
দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতির পুজো
বাংলার এক বিরাট উৎসব দুর্গাপুজো। এই উৎসব বিভিন্ন প্রজন্মের বাঙালির আবেগ। মরসুমটা মানুষকে আনন্দ দেয়, আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিলিত হবার সুযোগ মেলে। এ-সময় কোনও ভেদাভেদ থাকে না। সকলে সমানভাবে উৎসবের আবেশে ভেসে পড়ে। আলোর রোশনাই, নিত্যনতুন খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন, নানা রঙের পোশাকে সবাই মজে থাকতে চায় এ-সময়। তবে সত্যিই কি এই অংশগ্রহণ সকলের কাছে সমান ভাবে আসে? নাকি সবাই নিজের মতো করে দুর্গাপুজোর আয়োজন করতে পারে? বছরভর যে অপরায়ণ চলে, অস্পৃশ্যতা ঘাপটি মেরে থাকে, বিদ্বেষ ছড়ায়, তা কি কখনও চার-পাঁচটি দিনের জন্য স্তিমিত হতে পারে? সমাজের প্রান্তিক মানুষ যাঁরা, সেই প্রতিবন্ধী, যৌনকর্মী, সমকামী-রূপান্তরকামী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষরা কি খুব সহজে এই উৎসবের সমুদ্রে ডুব দিতে পারে? (প্রান্তিক মানুষদের দুর্গাপুজো)
৩৯ পল্লিতে সংবেদন-এর ছাত্রছাত্রীরা
অপরায়ণের শিকার শুধু প্রতিবন্ধী মানুষরা নন, সমাজের অনেক কাজে লাগেন যাঁরা অথচ যাঁদের শ্রমকে ‘ফূর্তি’ বলে চিহ্নিত করে ওই সমাজ, সেই যৌনকর্মীরা একই রকম বৈষম্যের শিকার হন। দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতি এবং অন্যান্যরা ২০১৩ সাল থেকে সোনাগাছি এলাকার ভেতরে একটা দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন।
‘সংবেদন’ নামক সংস্থার শমিত সাহা অন্য একটা কথা বললেন। তাঁর এই সংস্থা মূলত বিশেষভাবে-সক্ষম শিশুদের নিয়ে কাজ করে। বঙ্গদর্শন.কম-কে শমিত বলেন, “এটা সত্যি যে ঠাকুর দেখার ভিড়ে একটি অটিস্টিক, সেরিব্রাল পলসি আক্রান্ত, স্প্যাস্টিক ডাউন-সিন্ড্রোমের শিশুকে নিয়ে মিশে যেতে, রাতভর প্যান্ডেল-হপিং করতে প্রতিটি অভিভাবকই চায়। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা অনেক সময় বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। সেই সব মা-বাবাকে হয়তো শুনতে হল- জানেন যখন এরকম বাচ্চাকে নিয়ে বেরিয়েছেন কেন! এই যে এরকম বাচ্চা, এই যে ফট করে আলাদা করে দেওয়া, নর্মাল-অ্যাবনর্মাল ঠিক করে দেওয়া, এগুলো কেন? পুজো তো সবার। পুজো কমিটিগুলিকে এটা ভেবে দেখবার অনুরোধ করি।”
এই ধরণের শিশু এবং তাকে নিয়ে যিনি চলাফেরা করছেন সেই এসকর্টকে কি ভিআইপি লাইন দিয়ে ঢোকানো যায় না? তাদের তো সেটা প্রয়োজন। তারাও তো পুজোর আনন্দ অনুভব করতে চায়। সংবেদন সংস্থাটি কিছু বছর যাবৎ শিশু-কিশোরদের অন্য ভাবে সংযুক্ত করছে। শমিত বলেন, “২০১৬ সালে হাওড়ার একটি মণ্ডপ সম্পূর্ণরূপে সজ্জিত করেছিল আমাদের শিশুরা। খুব আনন্দ করে করেছিল। এ-বছর আবার পিকনিক গার্ডেন ৩৯ পল্লি দুর্গোৎসবে আমাদের শিশুরা শিল্পী স্নেহাশিসকে অ্যাসিস্ট করছে মণ্ডপ সজ্জায়। আমাদের ছেলেমেয়েদের নানা হাতের কাজও এখানে ডিসপ্লে হবে। আজ এই সমস্ত ছেলেমেয়েরা কেবলমাত্র দর্শক নয়, তারা দুর্গাপুজোর শিল্পী। এভাবে খানিকটা হলেও তাদের ক্ষমতায়ণ হচ্ছে।” (প্রান্তিক মানুষদের দুর্গাপুজো)
অর্ধনারীশ্বর
ট্রান্সজেন্ডার ছেলেমেয়েরা এবং হিজড়ে পেশার বোনেরা আর রঞ্জিতা সিনহা- সবাই মিলে দুর্গাপুজো টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। শুধু পুজোর আয়োজন নয়, এই কদিন বস্ত্রবিতরণ, ক্লিনিক চালানো, বহুলোকের প্রসাদের আয়োজন- সবকিছুই করা হয়।
