ফিরোজা বহ্নি : সন্তানকে শুধু বাংলা ভাষা সম্বল করেই বিদেশের স্কুলে পাঠিয়েছেন যে মা

০২২ সাল। মাঝ ডিসেম্বরের সকাল। ঘুম চোখে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে চোখ আটকে গেল এক ফেসবুক বন্ধুর দেওয়ালে। ক্যালিফোর্নিয়া-নিবাসী, প্রবাসী এক মায়ের কথা শেয়ার করেছেন তিনি। মা লিখেছেন তাঁর একরত্তি কন্যার কথা। সে এক আশ্চর্য কাহিনি। এ কাহিনি বর্ণমালার কাহিনি। লেখার তারিখ ১৩ ডিসেম্বর, ২০২২। তিনি লিখেছেন, মেয়ে বর্ণমালাকে নিয়ে একটা ভয় সবসময় কাজ করত তাঁর। প্রবাসের স্কুলে সে টিকতে পারবে কিনা। মেয়ে ইংরেজি পারত না। মেয়ে কেন আমেরিকায় থেকেও ইংরেজি শিখছে না, সে নিয়ে বেশ চিন্তা ছিল পরিবার এবং বন্ধু মহলে। সেই ভয় বর্ণমালার মা-বাবাকে যে একেবারে স্পর্শ করে করেনি তাও নয়। তিনটি মাত্র Phrase- ‘I Want to’, ‘I like to’, ‘I dont’ আর কয়েকটা দরকারি শব্দ শিখে সাড়ে তিন বছর বয়সে স্কুল জীবন শুরু করেছিল এক রত্তি মেয়ে। আমেরিকার ভাষা না জানার জন্য একটা চোরা ভয় কাজও করেছিল।

মেয়ের কথা লিখতে গিয়ে মা লিখেছেন, ‘মনে আছে, ওর সাথে কেউ বাংলা না বললে ও কেমন চুপসে যেত…’।

কিন্তু গল্পের শেষটুকু একেবারে অন্যভাবে এল। যেন এক সিনেমা বা যুগ্ধ জয়ের গাথা।

বিদেশ বিভুঁয়ে শুধু বাংলা সম্বল করে সেই বর্ণমালাই কয়েকমাস পর স্কুলে হয়ে উঠেছিল সকলের প্রিয়। বন্ধু থেকে দিদিমণি সকলের কাছেই। মা গিয়ে স্কুলে শিক্ষিকাকে জিজ্ঞাসা করতেন ‘ও কি তোমার কথা বুঝে? আমরা বাসায় বাংলা বলি… তবে ইংরেজিও শিখাচ্ছি…’। হেসে আশ্বস্ত করতেন দিদিমণি।

একদিন সব ভয়কে হারিয়ে সেই মেয়েটাই ‘ACADEMIC EXCELLENCE AWARD’ পেল। এও এক ঘুরে দাঁড়াবার কাহিনি।

ফিরোজা বিনতে ওমর বহ্নির সঙ্গে বর্ণমালা

বর্ণমালা সেই দেশের মেয়ে যে দেশের মাটি রক্তে ভিজেছিল মায়ের ভাষাকে ভালবেসে। বর্ণমালার মায়ের মাটি আগলে রাখে বাংলা ভাষাকে। প্রবাসেও তার অন্যথা হয় না।

অনেকদূরে এপার বাংলায় বসে সেই জয়ের কথা পড়তে পড়তে জলে ভেজে চোখ। গর্ব হয় বাংলাভাষী হিসেবে। আর কান্না আসে এবঙ্গে কোণঠাসা, দীন দুঃখিনী বাংলা ভাষাকে দেখে। শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা পাঠাই, আর জানাই আপনার সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই –  বর্ণমালার মায়ের ফিরোজা বিনতে ওমর বহ্নি’র কাছে।

