
আজব শহর কলকাতা। আশ্চর্য তার রকমফের। এর অলি গলি জুড়ে ছড়িয়ে আছে হাজারো ইতিহাস। রোজকার নিত্য কোলাহলে বহু অজানা বিদ্যমান, যা দেখলে, ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। যেমন মাধো ভবন। কলকাতার মহাত্মা গান্ধী (পূর্বতন হ্যারিসন রোড) ও চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ-এর সংযোগস্থলে যাদের আনাগোনা, তাদের সিংহভাগই হয়তো লক্ষ্য করেন না এই বাড়িটিকে। আপাতদৃষ্টিতে মলিন ও ব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই ইমারতটির নাম মাধব ভবন, যা লোকমুখে আজ মাধো ভবন নামে পরিচিত। বিশ শতকের গোড়ায় নির্মিত এই বাড়ির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার বাণিজ্য, আদি বিশ্বায়ন ও নগরায়ণের কাহিনি। বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে প্রায়শই এটিকে দেখা যায়। এর খোলা উঠোন থেকে আকাশের দিকে তাকালে, এক অভূতপূর্ব অষ্টভুজাকৃতির (Octagonal) নকশা চোখে পড়ে। অনেকটা ক্যালেইডোস্কোপের মতো। তবে শুধু ভিজ্যুয়াল অ্যাপিল নয়, এর গভীরে প্রোথিত রয়েছে এক মানবিক আখ্যান।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে মাধো ভবন বেশ আকর্ষণীয়। এটিকে ‘Hybrid architecture’ বলা চলে। ভবনটিকে বাইরে থেকে সেকালের আর পাঁচটা নিও-ক্লাসিক্যাল কাজের মতোই দেখতে। সুউচ্চ থাম, পিলাস্টার, পেডিমেন্ট, বারান্দা, কাস্ট আইরন গ্রিল ও সেমি-সার্কুলার ব্লাইন্ড ফ্যানলাইট।
বিংশ শতক। উপমহাদেশ জুড়ে ইংরেজ শ্বাসনের শৃঙ্খল। ১৯১১ সালে দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তরিত হলেও, কলকাতার কৌলিন্য তখনও অক্ষুণ্ণ। পোক্ত প্রশাসন ও বন্দর ব্যবস্থার জেরে অনেকেই তখন শহরমুখী। এতে পার্শ্ববর্তী বিহার, বেনারস, আসাম, উড়িশা যেমন আছে, তেমনই ছিল সুদূর পশ্চিম। সে যুগে গুজরাট ও রাজস্থান বিশেষত জয়পুর, যোধপুর, শেখাবতী, বিকানের এবং মায়োড়ার অঞ্চল থেকে বহু মানুষ আসতেন। এই আগমন নতুন কিছু নয়। গবেষকদের মতে, বাংলা ও পশ্চিমের এই যোগাযোগ বহুকালের। মূলত মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তার ও তদ্পরবর্তী নবাবি আমলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হাত ধরে, মরুভূমির এই ব্যবসায়ীরা এখানকার অর্থলগ্নিকারী (Financier) হয়ে ওঠেন। এই প্রসঙ্গে যোধপুর থেকে আসা ‘জগৎ শেঠ’-দের কথা বিশেষ উল্লেখ্য। তারা ছিলেন ওসওয়াল জৈন; নবাবী আমলের প্রধান ব্যাঙ্কার। ভূমি রাজস্ব, টাঁকশাল পরিচালনা থেকে শুরু করে নিজস্ব হুণ্ডি, এমনকি বিদেশি ও বাদশাকে পর্যন্ত টাকা ধার দিতেন। ঐতিহাসিক উইলিয়াম ডালরিম্পলের কথায়, তাদের ক্রেডিট নোট লন্ডনেও সমান নির্ভরযোগ্য ছিল।

