
“ভগবানের গুপ্তচর, মৃত্যু এসে বাঁধুক ঘর/ ছন্দে আমি কবিতা ছাড়ব না”। মাতৃগর্ভ থেকেই ছন্দ শিখেছিলেন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। কথার জাদুতে বাঁধতে চেয়েছিলেন বিশ্বের সব প্রান্তর। ছোটোবেলা কেটেছিল শান্তিনিকেতনে। সহপাঠী অর্মত্য সেনের সঙ্গে প্রকাশ করেছিলেন ‘স্ফুলিঙ্গ’ নামে একটি পত্রিকা। একই সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর কবিসত্তা ও বাউল-প্রীতি। ছোটো থেকেই তাঁর এক দুর্নিবার আকর্ষণ ছিল বাউল গানের প্রতি। লোকসংগীত, ভাটিয়ালি, সাঁওতালির সুরেও মেতে থাকতেন কবি।বাউল গান ছিল তাঁর জীবনী শক্তি। ছোটো থেকেই তাঁর ভিতরে বাউলসত্তার বীজ রোপণ ছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই বীজ মহীরুহে পরিণত হয়েছিল। (অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত)
সপরিবারে অলোকরঞ্জন। স্ত্রী, মা ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে।
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতায় যে বাউলসত্তা বারবার আলোচিত হয়, তা নিছক রূপক নয়, এটা তাঁর কাব্যদর্শনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যৌবনবাউল’ নামেই এই প্রবণতার ঘোষণা করে। যৌবনবাউল-এ আমরা দেখতে পাই মরণমদ মাতাল ডোম, জয়শ্রী জীবন, রুচিরাক্ষমালা, দারিদ্রধূসর ধানখেত, ধ্যান ধবলিমা, কান্না কীর্তনীয়াদের। এই বই থেকেই স্পষ্ট হয় যে কবির কাছে বাউলসত্তা মানে শুধু লোকসংগীতের অনুরণন নয় বরং দেহতত্ত্ব, আত্ম-অন্বেষণ, ভ্রমণ ও মুক্তির এক বিশেষ মিশ্রণ। তাঁর কবিতায় দেহকে দেখা যায় এক গোপন গ্রন্থাগারের মতো, যেখানে মৃত্যু ও জীবনের লীলাখেলা মিলেমিশে যায় যেমন এক জায়গায় তিনি লিখছেন, “মরণ মদমাতাল ডোম সবি করুক উপশম/ শ্মশানে, আমি জীবন ছাড়বো না” – এ ধরনের উচ্চারণ বাউলদের দেহে-ঈশ্বর অনুসন্ধানের ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয়। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই বাংলা কবিতার পাঠকের নজর টেনে নেয়। ভাষার বৈচিত্র্য, কারুকাজ, ছন্দের নকশায় অলোকরঞ্জন এক নতুন জগৎ তুলে ধরতে থাকেন পাঠকের সামনে। সেই জগতে আছে বাংলার গ্রাম, প্যালেস্তাইনের শরণার্থী শিবির, সান্তা মারিয়া হাসপাতাল, ছৌ থেকে কাবুকি। কলম কৃপণ করেননি কখনও, এমনকি দুর্বোধ্যতার সমালোচনা সত্ত্বেও।
ভাষার বৈচিত্র্য, কারুকাজ, ছন্দের নকশায় অলোকরঞ্জন এক নতুন জগৎ তুলে ধরতে থাকেন পাঠকের সামনে। সেই জগতে আছে বাংলার গ্রাম, প্যালেস্তাইনের শরণার্থী শিবির, সান্তা মারিয়া হাসপাতাল, ছৌ থেকে কাবুকি।