পরিবার

বর্ণমালার বাবা চমক হাসান। স্ত্রী ফিরোজা বহ্নির সঙ্গে তাঁর ‘শুনতে চাই’ গান একসময় ভারী মন ছুঁয়েছিল মানুষের। দুই বঙ্গেই ঘরে ঘরে চেনা মুখ তাঁরা। ফিরোজার সঙ্গে কথা বললাম যখন কুণ্ঠা, লজ্জা আর বিনয়ে তিনি বেশ দ্বিধায়। বেশ যুক্তি দিয়ে কয়েকদিন কথোপকথন চলে। লজ্জা এপারের মানুষটিরও কম নয়, কী করে বলি নিজভূমে দাঁড়িয়েও কথা বলতে হয় পর ভাষায়। সেটাই হয়ে গিয়েছি দস্তুর। কী করে বোঝাই আজকাল বাংলাভাষী খবরের আপিসে ওপরমহল ধরেই নেয় কেউ বাংলা মিডিয়াম মানে সে তার বাবা-মার সামর্থ্য নেই ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের খরচা বহন করার। ‘বাংলা মিডিয়াম’ টেলি পর্দায় ধারাবাহিকে যুদ্ধ জয় করে আর প্রতিদিন ঘরে ফেরে হারা সেনার মতো। নিজের কাছে নিজে ছোটো হতে হয়, তবু দায় থেকেই যায় ভাষার কাছে। আশা খোঁজার দায়, ভরসা খোঁজার দায় আর সেই খোঁজেই বর্ণমালার মা, লেখিকা ফিরোজা বহ্নির মুখোমুখি…

আপনি বাংলাদেশের মানুষ। দুই কন্যার নাম রেখেছেন বিনীতা বর্ণমালা, পরশমণি। ছোটো ছোটো ভিডিয়োগুলো দেখলে আন্দাজ করা যায় যাপনের দর্শন, কিন্ত বোঝা যায় না ভিডিয়োর বাসিন্দারা আসলে বিদেশবাসী। তার কারণ নিখাদ বাঙালিয়ানা। এটা কীভাবে সম্ভব, আমাদের এখানে দোকান বাজারেও দেখি মা বাবারা বাচ্চার সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলে…

বহ্নি: আসলে, ব্যাপারটা হলো ‘আরাম’ এর! আমি বাঙালিয়ানায় আরাম পাই, তাই এর উপর ভর করেই চলছি… এতে আমার গর্বও নাই, লজ্জাও নাই! যেহেতু বিদেশে থাকি, তাই ষোলো আনা বাঙালিয়ানা ধরে রাখার মতো গোঁড়ামি করায়ও আমার আরাম নাই… যেমন ধরুন, যে বাংলা পারে না, তার সাথে তো ইংরেজিতে কথা বলি, দোকানে কিংবা ঘুরতে গেলে যেভাবে আমার আরাম হয় সেভাবেই তো যাই!

আমার ইচ্ছা আমি বাচ্চাদের সাথে আরাম করে মনের কথা বলবো, ওদের কথাও আরাম করে শুনবো! সেক্ষেত্রে অবশ্যই আমার আরাম বাংলা ভাষাতে… সামাজিক আর ধর্মীয় যেসব আচার-অনুষ্ঠানে আমার শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য রঙিন, আমি অবশ্যই চাইবো আমার বাচ্চাদের নিয়ে এই রংগুলো বারবার উদযাপন করতে, দেশ-মাটি-ভাষা নিয়ে আমার চিন্তা করার আরাম যে পথে আমি চাই আমার সেই চিন্তার পথে হাঁটতে আমার সন্তানের যেন অস্বস্তি না আসে… সেই চিন্তার পথটা তো বাংলা ভাষা দিয়েই বোনা দিদি, তাই নিজেদের ছোট্ট পৃথিবীতে চিন্তায়-বাক্যে কিংবা অনুভূতির গভীরে বাঙালীয়ানাকে খুব শক্ত করে ধরে রাখার চেষ্টা করছি—এই যা!

ইংরেজিটা জলের মতো না জানলে চলবে না, বাংলাটা ভুললেও কিছু যায় আসে না। একজন মা, লেখিকা এবং একজন প্রবাসের মানুষ হিসেবে এই ভাবনাকে কীভাবে দেখছেন?