পশ্চিমাদের বাণিজ্যের এই রেশ, কোম্পানি যুগেও পরিলক্ষিত হয়। বাংলার তথাকথিত শিক্ষিত বাবুদের একাংশ যখন কেরানিগিরি, ওকালতি, ডাক্তারি কিংবা শিল্পচর্চায় মগ্ন, ঠিক তখনই এই দূরদর্শী বণিকরা মন দেন কারবারে। তৎকালীন বাণিজ্যপীঠ বড়বাজারকে কেন্দ্র করে তারা বসতি গড়ে তোলে। মূলত রেশম, সুতি, শস্য, চিনি, পাট ও সোনা, রুপোর কারবার করত তারা। সেই সঙ্গে সুদের ব্যবসাও চলত। এই ধনাঢ্য শেঠদের অধীনে প্রচুর অবাঙালি কাজ করতেন। বিংশ শতকের কলকাতা তখন ফুলে ফেঁপে উঠছে। দিকে দিকে অফিস, কাছাড়ি, দোকান ও সওদা। আনকোরা যেকোনো ব্যক্তির পক্ষে তা হিমশিমের। উপরন্তু ক্রমশ ক্রমবর্ধমান এই শহরের বুকে ভালো থাকার জায়গারও অভাব দেখা যায়। এই সমস্যাগুলির নিরাময় হেতু সেকালের বিশিষ্ট রাজস্থানি ব্যবসায়ী মাধো লাল সিন্ধি (মতান্তরে মাধো দাস দুগাড়) এগিয়ে আসেন। তিনি উত্তর কলকাতার এই তাৎপর্যপূর্ণ এলাকাটিকে বেছে নেন। একদিকে হাওড়া, অন্যদিকে শিয়ালদহ স্টেশন। তাছাড়া ঠিক চার রাস্তার মোড়ে হওয়ায়, যাতায়াতেও সুবিধা ছিল। ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯০৬ সালে। শেষ হতে সময় লাগে ষোলো বছর, অর্থাৎ ১৯২২-এ। এটি নিছক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান নয়। বরং রাজস্থান থেকে আসা ক্লান্ত পরিব্রাজক অথবা কাজের সন্ধানে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য একটি অস্থায়ী আবাসন বা ‘ট্রানজিট হাউস’ গড়ে তোলাই মাধোবাবুর লক্ষ্য ছিল। একসঙ্গে একশো জনেরও বেশি মানুষ থাকতে পারতেন। ট্রেন থেকে নেমে হ্যারিসন রোড বরাবর হেঁটে আসা শত শত রাজস্থানীদের প্রথম আশ্রয়স্থল ছিল এই বাড়িটি। পরিচিত গোষ্ঠি, ভাষা, খানপান- সুদূর প্রবাসে এ যেন এক টুকরো স্বদেশের ছোঁয়া।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে মাধো ভবন বেশ আকর্ষণীয়। এটিকে ‘Hybrid architecture’ বলা চলে। ভবনটিকে বাইরে থেকে সেকালের আর পাঁচটা নিও-ক্লাসিক্যাল কাজের মতোই দেখতে। সুউচ্চ থাম, পিলাস্টার, পেডিমেন্ট, বারান্দা, কাস্ট আইরন গ্রিল ও সেমি-সার্কুলার ব্লাইন্ড ফ্যানলাইট। সে যুগে অনেকেই এ ধরনের বাড়ি বানাতেন। নান্দনিকতার পাশাপাশি ঔপনিবেশিক শাসকের সঙ্গেও সামঞ্জস্য রাখা যেত। অবশ্য বাড়িটির ভেতরে গেলে অন্য রূপ। মূল প্রবেশদ্বার পেরোতেই এক সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহ ধরা দেয়। পাঁচতলা বিশিষ্ট এই ভবনের মূল আকর্ষণ এর অষ্টভুজাকৃতি গঠন। ভারতের ইতিহাসে এই ধরনের আবাসিক নকশা অত্যন্ত বিরল। সম্ভবত এটিই একমাত্র। সাধারণত এদেশে চতুষ্কোণ বা আয়তাকার উঠোন দেখা যায়।