যৌবনবাউল-এর বিভাব কবিতায় লিখেছিলেন, “একটি মাত্র রাখাল যাক,/ এ মাঠ একলা পড়ে থাক/ নীরবে, আমি এ মাঠ ছাড়বো না”। ছাড়েননি। পূর্ণদাস বাউলের ১২টি গান তিনি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। তাই সমালোচকেরা তাঁকে আখ্যা দিয়েছেন ‘আধুনিক বাউল’ যিনি বাংলার লোকতত্ত্বকে বিশ্বসাহিত্যের পরিসরে টেনে এনে নতুন কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন। তাঁর কবিতায় এই বাউলসত্তা আসলে শিকড় ও ভ্রমণের দ্বৈত অভিজ্ঞতা, যেখানে ভিতরে রয়েছে দেশীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য আর বাইরে আছে বিশ্বসাহিত্যের মুক্তির পথ। যৌবনবাউল কাব্যগ্রন্থের প্রথম নাম ছিল ‘পরাণ আমার স্রোতের দিয়া’, কিন্তু পরে তা বদলে হয়ে ওঠে যৌবনবাউল। ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে তিনি তাঁর প্রথম বই উৎসর্গ করেছিলেন। ১৩৬৬-র চৈত্র সংক্রান্তিতে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতায় আজও এক মাইলস্টোন হয়ে আছে। চার দশক পরে এই বই আবার নতুন করে পড়তে গিয়ে দেখব, আজও তা আমাদের পায়ে পায়ে নুপূরের মতো বাজে।
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের জন্ম ১৯৩৩ সালে। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা শেষ করে ১৯৫৭ সাল থেকেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন।পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনার সময় ফেলোশিপ নিয়ে জার্মানিতে আসেন। তিনি ধীরে ধীরে জার্মান নিবাসী হয়ে উঠেন। তবুও দেশের মেঠো গন্ধকে বুকের মধ্যে জাপটে রেখেছিলেন। তাঁর বয়স যখন ষোল তখনই তাঁর কবিতা ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ছোটো থেকেই নিজের গন্তব্য ঠিক করে ফেলেছিলেন তিনি। তিনি জানতেন একদিন ঠিক বাংলা কবিতার পাঠকদের কাঁধে হাত রেখে হাঁটবেন আজীবন। অলোকরঞ্জন ছিলেন ইউরোপীয় আধুনিকতার পাঠক ও অনুবাদক।তিনি হাইডেলবার্গে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন এবং জার্মান, হাঙ্গেরীয়, ফরাসি কবিদের বাংলায় এনেছেন। ফলে তাঁর কবিতায় এক অনন্য সংমিশ্রণ তৈরি হয়েছে। তিনি বাংলার বাউল-আধ্যাত্মিক ভাবধারা ও পাশ্চাত্যের আধুনিক দর্শনের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর ছন্দভঙ্গি খেয়ালি, হঠাৎ থেমে গিয়ে আবার অদ্ভুত সুরে বয়ে চলা যা অনেকটা বাউল গানের খেয়ালধর্মিতার মতো। দার্শনিক গভীরতা ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাকে তিনি সহজ অথচ রহস্যময় ভাষায় প্রকাশ করেছেন।

তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী’, ‘প্রতিদিন সূর্যের পার্বণ’, ‘রক্তাক্ত ঝরোখা’, ‘ছৌ কাবুকির মুখোশ’, ‘লঘুসংগীত ভোরের হাওয়ার মুখে’, ‘মরমি করাত’, ‘গিলোটিনে আলপনা’, ‘নদী ও রাত্রি বণ্টন হয়ে গেলে’, ‘আয়না যখন নিঃশ্বাস নেয়’, ‘এক-একটি উপভাষায় বৃষ্টি পড়ে’, ‘রক্তমেঘের স্কন্দপুরান’। সোফোক্লেসের আন্তিগোনে, হ্যেল্ডারলিন, হাইনে, রিলকে, ব্রেখটের কবিতার পাশাপাশি অনুবাদ করেছেন সুরদাস। বাংলা থেকে জার্মানে অনুবাদ করেছেন অসংখ্য কবিতা, প্রবন্ধ, গান। পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি, রবীন্দ্র পুরস্কার, জার্মানির গ্যেটে পুরস্কার।