বহ্নি: এভাবে তো দেখছিই না! বরং উল্টোটাই ভাবি। ইংরেজি হলো ‘প্রয়োজনের ভাষা’ কোনোরকম ঠিকঠাক হলেই হলো! আমেরিকায় থেকে ইংরেজি ভুলে যাওয়াই বরং কঠিন, তাই ইংরেজি ভুলে যাবে—এই আশঙ্কা করি না… ইংরেজি ভালো জানা অবশ্যই একটা প্লাস পয়েন্ট কিন্তু তাই বলে বাংলাকে এড়িয়ে গিয়েই কেন তা অর্জন করতে হবে, সেটা আমার বোধগম্য নয় আর কি।

ভাষা তো শুধু অফিসে ব্যবহারের বিষয় না, ভাষা মানুষকে time travel করাতে পারে। আপনি যখন একটা ভাষা জানবেন, আপনি সেই ভাষার মানুষের জীবন সংস্কৃতিকে তত বেশি জানতে পারবেন, বুঝতে পারবেন।

বাংলা ভাষাতেই আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভিত গড়ে তুলেছে, বাংলা ভাষাতেই আমাদের শেকড়ের নকশা আঁকা রয়েছে, আঁকা হচ্ছে। তাই আমাদের জন্য বাংলা ভাষা হলো শেকড়ের সাথে বন্ধন তৈরির একমাত্র মাধ্যম, তাই বাঙালির বাংলা ভুল যাওয়া মানে আসলে নির্জন দ্বীপে ছিটকে পড়ার মতো। সেটা ভয়াবহ ঠেকে আমার কাছে!

তাই, একজন বাঙালি ইংরেজি, স্প্যানিস, ফ্রেঞ্চ যেটা প্রয়োজন/ শখ/ কৌতূহল হয়, শিখুক… কিন্তু বাংলাটা শ্বাস নেওয়ার মতো জরুরি ভেবেই বুকে ধরে রাখা উচিত।

বড়ো মেয়ে বর্ণমালা তো বাংলা বলে ভীষণ স্বচ্ছ স্বাভাবিক ভাবে কিন্তু বড়ো হচ্ছে প্রবাসে। তার দৈনন্দিন কেমন? বাংলা বই, বাংলা গান, কবিতা কী কী ভাল লাগে তার?

বহ্নি: সাড়ে তিন বছর বয়স অব্দি, মানে, স্কুলে যাওয়ার আগে ও আসলে ইংরেজিতে কথা বলতেও পারতো না, কিছু বুঝতেও পারতো না! স্কুলে যাওয়ার ১-২ সপ্তাহ আগে থেকে আমি ওকে একটু একটু করে ইংরেজি শব্দ, কিছু common  conversation শেখানো শুরু করি! এখন ওর বয়স ৬, এখন ও স্কুলে দিব্যি ইংরেজি চালিয়ে যাচ্ছে! স্কুলে শিক্ষক, কর্মচারী, বন্ধুদের সাথে ইংরেজিতেই কথা বলে, এখন ইংরেজি বই পড়া শুরু করেছে। স্কুলের প্রোগ্রামে ও ইংরেজি গান করে, কবিতা আবৃত্তিও করে!

এদিকে বাসায় আমরা পুরোদস্তুর বাংলায় কথা বলি, বাংলা বই পড়ি, বাংলা কবিতা কিংবা গান করি, বাংলা ভাষা পড়াও  শেখানো হচ্ছে… দেশীয় অনুষ্ঠানগুলোতে ও বাংলায় কবিতা – গান পরিবেশনা করে। দুই ভাষা পাশাপাশি যাচ্ছে আর কি।

বাংলা ভাষার ছোঁয়াচ থেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে মানুষ করার যে প্রবণতা আমাদের এপার বাংলায় দেখা যায় ওপার বাংলার ছবি কেমন?

