
কেবল সমাজসংস্কার, শিক্ষাবিদ নন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আদতে বাঙালি জাতির শিরদাঁড়া গড়ার কারিগর। রবি ঠাকুর তাঁর ‘বিদ্যাসাগরচরিত’-এ লিখছেন— “আমাদের এই অবমানিত দেশে ঈশ্বরচন্দ্রের মতো এমন অখণ্ড পৌরুষের আদর্শ কেমন করিয়া জন্মগ্রহণ করিল, আমরা বলিতে পারি না। কাকের বাসায় কোকিলে ডিম পাড়িয়া যায়— মানব-ইতিহাসের বিধাতা সেইরূপ গোপনে কৌশলে বঙ্গভূমির প্রতি বিদ্যাসাগরকে মানুষ করিবার ভার দিয়াছিলেন।” আরও বলছেন— “দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রে প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।” বিদ্যাসাগরের আবেগী মন, তাঁর শিক্ষা, মূল্যবোধ সব কিছুই তাঁর অজেয় পৌরুষ ও ব্যক্তিত্বের অঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি তাঁর ধুতি, চাদর, চটি-জুতোও হয়ে গিয়েছিল অজেয় ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিখ্যাত ‘বিদ্যাসাগর চটি’র স্মৃতি আজও আগলাচ্ছে কলেজস্ট্রিটের ইতিহাস প্রসিদ্ধ এক জুতোর দোকান। সেগুন কাঠের পুরোনো সাইন বোর্ডটিতে জ্বল জ্বল করছে নাম ‘কেএম দাস এন্ড কো’।
আজ থেকে প্রায় দেড়-দুই শতক আগের ঘটনা। কলকাতায় সে সময় বুট পরা সাহেবদের রাজত্ব। স্বাধীনতার লড়াই তখনও দানা বাঁধেনি। সাহেবদের বুটের বিরুদ্ধে একপ্রকার প্রতিরোধ হয়ে উঠেছিল সাদামাটা, আড়ম্বনহীন এক জুতো। নাম— ‘বিদ্যাসাগরি চটি’। খোদ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই বিশেষ ধরণের চটি পরতেন। কেবল পরতেন তা নয়, বিদ্যাসাগরের অনমনীয় ব্যক্তিত্বের অঙ্গ হয়ে গিয়েছিল এই চটি। হয়ে উঠেছিল পাল্টা জবাবের হাতিয়ার।
হালে ‘বিদ্যাসাগরি চটি’ হারিয়ে যেতে বসেছিল। ফের তা ফিরিয়ে এনেছে ‘কেএম দাস এন্ড কো’। দোকানটির ঠিকানা— বর্ণপরিচয় মার্কেট, ব্লক বি, ফার্স্ট ফ্লোর। দোকানের কর্ণধার তরুণকুমার মুখোপাধ্যায় জুতোর কারিগরদের শিখিয়ে, পড়িয়ে দিয়েছেন ‘বিদ্যাসাগরি চটি’ তৈরির আদব-কায়দা।

‘বিদ্যাসাগরি চটি’কে ঘিরে কাহিনির শেষ নেই। সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হিন্দু কলেজের অধ্যক্ষ জেমস কারের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। সাহেব চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালেনই না, উল্টে বুটজুতো পরা পা টেবিলে তুলে কথা বলে গেলেন। সেই সময় আর উত্তর দিলেন না বিদ্যাসাগর। জবাবটা দিলেন কিছুদিন পর। জবাব দেওয়ার পাল্টা মাধ্যম হয়ে উঠল চটি। কার সাহেব কোনও কাজে সংস্কৃত কলেজে এলেন। তখন বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ। বিদ্যাসাগরের ঘরে কার সাহেব প্রবেশ করতেই দয়ারসাগর চটি পরা পা জোড়া তুলে দিলেন টেবিলে। সেইভাবে চলল কথাবার্তা।