তাঁর কথার মধ্যে মিশে থাকত রসবোধ। কবি, প্রাবন্ধিক ও অলোকরঞ্জন-গবেষক ডাক্তার রজতকান্তি সিংহচৌধুরী জানিয়েছেন যে, তিনি বলতেন, “যে মানুষগুলো বিয়েবাড়ির নেমন্তন্ন খেয়ে বেরোচ্ছেন, তাঁদের কি ভুক্তভোগী বলা যায়?” একদিন ঘরোয়া এক অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে কবিতা পাঠ করছিলেন অলোকরঞ্জন। হঠাৎ একজন বলে উঠল, ‘অলোকদা, বসে পড়ুন।’ কবি তাঁর দিকে তাকালেন, তারপর বলেছিলেন, ‘এই কথাটার কিন্তু ভিন্ন মানে হয়।’ তাঁর কথা বলার ভঙ্গি ছিল নিদারুণ। তাঁর কথা শোনার জন্য তাঁর কাছে ভক্তদের ভিড় লেগে থাকত। একবার তাঁর সঙ্গে একটি মজার ঘটনা ঘটে। তাঁর আশিতম জন্মদিনে একটি উপহার আসে। তিনি তখন জার্মানির হাইডেলবার্গ-এর শহরতলি হির্শবার্গের বাসিন্দা ছিলেন। উপহারস্বরূপ তাঁর কাছে আসে একটি ওয়াইন। যিনি অর্ডার নিয়ে আসেন তিনি বাড়ির বেল বাজাতেই বৃদ্ধ অলোকরঞ্জন দরজা খোলেন। সেই ব্যক্তিটি বলেন, অলোকরঞ্জনকে ডেকে দিন। তাঁর হাতেই আমি এই পার্সেলটি তুলে দেব। অলোকরঞ্জন বলেন, আমিই সেই ব্যক্তি। কিন্তু পার্সেল দিতে আসা সেই ব্যক্তিটি বলে, আপনার তো বয়স ষাটের বেশি মনে হচ্ছে না। অলোকরঞ্জন কিছুতেই বোঝাতে পারেননি যে তিনিই সেই বৃদ্ধ অলোক। অবশেষে সেই ব্যক্তিটি পার্সেলে থাকা ওয়াইন নিজে খেয়ে নেয়। সারাজীবন তরুণ ছিলেন অলোকরঞ্জন। তিনি লিখেছিলেন, “চৌরঙ্গীর ফুটপাথে/ আমার শতাব্দীর কামধেনু/ ঢেলে দিচ্ছে কালো দুধ সীসা-রঙা/ যে খাবে তার মৃত্যু হবে/ যে খাবে না, তার মূর্খতা ভালোবাসি না”।

১৯৯২ সালে ‘মরমী করাত’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তাঁকে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। জীবদ্দশায় প্রায় ২০টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের। তিনি বারবার নিজের জীবনকে ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান/ তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান…’ এই গানের সঙ্গে তুলনা করতেন। আনমনেই গেয়ে উঠতেন এই গানের লাইন। আজীবন শান্তিনিকেতন আর রবীন্দ্রপ্রভাব তাঁর জীবনকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল অন্য মোহনায়। যে মোহনায় বসে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি কোনোদিন পাগল বলি না তাকে’। তিনি মধ্যবয়সে এসে বারবার খুঁজেছেন ঈশ্বর, শান্তি, মুক্তির পথ। তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে সেই প্রসঙ্গ।
সমাজের বিভিন্ন আন্দোলনে উত্তাল হয়েছে তাঁর লেখনী, মন। অবশেষে তিনি শান্তি খুঁজে পেয়েছেন বাউল গানে, ভ্রাম্যমাণ জীবনে। প্রবাসী কবি হয়েও তিনি সেতুবন্ধন করেছিলেন দুই দেশের জীবনযাত্রায়, ভালোবাসায়। এই তো জীবনের সার্থকতা, এই তো বাউল প্রীতির পরিণতি। তিনি চলে গিয়েছেন জীবনের সীমানা পেরিয়ে, কিন্তু বাউল মতে দেহের মৃত্যু হয়। আত্মা তো অমর। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত হয়তো আজও ‘যৌবনবাউল’ হয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন কোথাও, কোনও দেশে। ভালোবেসে…
________________________
বিশেষ কৃতজ্ঞতা, তথ্যসূত্র এবং ছবিঋণ: ডাক্তার রজতকান্তি সিংহচৌধুরী

