্প্রদায়ের গুমরাগ নাচ, লোকগান ও বাঁশের বাদ্যযন্ত্রের সুরে রাস উৎসবের আবহ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ফলে এই উৎসব ধর্মীয় সীমা ছাড়িয়ে এক আন্তঃসাংস্কৃতিক মিলনের মঞ্চে পরিণত হয়। এই উৎসবের সময় শুধু স্থানীয় মানুষ নয়, দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক মাজুলিতে ভিড় জমান। অসম সরকার ও পর্যটন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজ্যে প্রায় ৯৮ লক্ষ অভ্যন্তরীণ পর্যটক এবং প্রায় ১৯ হাজার বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন, যার একটি বড়ো অংশ মাজুলির বিভিন্ন উৎসব, বিশেষত রাসকে কেন্দ্র করে। জেলা প্রশাসনের হিসেব বলছে, রাস উৎসবের সময় মাজুলিতে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার পর্যটক একত্রিত হন যা দ্বীপের জনসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। এই সময় স্থানীয় অর্থনীতি প্রাণ ফিরে পায়। হোমস্টে, নৌযান, হস্তশিল্প ও খাদ্যবিক্রির মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষ সরাসরি আয় করেন। সামগুড়ি সত্রের মুখোশশিল্পীরা এই সময় তাদের তৈরি মুখোশ বিক্রি করে বছরের বড় অংশের উপার্জন করেন।

মাজুলিতে প্রথম রাস উৎসব পালিত হয়েছিল দক্ষিণপাট সত্রে। ১৮৪০ সালে, সত্রের দশম সত্রাধিকারী বাসুদেব গোস্বামী এই উৎসবের আচার-অনুষ্ঠান শুরু করেন, যা পরবর্তীতে নাট্য ও সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার মাধ্যমে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
ভারতে এই উৎসবের রূপ সবচেয়ে বৈচিত্র্যময়—বৃন্দাবন ও মথুরায় রাসলীলা হয় নাট্যরূপে, নবদ্বীপ, কাঁথি বা নন্দীগ্রামে রাসমেলা হয় দেবমূর্তি, শোভাযাত্রা ও পুতুলনাট্যকে কেন্দ্র করে, মণিপুরে এটি ক্লাসিক্যাল নৃত্যের আকার নিয়েছে এবং মাজুলিতে ধর্মীয় নাটক, মুখোশনাট্য ও ভক্তিমূলক গানের সংমিশ্রণ। বাংলাদেশের কুমিল্লা, বরিশাল ও রাজবাড়িতেও রাসমেলা পালিত হয়, যা কখনও কখনও শ্যামা পূজার সঙ্গে মিলেমিশে যায়। নেপালের পাটন ও ভক্তপুরে কৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাসলীলা নাট্যমঞ্চে উপস্থাপিত হয়। উনিশ শতকে ভারতীয় শ্রমিকদের মাধ্যমে ফিজি, মরিশাস, ত্রিনিদাদ, গায়ানা ও সুরিনামের মতো দ্বীপদেশগুলোতেও এই উৎসব গিয়েছিল, যেখানে আজও স্থানীয় হিন্দু মন্দিরে রাসলীলা অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ইস্কনের উদ্যোগে রাসলীলা বা রাসমেলাধর্মী উৎসব পালিত হয় আধুনিক মঞ্চ, সংগীত ও নৃত্যের মাধ্যমে। ফলে রাস উৎসব আজ শুধু ধর্মীয় নয়, এটি হয়ে উঠেছে এক বিশ্বজোড়া সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার—যেখানে পুরোনো ভক্তি ও আধুনিক শিল্প মিলেমিশে নতুন এক ঐতিহ্য তৈরি করেছে। ২০০৪ সালে মাজুলিকে ‘UNESCO World Heritage Tentative List’এ অন্তর্ভুক্ত করা হয় ‘Cultural Landscape and Satra Tradition of Majuli’ শিরোনামে।

তবে এই উৎসবের ব্যাপক জনপ্রিয়তা যেমন মাজুলিকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিয়েছে, তেমনই পরিবেশ ও অবকাঠামোর উপর বাড়তি চাপও ফেলেছে। বন্যা, ক্ষয় আর সীমিত পরিবহনব্যবস্থার মধ্যে এই বিপুল পর্যটকসংখ্যা সামলানো কঠিন হয়ে ওঠে। তাই এখন প্রশাসন ও স্থানীয় সত্রগুলো টেকসই পর্যটন মডেলের দিকে ঝুঁকছে যেখানে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে উৎসবকে সংরক্ষণ করা যায়। এই ভাবেই মাজুলির রাস উৎসব কেবল ভক্তির নয়, টিকে থাকার, সংস্কৃতি রক্ষার এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে। ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯০০ সালের প্রথম ভাগে মাজুলির আয়তন ছিল প্রায় ১,২৫০ বর্গকিলোমিটার, যা ২০১৩ সালের মধ্যে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২২ বর্গকিমি। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ২০০৫‑২০১৭ সালের মধ্যে দ্বীপের ক্ষয় হয়েছিল বছরে প্রায় ৬.৭ বর্গকিমি, যা আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। শুধু আয়তন কমছে না, মাটি কম উর্বর হচ্ছে, বনজ ও জলাভূমির সংখ্যা কমে যাচ্ছে, যা দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এমন পরিস্থিতি বোঝায় যে মাজুলি এখনই বিপদের মধ্যে রয়েছে, কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থা নিলে এটি আরও কয়েক দশক টিকে থাকতে পারে।
_________________
ছবি ঋণ: শেলী মিত্র