আর এক ঘটনা। ১৮৭৪ সাল, এশিয়াটিক সোসাইটিতে ঢুকতে গিয়ে বাধা পেলেন বিদ্যাসাগর। কারণ, চটি পরে ভিতরে প্রবেশ করা যাবে না। চটি বাইরে খুলে যেতে হবে। বিদ্যাসাগর ফিরে গেলেন। ফিরেই একখানা পত্রবোমা নিক্ষেপ করলেন কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে। প্রশ্ন তুললে, কেন দেশীয় চটি পরে প্রবেশ করা যাবে না। বাহ্যিক বেশভূষা দিয়ে মানুষকে বিচার করার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুললেন ঈশ্বরচন্দ্র। আদতে সাহেবদের জুতোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হিসাবেই দেশীয় চটিকে গোটা জীবন ব্যবহার করেছেন বিদ্যাসাগর। স্বদেশের চটি হয়ে উঠেছিল তাঁর গর্ব। এ প্রসঙ্গে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী যথার্থ লিখেছেন, ‘‘চটি জুতার প্রতি তাঁহার (বিদ্যাসাগর) আত্যন্তিক আসক্তি ছিল বলিয়াই তিনি যে চটিজুতা ভিন্ন অন্য জুতা পায়ে দিতেন না, এমন নহে। আমরা যে স্বদেশের প্রাচীন চটি ত্যাগ করিয়া বুট ধরিয়াছি, ঠিক তাহা দেখিয়াই যেন বিদ্যাসাগরের চটির প্রতি অনুরাগ বাড়িয়া গিয়াছিল। বাস্তবিকই এই চটিজুতাকে উপলক্ষ মাত্র করিয়া একটা অভিমান, একটা দর্প তাঁহার অভ্যন্তর হইতে প্রকাশ পাইত।’’
বিদ্যাসাগর কলেজ স্ট্রিটের কয়েকজন চর্মশিল্পীর কাছ থেকে জুতো কিনতেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ক্ষেত্রমোহন দাস। প্রথমে তালতলার চটিই পরতেন বিদ্যাসাগর। পরে নকশায় খানিক বদল আসে, জুতোর সামনের অংশে এসে পড়ে শুঁড়। তালতলার চটিই হয়ে ওঠে ‘বিদ্যাসাগরি চটি’। সম্ভবত চটির গড়ন বদলানোর ভাবনা বিদ্যাসাগরের মাথাতেই এসেছিল। হালে ‘বিদ্যাসাগরি চটি’ হারিয়ে যেতে বসেছিল। ফের তা ফিরিয়ে এনেছে ‘কেএম দাস এন্ড কো’। দোকানটির ঠিকানা— বর্ণপরিচয় মার্কেট, ব্লক বি, ফার্স্ট ফ্লোর। দোকানের কর্ণধার তরুণকুমার মুখোপাধ্যায় জুতোর কারিগরদের শিখিয়ে, পড়িয়ে দিয়েছেন ‘বিদ্যাসাগরি চটি’ তৈরির আদব-কায়দা। যে প্রতিষ্ঠানে জন্ম, সেখানেই পুনর্জন্ম হয়েছে বিদ্যাসাগর চটির।

একেবারে সহজসরল চটি। পিছন দিক অর্থাৎ গোড়ালির জায়গাটা ফাঁকা, সেখান থেকে পা গলাতে হয়। পায়ের পাতার জায়গাটি চামড়ায় ঢাকা। আঙুল গলানোর জায়গা নেই। সামনের দিকটা শুঁড় তোলা। বঙ্গদর্শন.কম-কে একান্ত সাক্ষাৎকারে তরুণ মুখোপাধ্যায় বললেন— ‘‘আদিচটি ছিল শুঁড় ছাড়া। নাম ছিল তালতলা চটি। অনেক ক্রেতা একেই বিদ্যাসাগর চটি বলত। তখন মূলত তিনটে জুতো ছিল— বিদ্যাসাগর চটি, ঠনঠনিয়া চটি বা তালতলার চটি এবং গান্ধী চটি বা মাদ্রাজী চপ্পল। গান্ধীজি এই ধরনের জুতো পরতেন তাই নাম গান্ধী চটি। সেটা ছিল আঙুল দেওয়া।’’
