বাস কন্ডাকটর ডলি রানা : সংসারের হাল থেকে রাস্তার ঢাল একাই সামলাচ্ছেন যিনি

“ধর্মতলা, ধর্মতলা! সোজা ধর্মতলা…” রাস্তায় চলাফেরার মাঝে এই ডাকটা শুনলে আমাদের গতানুগতিক মনে ধরা পড়ে একটি অবয়ব। একটি চিরাচরিত ছবি। এক হাতে রড, অন্য কাঁধে খুচরো পয়সার ব্যাগ ঝোলানো এক পুরুষ। ভালো করে লক্ষ্য করুন আবার। আমাদের মনে এক পুরুষ-ছবিই ভেসে ওঠে। আসলে আমাদেরও তেমন দোষ নেই। ছোটো থেকে যা দেখে এসেছি সেটাই যেন ধ্রুব। যেন সেটাই স্ট্যান্ডার্ড। কখনও প্রশ্ন করিনি। তবে সবাই না করলেও, কেউ কেউ করেছে। কলকাতার মহিলা বাস কন্ডাকটর ডলি রানা – ছক ভাঙার তেমনই এক নাম।

মানব সভ্যতার প্রগতির সঙ্গে বৈষম্যও বেড়েছে সমান তালে। শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণের পাশাপাশি লিঙ্গ বৈষম্য বহু যুগের এক ভয়ানক সমস্যা। তবে সমস্যা থাকলে উপায়ও হয়। ‘হোয়ার দেয়ার ইজ এ উইল দেয়ার ইজ এ ওয়ে’। ডলির গল্পের শুরুটা সেই ছোটো থেকে। শৈশব থেকেই তিনি তাঁর বাবার মুখে এক স্বপ্নের কথা শুনতেন। খুব বেশি কিছু না। ওই সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরে যা হয়। এক স্বাধীন জীবন ও নিজস্ব রোজগার। “বাবার বাস কেনার খুব ইচ্ছে ছিল। তবে ভাগ্যে জোটেনি। দারিদ্রতার কারণে কোনোমতে চলতো সংসার।” তবু হাল ছাড়েননি ডলি। মনে মনে সেই অপূর্ণতাকেই জীবনের লক্ষ্য করেন তিনি।

নিজের জমানো সঞ্চয়, গয়না বন্ধক আর বাকিটা এদিক সেদিক থেকে ধার নিয়ে গাড়িটি তিনি কেনেন। নীল-হলুদ ৫৭ নম্বর। রুট হাওড়া থেকে বেলগাছিয়া। প্রথমদিকে একজন চালক ও কনডাক্টর রাখেন। তখন নেপথ্য থেকেই সবটা সামলাতেন ডলি।

২০১৭ সাল। ততদিনে তাঁর বিয়ে হয়ে গেছে। আচমকা একদিন খবর পান একটা সেকেন্ড হ্যান্ড বাস বিক্রি হচ্ছে। ব্যাস, দিশা পায় তাঁর সুপ্ত বাসনা। নিজের জমানো সঞ্চয়, গয়না বন্ধক আর বাকিটা এদিক সেদিক থেকে ধার নিয়ে গাড়িটি তিনি কেনেন। নীল-হলুদ ৫৭ নম্বর। রুট হাওড়া থেকে বেলগাছিয়া। প্রথমদিকে একজন চালক ও কনডাক্টর রাখেন। তখন নেপথ্য থেকেই সবটা সামলাতেন ডলি। তবে কনডাক্টররা ঠিক করে টাকা দিত না। “কখনও দুশো, তিনশো, পাঁচশো- দেনায় ডুবে যাচ্ছিলাম।” এরই মাঝে দেখা দেয় কোভিড। এক ভয়ঙ্কর অতিমারীর প্রকোপ শুরু হয়। বিশ্বজোড়া আতঙ্ক, লকডাউন, কাজকর্ম তখন সবটাই বন্ধ। হঠাৎ কাজ ছেড়ে দেয় কনডাক্টর। অন্যদিকে ক্রমশ তলানিতে সঞ্চিত পুঁজিও। ডলি বলছিলেন, “একসময় নিঃস্ব হয়ে গেছিলাম। অনেক ধার দেনা বেড়ে যায়। অনেকেই তখন বলেছিল বাসটা বিক্রি করে দিতে।” মাসভাড়া, ইএমআই, চালক খরচ সাতপাঁচ ভেবে এক সাহসী সিদ্ধান্ত নেন ডলি। কোমর বেঁধে এবার নিজেই নামেন রাস্তায়। সংসার যে তাঁকে সামলাতেই হবে!

