
শহর কলকাতার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সুবিশাল রাইটার্স বিল্ডিং কেবল একটি স্থাপত্য নয়, বাংলার আবহমান রদবদল, ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ, রক্তক্ষয়ী বিপ্লব ও স্বাধীনোত্তর বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। গত দেড় দশকে প্রশাসনিক ভরকেন্দ্র অন্যত্র স্থানান্তরিত হলেও, এই লাল বাড়ির গায়ে লেগে থাকা ইতিহাস ও আবেগ আজও অমলিন। ভাঙা গড়ার বহু কিছুর সাক্ষী থেকেছে মহাকরণ। লালদিঘির উত্তর পাড়ের এই বাড়িটি, কেমন ছিল গোড়ার ইতিহাস? শুরুর দিনগুলো?
সময়টা অষ্টাদশ শতক। সদ্য জেঁকে বসেছে ইংরেজ কোম্পানি। পলাশি, বক্সার অতীত। বাংলা, বিহার, উড়িশার বিপুল রাজস্ব ঢুকছে প্রতি বছর। তবে শুধু অর্থ উপার্জন কিংবা যুদ্ধ জিতলেই হয় না। সাম্রাজ্য বিস্তারের অন্যতম হাতিয়ার প্রশাসনিক রূপরেখা। সেকালে কোম্পানির হিসেব সামলাতো ‘রাইটার্স’রা। এই কেরানিকূলের প্রধান কাজগুলি মূলত ছিল- বাণিজ্যের আয় ব্যায়, হিসেবরক্ষণ, দাপ্তরিক চিঠিপত্রের অনুলিপি, কার্যবিবরণী লিপিবদ্ধ করা এবং মাদ্রাজ ও বোম্বের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। সে যুগে বহু ইংরেজ পাড়ি দিত কলকাতায়। ভারত তখন নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র। ইউরোপে অনেকেরই ধারণা ছিল একবার এ দেশে আসতে পারলেই হলো। যেন জীবন সার্থক। তবে বিশ্বাস ও বাস্তবের ফারাকটা আফ্রিকা পেরোতেই ধরা দিত। ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠত চারদিক। জলীয় আদ্রতা, অস্বস্তি, গরম- সবমিলিয়ে কলকাতায় ভিড়তে ভিড়তে নাজেহাল অবস্থা। এখানকার জল-হাওয়া সহ্য হত না অনেকেরই। তাছাড়া রোগ, ভোগ, মশা, মাছি তো আছেই। সেযুগের নথি ঘাটলে অসংখ্য মৃত্যুর কথা মেলে। অধিকাংশই তরুণ। কেউ কয়েক বছর, কয়েক মাস, এমনকি মাত্র কিছু দিনেই ইহলোকের মায়া ত্যাগ করত। অতএব উপনিবেশের এই ‘এসেনশিয়াল পিলার্স’দের রক্ষার্থে এগিয়ে আসে সরকার।
১৮৭১ সালে বিস্তৃতি ঘটে রাইটার্সের। সরকার জানায়, কলকাতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সমস্ত সরকারি অফিস এখানে আনা হবে। দৃঢ় করা হবে আমলাতন্ত্রকে। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড মেয়োর নির্দেশে গভর্নর জেনারেল জর্জ ক্যাম্পবেল এর দায়িত্ব নেন।

১৭৭৭ সাল। বাংলার গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস। বর্তমান মহাকরণের এলাকায় তখন সেন্ট অ্যানের ভগ্নপ্রায় গির্জা ছিল। সেটি ভেঙে জায়গাটির সদ্ব্যবহারের দায়িত্ব বর্তায় রিচার্ড বারওয়েলের ওপর। উদ্দেশ্য রাইটারদের থাকার জায়গা নির্মাণ। এর আগে আজকের জিপিও এলাকায় কিছু অস্থায়ী কটেজ ছিল করণিকদের। গবেষকদের মতে, ১৬৯০ সালে সেগুলি নির্মাণ করা হয়। গোড়াতে কাজ হলেও, বেশিদিন অবশ্য টেকেনি। ১৬৯৫ সালের ২৫ জুন, এক ভয়ংকর ঝড়ে সবটা ধসে পড়ে। ফলত এবারের পরিকল্পনা ছিল যথেষ্ট পোক্ত। সরকারি নীতি মেনে শুরু হয় নির্মাণ।
