
উত্তর সিকিমের ছোট্ট শহর লাচুং থেকে মাত্র দু’ঘণ্টার পথ, সমুদ্রতল থেকে ৩৫৬৪ মিটার উচুঁতে অবস্থিত উপত্যকা ইয়ুমথাঙ। নরম রোদ্দুর ছড়িয়ে থাকে উপত্যকার চারিদিক ঘিরে
সিকিম রাজ্যের রাজধানী গ্যাঙটক থেকে ১৫০ কি মি দূরে- সমুদ্রতল থেকে ৩৫৬৪ মিটার উচুঁতে অবস্থিত উপত্যকা ইয়ুমথাঙ। ইয়ুমথাঙ আসলে উত্তর সিকিমের ছোট্ট শহর লাচুং থেকে যেতে হয়। সেখান থেকে দু’ঘণ্টার পথ। ইয়ুমথাঙে কোনও জনবসতি নেই। লাচুং-ই সবচেয়ে কাছের একমাত্র থাকার জায়গা।
নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশন বা বাগডোগড়া বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে লাচুং যাওয়া যায়। তবে স্টেশন বা বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সি তে গ্যাঙটকে এসে একরাত কাটিয়ে পরদিন লাচুং যাওয়াই ভালো। গ্যাঙটক থেকে বাস ও ট্যাক্সি পাওয়া যায় সব সময়।
গ্যাঙটক-লাচুং: ১০০ কিমি (৩ঘণ্টা)
বাগডোগড়া-লাচুং: ২০০ কিমি (৪ঘণ্টা)
নিউজলপাইগুড়ি-লাচুং: ২২৮ কিমি (৫ঘণ্টা)
দার্জিলিং-লাচুং: ১৭০ কিমি (৪ঘণ্টা)
ইয়ুমথাং যাওয়ার আয়োজন হোটেল থেকে করা যায়।
উপযুক্ত সময় : এপ্রিল – জুন
আমরা যখন লাচুং-এর হোটেল থেকে বেরোলাম ইয়ুমথাঙের উদ্দেশ্যে; তখন সকাল ৮টা। কুয়াশার চাদর সরে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। সূর্য অনেক আগে উঠলেও তার তেজ তখনও প্রখর হয়ে ওঠেনি। নরম রোদ্দুর ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। শীতের কমলালেবু রোদ যেমন হাত বুলিয়ে দেয় আলগা করে; সেই রকম আলতো রোদ আমাদেরকে জড়িয়ে আছে তখন। গাড়ি ছাড়ল। আমাদের সঙ্গের চালকটি নেপালী। ভীষণ মিশুকে। পরিষ্কার হিন্দিতে সে গল্প করছিল তার বাড়ির –ফেলে আসা গ্রামের। আর আমরা আস্তে আস্তে পাহাড়ি পথ বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম উপরের দিকে। লাচুং ছাড়ালে আর কোনও জনবসতি নেই। রাস্তার দু’ধার সবুজ ঘাসে ঢাকা। বাঁদিকে সবুজ বনস্পতি ঘেরাপাহাড়। আর ডানদিকে নীচে বয়ে চলেছে তিস্তার শাখা নদী। সেই নদী আমাদের এক মাত্র সঙ্গী সমস্তটা পথ – যেন আমাদের পথ প্রদর্শক। আর চোখের সামনে দূরে দেখা যাচ্ছে সাদা বরফের চূড়ো। সেই চূড়োর নীচে জমে রয়েছে মেঘের দল। আমরা এগিয়ে চলেছি সেই আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি। দেখে মনে হচ্ছে যেন ওই সবুজ টুকু পার হলেই বুঝি ছুঁতে পারব মেঘগুলোকে। পৃথিবীতে যেন আর কোনও রঙ নেই এই সবুজ আর সাদা টুকু ছাড়া। সবুজ ঘাস ভেঙ্গে কোথাও সাদাপাথর রাশিরাশি। আবার কোথাও সাদা পাথরের গা ঘেঁষে ফুটে উঠেছে একটুকরো সবুজজীবন। অযত্নেও। জীবন যে আসলে অপ্রতিরোধ্য তার প্রমাণ যেন ওই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সবুজ চারাগুলো।
এরপর শুরু হল ফুলের মেলা। সময়টা এখন এপ্রিল মাস। বসন্ত ফুরিয়ে সবে বৈশাখের শুরু। তাই সব ফুলফোটেনি এখনও। রঙিন কুঁড়ি সবে মেলতে শুরু করেছে পাপড়ি | সবুজ সরে গিয়ে আস্তে আস্তে এল গোলাপি আর হলুদের দল। রোডো ডেন্ড্রণ আর হিমালয়ান সর্ষে। দু’টো গাছই আসলে গুল্ম। মাটির উপরে ছড়িয়ে রয়েছে গালিচার মত। শিশিরে মাখা। ভেজা ভেজা নরম তুলোর মত। কয়েকটা গাছ আবার একটু বড়। চারফুট মত। ঝাড়ের মত ঢেকে রয়েছে চারিধার। আমরা গাড়ি থেকে নেমে কিছু ফটো নিলাম। দূরের সাদা পাহাড়গুলো তখন একদম কাছে চলে এসেছে। বিশাল পাহাড়ের কাছে নিজেদের কে কত ক্ষুদ্র বলে মনে হচ্ছে!