এই অক্টাগোনাল হাউসের মূল উৎপত্তি উনিশ শতকের আমেরিকায়। ১৮৫০ ও ৬০-এর দশকে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের বিন্যাসের মূল লক্ষ্য, প্রতিটি ঘরে আলো-বাতাসের সঠিক সঞ্চালন। কলকাতার উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এটি আদর্শ। সেকালের দেশীয় স্থপতি, প্রকৌশলী ও মিস্ত্রিরা যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে এই জটিল জ্যামিতিকে রূপ দেন। মাঝের উঠোন এবং অলিন্দ বিন্যাস এতে আভিজাত্য এনেছে। এছাড়াও দেশীয় মোটিফ, আলপনা নকশার গ্রিল, দরজার বর্মা টিকের ব্যবহার ও রঙির কাঁচের জানালা নজর কাড়ে। ভবনটির আদল পাশ্চাত্য হলেও, এটির নির্মাণে কোনোরূপ আধুনিক সিমেন্ট বা কংক্রিট ব্যবহৃত হয়নি। বরং বাংলার চিরাচরিত চুন সুরকি ও কড়ি-বর্গা পদ্ধতিতে স্থানীয় রাজমিস্ত্রিরা এটি সৃজন করেছেন।

ভবনটির আদল পাশ্চাত্য হলেও, এটির নির্মাণে কোনোরূপ আধুনিক সিমেন্ট বা কংক্রিট ব্যবহৃত হয়নি। বরং বাংলার চিরাচরিত চুন সুরকি ও কড়ি-বর্গা পদ্ধতিতে স্থানীয় রাজমিস্ত্রিরা এটি সৃজন করেছেন।
তবে যেকোনো বাড়ির আসল প্রাণ তার ইট, কাঠ, পাথরে থাকে না, থাকে তার নিবাসীদের মাঝে। আজও এক জীবন্ত দলিল মাধো ভবন। কালে কালে বহু মালিকানা ও হাতবদল হয়েছে। বর্তমানে এর তিনজন মালিক। ভবনটি একাধিক অংশে বিভক্ত। নিচের তলায়, বিশেষত রাস্তার দিকে বেশ কিছু দোকান রয়েছে। যেমন ওষুধ, কাপড়, দরজি, ব্যান্ড ও মেডেল। সারাদিনের ব্যস্ততা ও ট্রাফিকের হর্ন পেরিয়ে ওপরে আসতেই ধরা দেয় এক শান্ত কলকাতা। আজও কয়েক ঘর ভাড়াটে এখানে বংশ পরম্পরায় থাকেন। বারান্দায় শুকোতে রাখা জামা, তুলসী মঞ্চ ও শিশুদের কলতান বাড়িটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। “ইদানীং ফেসবুক দেখে অনেক ছেলেমেয়ে আসছে। বেশিরভাগই ছবি তুলতে আসে। ফিল্মের লোকজনও এসেছে। এখন তো এটা বিখ্যাত। কলকাতা ঘুরতে এসে হাওড়া ব্রিজ, কালীঘাটের সঙ্গে মাধো ভবনও দেখে যায়।” কথাটা হয়তো ঠিক। তবে এই বিপুল খ্যাতির আড়ালেই অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও যত্নের অভাবে ভবনের বহু অংশ আজ জরাজীর্ণ। চুন খসা দেওয়াল, তারের জটলা ও কলকাতার এই আর্দ্র আবহাওয়া ক্রমশ এটিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলত আশু সংরক্ষণ প্রয়োজন। পুরসভা তথা স্থানীয় প্রশাসন এগিয়ে না আসলে, আগামী ভবিষ্যত হয়তো দেখতে পাবে না। স্বাধীন, সচেতন নাগরিক হিসেবে এটুকু তো করাই যায়।