বাসের ফুটবোর্ডে সাধারাণত পুরুষরাই দাঁড়ায়। এতদিনের অভ্যস্ত চোখ, খুব সহজে মেনে নেয়নি সমাজ। মেয়ে হয়ে কনডাক্টর! অনেকেই মন্তব্য করে। কেউ কেউ ছুড়ে দেয় বাঁকা উক্তি। তবে কটুক্তির কোনও ঝড়ই টেকেনি তাঁর কাছে। সেই মান্ধাতার আমল থেকেই পুরুষরাই ঠিক করে এসেছে কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তারাই উকিল, জজ, আইন। পারিবারিক কাঠামো থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় স্তর পর্যন্ত পুরুষের আধিপত্য বজায় থেকেছে যুগের পর যুগ। এখানে নারীরা শুধু দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক নয়, বরং ‘অবজেক্ট’ বা ভোগ্যবস্তু। মেয়েরা চাকরি করবে, পয়সা রোজগার! তা আবার হয় নাকি? তাহলে ঘর সামলাবে কে? চার দেওয়ালের জেলখানাই যেন একমাত্র পরিচয়। প্রথমে বাবা, তারপর স্বামী, সন্তান সবাই নিজেদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে নারীদের। কখনও সরাসরি, কখনও আবার ‘ভালোবাসা’, ‘অতো তুমি বুঝবে না’, ‘তোমার জন্যই করা’-র সূক্ষ্ম আড়ালে।

২০২১ সাল। লকডাউন কিছুটা সরলেও, কোভিড চলছে। দ্বিতীয় পর্ব। ভারতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যান এই দ্বিতীয় ঢেউয়েই। যখন তথাকথিত বহু ‘পুরুষ’ই ঘরের ভেতর, চৌকাঠ ডিঙিয়ে বেরিয়ে আসেন ডলি। তিনি হার মানেননি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন কাজে যেতেন। পরনে মলিন রংচটা শাড়ি, কাঁধে কালো ব্যাগ। শুরুতে অবশ্য সেটাও ছিল না। আঁচলে করে তখন পয়সা বাঁধতেন।

অনেকেই ডলি রানাকে দেখে অবাক হতেন। এর মধ্যে মেয়েরাও ছিল। তবে সেসব কটাক্ষকে আমল দেননি তিনি। তাঁর বক্তব্য, “এই পেশায় টিকে থাকা কঠিন। আজও মেয়েদের দুর্বল ভাবে মানুষ। তবে আমার বরাবর একটা জেদ ছিল। মনে হত ছেলেরা পারলে, আমি করবো না কেন?

নারীদের দুর্বল ভাবে এই সমাজ। শারীরিক দিক থেকে অক্ষম, কায়িক শ্রমে পিছিয়ে এমন বহু তকমা আজও প্রচলিত। একই কাজ করেও নারী পুরুষের ভিন্ন বেতন। ক্ষমতা কাঠামোয় নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য, যুগ যুগ ধরে নানা কাহিনির আশ্রয় নিয়েছে পুরুষতন্ত্র। পুরুষের পাঁজর থেকে নারীর জন্ম; পুরাকালে কেবল পুরুষরা শিকার করতো, নারীরা সন্তান সামলাতো- এমন বহু মিথ বিদ্যমান। তবে ১৯৮০-র দশক থেকে তা ভাঙতে শুরু করে। নৃতত্ত্ববিদ্যায় এগিয়ে আসেন বহু নারী। তাঁরা গবেষণায় দেখান, কীভাবে নারী ও পুরুষ কাঁধে কাঁধ রেখে মোকাবিলা করেছে। বিজ্ঞানী Wall-Scheffler-র কথায়, “Women had their own toolkit. They had favourite weapons. Grandmas were the best hunters of the village.” লিঙ্গ সমতা কোনও আধুনিক শব্দ নয়। প্রকৃতির চোখে আসলে সবাই সমান।

অনেকেই ডলি রানাকে দেখে অবাক হতেন। এর মধ্যে মেয়েরাও ছিল। তবে সেসব কটাক্ষকে আমল দেননি তিনি। তাঁর বক্তব্য, “এই পেশায় টিকে থাকা কঠিন। আজও মেয়েদের দুর্বল ভাবে মানুষ। তবে আমার বরাবর একটা জেদ ছিল। মনে হত ছেলেরা পারলে, আমি করবো না কেন?” ডলির বাড়ি বেলগাছিয়ায়। রোজ ভোর ভোর উঠতে হয়। শহর জেগে ওঠার আগেই নিঃশব্দে কাজ সারেন। প্রতিদিনই যেন ‘বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভোর’! কখনও সাড়ে চারটে, কখনও আবার পাঁচটা, সাড়ে পাঁচটা যখন যেমন সময় হয় সেই ভাবে। প্রখর রোদ্দুর, প্রবল বৃষ্টি- ছুটি বলে কিছুই নেই। এমনকী পুজোর দিনগুলোতেও গাড়ি বের করেন। বেলা তিনটে থেকে সারারাত্তির!