এ তো গেল বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের কথা। শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষদেরও ভিড়ে মিশতে, ‘সবার’ পুজোয় মিলতে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। যদিও এত বছরে এই প্রথম অনেকগুলি মণ্ডপে র্যাম্প আর ব্রেইলের ব্যবস্থা থাকবে তবে মূক ও বধির যারা তাদের আর্জি- থিমপুজোগুলো ভিডিও করে যেমন সমস্তটা বোঝায় তাতে যদি ‘সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ’-এও তথ্য থাকে, তাহলে এইসব মানুষগুলোর অনেক সুবিধে হয়। তবে এই অপরায়ণের শিকার শুধু প্রতিবন্ধী মানুষরা নন, সমাজের অনেক কাজে লাগেন যাঁরা অথচ যাঁদের শ্রমকে ‘ফূর্তি’ বলে চিহ্নিত করে ওই সমাজ, সেই যৌনকর্মীরা একই রকম বৈষম্যের শিকার হন। দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতির সেক্রেটারি বিশাখা লস্কর এবং এই সংস্থার অন্যান্যরা সেই ২০১৩ সাল থেকে সোনাগাছি এলাকার ভেতরে অবিনাশ কবিরাজ স্ট্রিটে একটা দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। বঙ্গদর্শন.কম-কে তিনি বলেন, “সত্যি কথা বলতে আমরা যৌনকর্মীরাও শ্রমিক। আমরা যৌনশ্রম দিই সমাজকে। যে-নারী গৃহশ্রম করেন, যিনি অফিস-কাছারি যান, যাঁরা উঁচুপদে চাকরি করেন তাঁদের সবাই আর আমরা সমান। তাহলে আমরা যদি একটা দুর্গাপুজো করতে চাই বাধা দেওয়া হবে কেন? হ্যাঁ, হয়েছে! আদালতে মামলা করে আমাদের দুর্গাপুজোর আয়োজন করতে হয়েছে প্রথম দিকে। যৌনকর্মীদের নিয়ে নানা রকম ধারণা থাকে সমাজে। চাপা-হাসি, উত্তেজনাও থাকে। কিন্তু প্রতিমা গড়তে আলাদা করে আমাদের উঠোনের মাটি লাগবে কেন? সে-কারণে এই মাটি দেওয়া আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। আমাদের পুজোতে সকলে আসুন। আমাদের কাজ আপনারা জানেন টুয়েন্টি-ফোর ইন্টু সেভেন। উৎসবের আবহে আমাদের কাজ বাড়ে। তাও আমাদের মেয়েরা এই পুজোর আয়োজন করে থাকে। ঠাকুর আনা থেকে পুজোর আয়োজন থেকে প্রসাদ-বিতরণ থেকে ভাসান অবধি সব আমাদের যৌনকর্মী মেয়েরাই করে থাকে।” (প্রান্তিক মানুষদের দুর্গাপুজো)
এই দূরে সরিয়ে রাখা, এই চাপা অস্পৃশ্যতার বলি হন সমাজের রূপান্তরকামী মানুষরাও। পুজোর ভিড়ে তাঁদের নিয়ে ঠাট্টা হয়। সারা বছরে যে-সামাজিক বিদ্বেষের মুখোমুখি তাঁরা হন, দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে সেই হেনস্থা-হিংসা কিছু কম চলে না। পুজোয় যেন তাঁদের কোনও অধিকারই নেই। তাঁরা এমনিতে তাঁদের যৌনপরিচয়ের জন্য নিজেদের বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন, আপনজন-আত্মীয়স্বজনরা তাঁদের দূরে ঠেলে, এক লহমায় গৃহহীন হয়ে পড়েন শুধুমাত্র জন্মকালে-ন্যস্ত, সমাজের-দেওয়া যৌনপরিচয়ে আটকে থাকতে চান না বলে। কিন্তু যৌনপরিচয় তো এক চলমান অস্তিত্ব। যে-কোনও ব্যক্তির নিজস্ব অধিকার। আজও সমাজ ও রাষ্ট্র সেই পরিচয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাধা হয় কী করে যেখানে ভারতের উচ্চতম ন্যায়ালয় নালসা-রায়ের মধ্যে দিয়ে সেই ২০১৪-তে দেশের রূপান্তরকামী মানুষদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’-এর তকমা দিয়ে দিয়েছেন? (প্রান্তিক মানুষদের দুর্গাপুজো)
রঞ্জিতা সিনহা ও গোখেল রোড বন্ধন-এর অর্ধনারীশ্বর