বহ্নি: আমি তো দশ বছর দেশের বাইরে। আমাদের সময় এমনটা দেখিনি খুব। এখন হয়তো অবস্থা অন্যরকম। ‘জানেন ভাবি, আমার ছেলের বাংলাটা খুব আসে না’ বলতে আজকাল বেশিরভাগ মা-বাবার খুব বাঁধে না।

এটা আসলে বাংলার ছোঁয়াচ থেকে বাঁচিয়ে অর্জন/ বিসর্জন দেয়ার ফল নয়, এটা আসলে Youtube বা device addiction এর ফল! বাচ্চারা যত না মা-বাবার সাথে কথা বলে কিংবা interction করে, তার থেকে বেশি সময় কাটায় device এর সাথে। তাই ইংরেজিতে ওদের ‘আরাম’ তৈরি হয়.. তখন এটা নিয়ে খুব অল্প মানুষ আফসোস করলেও বেশির ভাগ মানুষ একটু গর্ব করে নেয়!

বাচ্চা যাতে দৌড়ে পিছিয়ে না পড়ে, better future, better career বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই ভাবনা থেকেই অভিভাবকেরা ‘ইংরেজি’টা আগে রাখেন, বাংলাটা OFF করে দেন, মানে সন্তানের সঙ্গে সব যোগাযোগ ইংরেজিতে, কারণ ‘এখন তো সব ইংলিশে’! তাঁদের কী বলবেন? মায়ের কাছেই তো অক্ষর আর ভাষা শেখার শুরু।

বহ্নি: এটা আসলে যারযার দৃষ্টিভঙ্গি, যারযার জীবনতৃপ্তির আলোকে বিশ্লেষণ করার বিষয়। একেবারেই ব্যক্তিগত ব্যাপার আর কি! ধরুন, যার ইচ্ছা তার সন্তান পৃথিবীর সেরা দশ জন জ্ঞানী মানুষের একজন হবে- সে তার সন্তানকে নিয়ে জ্ঞানের দৌড়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে, যার ইচ্ছা তার সন্তান সেরা কুস্তিগীর হবে সে কিন্তু জ্ঞানের দৌড়ে নামবে না। সে কুস্তির ময়দান বেছে নেবে। এবং, এটা একেবারেই ব্যক্তিগত ব্যাপার! এ নিয়ে গর্ব করা কিংবা অন্যকে ছোটো করা, ভুল প্রমান করা, একেবারেই ঠিক নয়।

আমি খুব সাদামাটা মানুষ… আমার এতো দৌড়াদৌড়ি ভালো লাগে না! আমার এতো better carrier, better future নিয়ে মাথা ব্যাথা নাই! আমি চাই আমার সন্তানেরা অল্পতে সন্তুষ্ট হতে শিখুক, মানুষকে ভালোবাসতে শিখুক, মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে শিখুক আর সর্বপরি একজন আত্মনির্ভরশীল সুখী মানুষ হিসেবে নিজেকে তৈরি করুক।

ওদের better carrier, better future নিয়ে ওরা যতটুক ভাবতে চায়, ভাবুক.. দৌড়াদৌড়ি যেখানে যতটা করতে চায়, করুক। ওদের জীবনের দৌড়ে আমার পা লাগানোর ইচ্ছা নাই। তবে ওদের যেকোনো দৌড়াদৌড়িতে আমরা ‘আমাদের সাধ্যমত’ ওদের পাশে থাকবো – এইটুকু শুধু বলতে পারি।

সন্তান নিয়ে আমার স্বপ্ন কিংবা তৃপ্তিটা খুব সাধারণ!

আমি চাই আমার বৃদ্ধ বয়সের কম্পমান হাতে তাদের সুস্থির উষ্ণ স্পর্শ থাকুক, আমার ঝাপসা চোখের সামনে তাদের মায়া ভরা হাসিখুশি মুখটা উজ্জ্বল হয়ে জ্বলতে থাকুক, আমার অস্পষ্ট কণ্ঠের সমস্ত শব্দ তাদের অন্তরে স্পষ্ট সুরে বাজতে থাকুক, যে সুরের প্রতিটা ছন্দ বাংলায় বোনা, প্রতিটা শব্দ বাংলায় শোনা!

Written by