তালতলার চটি এবং বিদ্যাসাগর চটির ফারাক প্রসঙ্গে তিনি জানালেন— ‘‘শুঁড় ছাড়াও জুতোর আকৃতির ফারাক আছে। তালতলা চটির চওড়া অংশটা বেশি। বিদ্যাসাগর চটির কম। এর বৈশিষ্ট্য হল চামড়ার সেলাই। গরুর লেজকে সরু সরু সুতোর মতো কাটা হত। খুব সরু নয়। পাটের দড়ির মতো। তাই দিয়ে সেলাই করা হত। সুতোর কোনও ব্যবহার নেই। আঠার কোনও ব্যবহার নেই। ওসব অনেক পরে এসেছে। চামড়া দিয়ে সেলাই। চামড়াটাকে ভিজিয়ে একেবারে কাদা কাদা করে ফেলা হত। নরম হয়ে যেত। তারপর ওর মধ্যে সূঁচ ঢুকত।’’
তিনি আরও বললেন, ‘‘বিদ্যাসাগর চটিটা বহুদিন ছিল না। আমরা নতুন কনসেপ্ট নিয়ে এসেছি। আগে ছিল চামড়ার সোল, গরুর লেজ দিয়ে সেলাই। এখন আমরা ওটা পেস্টিং করছি। সোলটা রাবারের, বাকি ওপরের পুরোটা চামড়া। যাঁরা পুরোনো ক্রেতা, একটু বয়স হয়েছে, তাঁরা এই জুতোটা পরে আরাম পাচ্ছে। আরামদায়ক হয়েছে। আগে জুতোটা নরম হত না। পুরোটাই কাঠখোট্টা ছিল।
এই মুহূর্তে বিদ্যাসাগর চটির চাহিদা অনেক কম। আগেকার দিনের চটিতে আঙুলের গ্রিপ ছিল না। এখন যেমন থাকে, বুড়ো আঙুল ঢুকে যায়। এখন বাস, ট্রেনে অফিস-কাছারি যাওয়া… আঙুল না-থাকলে গ্রিপ হয় না, সমস্যা হয়। সেই জন্য চাহিদা কম। তবে পুরোনো মানুষেরা খোঁজেন, নিয়ে যান। ইয়ং ছেলেরা, যাঁরা নাম শুনেছে। তাঁরাও নেয়। এক সময় ছিল, বাড়িতে একটা বিদ্যাসাগর চটি থাকবেই। ধুতি, পাঞ্জাবি, বিদ্যাসাগর চটি আর অষ্টমীর পুজো, এটাই বাঙালির ঐতিহ্য। প্রবাসী বাঙালিরা এটা ভীষণ পছন্দ করে, আভিজাত্যের প্রতীক। বোম্বেতে প্রচুর চাহিদা ছিল। আমাদের জুতো বাংলার বাইরে বিভিন্ন রাজ্যে, দেশে-বিদেশে গিয়েছে। এখনও যায়। অনেকে বিদ্যাসাগর চটি তৈরি করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু খারাপ করে দিয়েছে, ঐতিহ্য শেষ করে দিয়েছে।’’

ধুতি, পাঞ্জাবি, বিদ্যাসাগর চটি আর অষ্টমীর পুজো, এটাই বাঙালির ঐতিহ্য। প্রবাসী বাঙালিরা এটা ভীষণ পছন্দ করে, আভিজাত্যের প্রতীক। বোম্বেতে প্রচুর চাহিদা ছিল। আমাদের জুতো বাংলার বাইরে বিভিন্ন রাজ্যে, দেশে-বিদেশে গিয়েছে। এখনও যায়।