বারওয়েল কাজটি দেন টমাস লায়নকে। বলে রাখে ভালো, প্রখ্যাত এই স্থপতির নামেই বর্তমান স্টক এক্সচেঞ্জ ও মহাকরণের মাঝের রাস্তার নাম হয়েছে ‘লায়নস রেঞ্জ’। ভবনটি সম্পন্ন হয় ১৭৮০ সালে। মোট ৩৭,৮৫০ বর্গফুট জুড়ে তৈরি হয়েছিল মূল অংশ। শুরুতে এটি ছিল দ্বিতল ও সাদামাটা। তেমন বিশেষ কারুকাজ না থাকায় অনেকের চোখেই তা ছিল মলিন। আবাসনের পাশাপাশি টুকটাক কাজ, গুদামঘর ও দোকানিদের ভাড়া দেওয়া হত। এমনকি তরুণ ইংরেজদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও ছিল ভেতরে। এদেশে কাজ করার ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষা যথা বাংলা, উর্দু, সংস্কৃত, আরবি ও ফার্সি জানা আবশ্যিক। সেই উদ্দেশ্যেই ১৭৯৯ সালে তৈরি হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। পরবর্তীতে কিছু জটিলতার কারণে, সেটি স্থানান্তরিত হয় রাইটার্সে।

সময়ের সঙ্গে আরও কিছু বদল দেখা যায়। বারওয়েলের ভবনকে অক্ষত রেখে, পরবর্তীতে ছ-টি ব্লক গড়ে তোলা হয়। সাম্রাজ্যের ‘Imperial projection’ মাফিক জোর দেওয়া হয় শিল্পরুচিতেও। মূলত গ্রেকো-রোমান ও নিও-ক্লাসিক্যাল প্রভাব এতে লক্ষণীয়। বাদ যায়নি ফরাসি ছোঁয়াও। সুউচ্চ থাম, পোর্টিকো, প্রাচীর, গুল্ম ও নকশার পাশাপাশি নজর কাড়ে প্রাচীন দেব-দেবীর ভাস্কর্য। ভবনের মাথায় বিরাজমান রোমের জ্ঞান, যুদ্ধ ও ন্যায়ের দেবী মিনার্ভা। বর্তমানে অশোক চক্র থাকলেও, স্বাধীনতার আগে এখানে ব্রিটিশ ‘coat of arms’ ছিল। এছাড়াও জুপিটার (ন্যায়বিচার), মার্কারি (বাণিজ্য), সেরেস (কৃষি) ও হেবি (চিরযৌবন) সহ ইয়োরোপীয় ও ভারতীয় চিত্রায়ন বিশেষ উল্লেখ্য।
১৮৭১ সালে বিস্তৃতি ঘটে রাইটার্সের। সরকার জানায়, কলকাতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সমস্ত সরকারি অফিস এখানে আনা হবে। দৃঢ় করা হবে আমলাতন্ত্রকে। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড মেয়োর নির্দেশে গভর্নর জেনারেল জর্জ ক্যাম্পবেল এর দায়িত্ব নেন। সংলগ্ন সকল দোকান, গুদাম-সহ ভাড়াটেদের সরিয়ে ফেলা হয়। ১৮৮০ থেকে ১৯১১, প্রায় ৩১ বছর গোটা ভারতের শাসন প্রণালী এই চত্বর থেকেই পরিচালিত হত। তবে শুধু ছোটলাট, বড়লাট নয়, এই বাড়িতে মিশে আছে হাজারো শ্রমের বয়ান। বিগত দুই শতকেরও বেশি সময় ধরে এখানকার উঁচু সিলিং, বিশাল কাঠের জানালা আর টানা বারান্দাগুলো সাক্ষী থেকেছে লক্ষাধিক দীর্ঘশ্বাস ও ক্লান্তির। একসময় দিন শুরু হত নথির খসখস আওয়াজ দিয়ে। এরপর বিংশ শতকে স্থান নেয় টাইপরাইটার। খটাখট শব্দ, লাল ফিতে, হলদে ফাইলের স্তূপ- এই-ই ছিল মহাকরণের দৈনন্দিন। বাংলার নানা প্রান্ত হতে বহু মানুষ এখানে আসতেন। তাদের স্ব স্ব দাবি। এভাবেই ভারত তথা বাংলাকে সচল রেখেছিল রাইটার্স।

তবে শুধু ঐতিহ্য নয়, বর্তমানে এর প্রভূত আর্থ-সামাজিক প্রাসঙ্গিকতাও রয়েছে। ভৌগোলিক দিক থেকে এটি শহরের মাঝাখানে হওয়ায়, সাধারণ মানুষের যাতায়াতে তা সুবিধার। একসময় সচিবালয় স্থানান্তরনের ফলে বড়ো ধাক্কা খায় স্থানীয় ছোটো ব্যবসায়ী, হকার, চা দোকানি ও খাবার বিক্রেতারা।