এই বিপুল দক্ষযজ্ঞ ডলিদেবী হাসি মুখেই সামলান। “আমার বাবা বলতেন কোনও কাজ ছোটো বড়ো হয় না। আমিও সেটা মেনে চলি” – তাঁর কথায় কোনও ক্লান্তির ভাঁজ নেই। বরং স্পষ্ট বক্তব্য, “ঘরে কোনও মজা নেই। এখানেই আনন্দ পাই। কত লোকের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়! খুব ভালো লাগে! ঘরে থাকলে এসব হত না। যতদিন হাত-পা আছে কাজ করে যাব।” তাঁর এই অদম্য সাহসে প্রথম থেকেই পাশে ছিল পরিবার। “আমার ভাই, বোন, স্বামী সবাই আমার পাশে ছিল। ওরা দেনার দিনে কাছে না থাকলে, আমিও থাকতাম না।”

পরিবারের পাশাপাশি বাস চালক দাদার থেকেও ডলি পূর্ণ সমর্থন পান। তাছাড়া যাত্রীরা তো ছিলই। তিনি বলেন, “আগে অনেকেই পালিয়ে যেত। টিকিট কাটতো না। আমারও হাত পেতে পয়সা চাইতে লজ্জা লাগতো। তবে এখন আর মনে হয় না। এখন এটাই আমার পেশা।” ডলি রানার গলায় গর্বের স্পষ্ট ছাপ! “আমার বেশিরভাগ প্যাসেঞ্জারই ভালো। বিশেষত অফিস টাইমের। খারাপও আছে। কেউ কেউ গালাগালি করে। তবে সেটাও ওই খুচরো নিয়ে। এছাড়া কারোরই কোনও ক্ষোভ নেই।” দুর্ভোগের দিনে যাত্রীরাই পাশে থাকে ডলির। “আমার শরীর খারাপ হলে প্যাসেঞ্জাররাই পাশে থেকেছে। তারাই সিট ছেড়ে, জল বিস্কুট খাইয়ে আমায় সুস্থ করেছে।”

তিনি বলেন, “আগে অনেকেই পালিয়ে যেত। টিকিট কাটতো না। আমারও হাত পেতে পয়সা চাইতে লজ্জা লাগতো। তবে এখন আর মনে হয় না। এখন এটাই আমার পেশা।”

জীবন এখন ভালোই চলছে। সংসারেও বেশ স্বাচ্ছন্দ্য। তবু কোথাও যেন একটা আফসোস রয়ে গেছে। “আমার বাবা বেঁচে থাকলে খুব আনন্দ পেতেন। তিনি কাজ পাগল ছিলেন। নিজের মতো বাঁচতে চাইতেন। আমার প্রথম রোজগারের পাঁচশো টাকা তার হাতেই দিই। বাবা সেটা খরচ করেনি। রেখে দিয়েছিল। বাস কেনার দু-মাসের মধ্যেই তিনি মারা যান। মা মারা গেছিল ২০১৬ সালে। আজ তারা দেখলে খুব খুশি হতেন।”

এভাবেই দিন কাটান ডলি। কখনও হাঁটু ব্যথা, কখনও অফিস টাইমের উপচে পড়া ভিড়- সংসারের হাল থেকে রাস্তার ঢাল সবটাই সমান দক্ষতায় সমালে চলেছেন তিনি। এ বছর তাঁর বয়স ৫৮ হল। তবে ওই যে কারা বলে গেছে, বয়স কেবল সংখ্যামাত্র! মানুষের অনুপ্রেরণাই আসল। লড়াইটাই সব!

ডলির নিজের কোনও সন্তান নেই। বাসই তাঁর সব। তবে একটানা এতদিন চলায় কিছুটা পুরোনো হয়ে গেছে। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান অটো-টোটোর চাপে নাজেহাল বাস মালিকেরা। যাত্রীরা অনেকেই সেদিকে ছুটছে। সবকিছু ভেবে আবারও এক আবশ্যক সিদ্ধান্ত তিনি নেন। “আমি নতুন রুটের পারমিট খুঁজছি। ৪০ নম্বর রুটের। শ্রীরামপুর থেকে বীরশিবপুর। দেখা যাক কী হয়।” ইতিমধ্যে নতুন একটি বাসও তিনি কিনেছেন। উদ্বোধন পুজোর আগে। তাছাড়া ব্যবসা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে। এভাবেই অচলায়তনকে ভেঙে দিন বদলের গল্প লিখে চলেছেন ডলি রানা।

___________________
সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত

Written by