এখন বাদামি আর কালো— দুই রঙের বিদ্যাসাগর চটি পাওয়া যায়। একদা সাদা, লাল, সবুজ ইত্যাদি রঙের বিদ্যাসাগর চটি পাওয়া যেত। বাঘ, হরিণ, গোসাপের চামড়া দিয়েও এই চটি তৈরি হত। কমপক্ষে বিশ-ত্রিশ রকমের বিদ্যাসাগর চটি মিলত, এমনই জানালেন তরুণ মুখোপাধ্যায়। সত্যজিৎ রায়, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অনিল চট্টোপাধ্যায়, মান্না দেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, অপর্ণা সেনদের মতো তারকারা এ দোকান থেকে বিদ্যসাগর চটি কিনতেন। বিশ্বজিৎ, ধর্মেন্দ্র, প্রদীপকুমার, আশা পারেক, রাখি গুলজারদের জুতোও যেত এখান থেকে। তরুণ বলছিলেন— ‘‘মহানায়ক নিজে আসেননি কখনও। তাঁর জুতো এখান থেকে যেত। যখন উত্তমকুমার মারা গেছেন তখনও পাঁচ-ছয় জোড়া জুতোর অর্ডার ছিল। ছয় ও সাতের দশকের বাংলা সিনেমায় প্রায় সবই আমাদের দোকানের জুতো ব্যবহার হয়েছে। তখনকার রুপোলি পর্দার নায়কদের পায়ে বিদ্যাসাগর চটিই দেখা যেত।’’
প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবৎ ব্যবসা সামলাচ্ছেন তরুণ, তাঁর কথায়, ‘‘আমার ঠাকুরদা মহেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ১৯৪২ সালে এই দোকানটা নেন। কেএম দাস হলেন ক্ষেত্রমোহন দাস। তাঁর দোকান ছিল নিমতলার কোনও এক জায়গায়, নিমতলা স্ট্রিটের কোথাও। ১৮৩৮ ওখানেই শুরু। যখন কলেজস্ট্রিট মার্কেট তৈরি হয় তখন থেকে দোকান বইপাড়ায়। তিনি ষাট-সত্তর বছর দোকান চালিয়েছেন। তারপর একজন পাঞ্জাবি, মুসলিম ভদ্রলোক আরও ষাট-সত্তর বছর দোকান চালায়। তারপর ১৯৪২ সালে আমরা নিই। নামটা পাল্টাইনি। ওই নামে চলছে। আমি সাতের দশক অর্থাৎ কলেজ লাইফ থেকে দোকানে আসছি।’’ পাশেই কেএম দাসের নামে আর একটি দোকান। সেটি তরুণ মুখোপাধ্যায়ের খুড়তুতো ভাইদের দোকান।
একদা কেএম দাস-এর দোকান ছিল বাঙালির ফুটওয়্যার ফ্যাশনের পীঠস্থান। গত শতকের স্টাইল আইকনেরা এ দোকানের জুতোকে ভরসা করতেন। তরুণকুমার মুখোপাধ্যায়ের বাবা সত্যরঞ্জন মুখোপাধ্যায় প্রথম কোলাপুরি চপ্পলের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় করান। তরুণকুমার মুখোপাধ্যায়ের আগামীর পরিকল্পনা মাদ্রাজী চপ্পলকে ফিরিয়ে আনা।

তাঁদের ব্যবসা ধাক্কা খেয়েছে, যার কারণ ঠাঁইনাড়া হওয়া। বর্ণপরিচয় মার্কেটে বর্ণপরিচয়ের স্রষ্টার নামে খ্যাত চটির নির্মাতা জায়গা পেয়েছে বটে কিন্তু সে জায়গা ব্যবসা করার পক্ষে আদৰ্শ নয়। আঁধার, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের গোলকধাঁধায় দোকানে যাওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া দায়। শিকড় হারালেও ইতিহাসকে তাঁরা হারিয়ে যেতে দেননি। ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের বিদ্যাসাগর চটিকে একুশ শতকেও বাঁচিয়ে রাখছেন।