মহাকরণের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়টি অবশ্য রচিত হয় ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর। ভারতে তখন সশস্ত্র সংগ্রামের যুগ। একদিকে ইংরেজদের দমন-পীড়ন, উত্তাল বিশ্বরাজনীতি, দেশীয় মানুষের হাহাকার- সব মিলিয়ে এক কঠিন সময়। বিপ্লবী সন্দেহে সেসময় পুলিশ তুলে নিয়ে যেত। কারগারে দিনের পর দিন চলত অত্যাচার। তৎকালীন Inspector General of Prisons ছিলেন এন.এস সিম্পসনস। ভারতীয় কারাবন্দিদের ওপর অকথ্য দমনের অভিযোগে বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত উক্ত দিনে তাকে রাইটার্সে ঢুকে হত্যা করে। ইতিহাস খ্যাত সেই ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ ঔপনিবেশিক অহং-এর দর্প চূর্ণের নজির। এভাবেই পরতে পরতে জমে আছে বহু ইতিহাস।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর মহাকরণ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তৈরি হয় আরও চারটি ভবন। মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায় থেকে শুরু করে জ্যোতি বসু তথা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শাসনকাল- এক দীর্ঘ যুগের সাক্ষী এই ভবন। আন্দোলন থেকে বিতর্ক, আড্ডা থেকে রাজনীতির চির গমগমে এই সভার ছেদ পড়ে ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে। সংরক্ষণের প্রয়োজনে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর সহ বিবিধ বিভাগ সাময়িক রূপে স্থানান্তরিত করা হয় হাওড়ার এইআরবিসি বিল্ডিং বা নবান্ন-এ। যদিও সেই ‘সংরক্ষণ’ আজও হয়নি। ইতিমধ্যেই প্রশাসন বদলের পর নব নির্বাচিত সরকার সেটি পুনর্ব্যবহারের কথা জানিয়েছিলেন। ধনতন্ত্রের প্রকোপে ক্রমাগত একের পর এক অবস্থান যেখানে আজ বিপন্ন, আমাদের উচিত সেই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বহন করা। মহাকরণ কেবল চুন-সুরকি ও ইটের গাঁথনি নয়। বরং বাঙালির ইতিহাস, সংগ্রাম ও আবেগের এক প্রবহমান ধারা। এই লাল বাড়ির ছায়া পড়ত দিঘির জলে। কথিত, সেই থেকেই এর নাম হয় লালদিঘি। এককালের ট্যাঙ্ক স্কোয়ার, ডালহৌসি হয়ে আজকের বিবাদীবাগ- শহর কলকাতা যা যা কারণে মহানগর, রাইটার্স তার অন্যতম। ভবনের নান্দনিক কাঠামো বজায় রেখে আধুনিক নব-প্রযুক্তির ব্যবহার অধিক ফলপ্রসু হবে। এছাড়াও নিয়মিত ‘কিউরেটেড হেরিটেজ ওয়াক’ এবং শিক্ষামূলক ট্যুরের আয়োজন করা প্রয়োজন, যা আগামী প্রজন্মকে সচেতন করবে।

তবে শুধু ঐতিহ্য নয়, বর্তমানে এর প্রভূত আর্থ-সামাজিক প্রাসঙ্গিকতাও রয়েছে। ভৌগোলিক দিক থেকে এটি শহরের মাঝাখানে হওয়ায়, সাধারণ মানুষের যাতায়াতে তা সুবিধার। একসময় সচিবালয় স্থানান্তরনের ফলে বড়ো ধাক্কা খায় স্থানীয় ছোটো ব্যবসায়ী, হকার, চা দোকানি ও খাবার বিক্রেতারা। ফলত পুনরায় আনাগোনা বাড়লে, এই ‘informal economy’গুলি নিঃসন্দেহে প্রাণ ফিরে পাবে।
_________________
তথ্যসূত্র:
২। https://ganashakti.com/index.php/news/writers-building-maintenance-is-to-destroy-history