দুর্গাপুজো তো হয় মহম্মদ আলি পার্কে! কখনও তো মনে হয়নি নামটা আরবি, সেখানে হিন্দু দেবীর পুজো হচ্ছে কী করে? এবং ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ কথাটা যে সত্য হতে পারে, বাস্তবেও তার প্রমাণ মিলল আলিপুর ৭৮ পল্লির সর্বজনীন দুর্গোৎসবে।
বিশিষ্ট রূপান্তরকামী সক্রিয়কর্মী ও সমাজসেবী রঞ্জিতা সিনহা এ প্রসঙ্গে বলেন, “হ্যাঁ, ঠিক এই জায়গা থেকে আমি এবং আমার সংস্থা গোখেল রোড বন্ধন একটি দুর্গাপুজোর আয়োজন করছি গত আট-নয় বছর। আমাদের প্রতিমা দুর্গার আদিরূপ- অর্ধনারীশ্বর। আমরা রূপান্তরকামীরা যে যুগ যুগান্ত ধরে পৃথিবীতে বাস করি, আমাদের অস্তিত্ব যে চিরন্তন সেটার প্রতীক আমাদের অর্ধনারীশ্বর। এই প্রতিমা আমরা ভাসাই না। সংরক্ষণ করি। প্রতি বছর আমাদের প্রতিমার অঙ্গরাগ হয়। জাত-ধর্ম-বর্ণ শিখিয়েছে আমাদের মতো মানুষদের কোনও অধিকার পুজোতে নেই। আমরা অচ্ছুত। এই পুজো আসলে আমাদের প্রতিবাদ।” রঞ্জিতা সিনহা নিজে একজন জাতীয় স্তরের অ্যাক্টিভিস্ট। রাজ্যের ট্রান্সজেন্ডার বোর্ডেও তিনি ছিলেন। তাঁর সংগ্রাম স্বীকৃত বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট উপাধি থেকে। তাও তাঁদের পুজোর স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে বহুবার। গোখেল রোড থেকে শুরু করে এখন নেতাজিনগর সংলগ্ন এলাকা। তিনি একটি গরিমা-গৃহ চালান। বহু উপেক্ষিত রূপান্তরকামী নারী এবং পুরুষ এই গরিমা-গৃহের আশ্রয়ে থাকে। ট্রান্সজেন্ডার ছেলেমেয়েরা এবং হিজড়ে পেশার বোনেরা আর রঞ্জিতা- সবাই মিলে এই দুর্গাপুজো টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। শুধু পুজোর আয়োজন নয়, এই কদিন বস্ত্রবিতরণ, ক্লিনিক চালানো, বহুলোকের প্রসাদের আয়োজন- সবকিছুই করা হয়। রূপান্তরকামী মানুষরা এমনভাবেই সমাজকে অনেক কিছু দেয়। রঞ্জিতা বলেন, “আমরা প্রান্তিক হতে পারি, কিন্তু ব্রাত্য হব কেন বলুন? আমাদের ধর্ম মানবধর্ম। আমি নিজে বৈষ্ণব ধর্ম দীক্ষিত। আমাদের কোনও পুরোহিত লাগে না। আমাদের নিজেদের পৌরহিত্যেই পুজো হয়। মায়ের কাছে, অর্ধনারীশ্বরের কাছে আমরা সবাই এক।”
আলিপুর ৭৮ পল্লি
দুর্গাপুজো কি ধর্মীয় উৎসব কেবল? নাকি সব জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষদের একাকার করে দেবার আয়োজন? উমা তো বাঙালির ঘরের মেয়ে, সে বাঙালি যে জাত-ধর্মেরই হোক। দুর্গাপুজো তো হয় মহম্মদ আলি পার্কে! কখনও তো মনে হয়নি নামটা আরবি, সেখানে হিন্দু দেবীর পুজো হচ্ছে কী করে? এবং ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ কথাটা যে সত্য হতে পারে, বাস্তবেও তার প্রমাণ মিলল আলিপুর ৭৮ পল্লির সর্বজনীন দুর্গোৎসবে। কমিটির সম্পাদক সৌরভ মজুমদার জানালেন, “আমাদের পুজোর এ-বছর ছেষট্টিতম বর্ষ। এই পুজো যে-রাস্তায় হয় তার নাম আফতাব মসজিদ লেন। আমাদের কমিটিতে বহু মানুষ আছেন যাঁরা মুসলিম ধর্মাবলম্বী। আমাদের উপদেষ্টামণ্ডলীতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কিছু মন্ত্রী আছেন যাঁরা ধর্মে ইসলাম। কিন্তু বিশ্বাস করবেন না এই পুজো কী অপূর্ব ভাবে সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ দিয়ে আয়োজন করেন। ঠাকুর-আনা, প্রসাদ-বিতরণ, ভাসান কোনও কিছুতেই আপনি বুঝবেন না কে হিন্দু আর কে মুসলমান।”
দুর্গাপুজোর উৎসবে সকলে মিলেমিশে যেতে পারে। কারও জাত, ধর্ম, বর্ণ আর লিঙ্গ পরিচয় যখন বড়ো না হয়ে সকলে সমান হয়, তখনই পুজোর আয়োজন হয়ে ওঠে প্রকৃত মহোৎসব। “…বলো বলো দুগ্গা এলো।”