এখান থেকে পাঁচ মিনিট গিয়েই আমরা পৌছুঁলাম ইয়ুমথাঙ উপত্যকা | উপত্যকার বুকচিরে বয়ে চলেছে সেই তিস্তার শাখা নদীটা। প্রবাহটার দুপাশে সবুজ চারণভূমি। এদিক ওদিক চরে বেড়াচ্ছে চমরীগাই। সমস্ত উপত্যকাটা গোলাপি রোডোডেন্ড্রণ গুল্মেভরা। তাই এর আরেক নাম ‘ফুলের উপত্যকা।’ মাথার উপর স্বচ্ছ নীল আকাশ – পায়ের নীচে নরম গোলাপি গালিচা। প্রবাহের জলটা আয়নার মত। নীচের পাথরগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তার উপর দিয়েই বয়ে চলেছে জল । আর আমরা আরও আশ্চর্য হয়ে গেলাম যে জল বয়ে যাওয়ার কোনও শব্দ নেই। নিঃশব্দ-নিস্তরঙ্গ। দেখে মনে হচ্ছে যেন অনাদি কাল ধরে বয়ে চলেছে। এর কোনও আদি নেই। কোনও অন্ত নেই। এ পৃথিবী শেষ হলেও যেন এ জলের ধারা ফুরোবে না। অনন্ত সে চলা। দুজনে মিলে পা ডুবিয়ে বসে ছিলাম অনেকক্ষণ। হিমের পরশতার। কথা ছিল না কোনও| আমরা অনেক ক্ষণ হাঁটলাম আস্তে আস্তে প্রবাহটার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। প্রবাহ টা দূর পাহাড় থেকে নেমে এসেছে। সামনে গিয়ে বেঁকে গিয়েছে ডান দিকে। ওই দিকটায় একটু চওড়া সে। চালক বলল – "জ্যোৎস্না-পূর্ণিমার রাতে এখানে তাঁবু এনে থাকা যায়। তার জন্য অনুমতি নিতে হয় পর্যটক ভবন থেকে।"
দূরে রাস্তার উপর সহিস দাঁড়িয়ে ছিল সোনালী চুলের ঘোড়া নিয়ে। ঘোড়াটার নাম মোনা। সমস্তটা দেখে মনে হচ্ছিল এ বোধ হয় ইংরাজি বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা রূপকথার রাজ্য। রাস্তাটার ধারে একটা ছোট্ট ভাঙ্গা খামার। তার সামনে বেদীর উপর মালা দেওয়া। পাহাড়ি গ্রামের মেয়েরা এদিক দিয়ে যাওয়ার সময় ওখানে চড়িয়ে যায়। আমরা ওই পথটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। নীচু ঢালুপথ বেয়ে একটা ছোট্ট প্রবাহের পাশে এসে দাঁড়ালাম। আসলে এটা ওই তিস্তার শাখা নদীটার অংশ। শুধু পাহাড় টুকু একে আর চারপাশ থেকে আলাদা করে দিয়েছে। পাথরের উপর দিয়ে জল পেরিয়ে যেতে হয় প্রবাহটার কাছে।
কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম মন্ত্রমুগ্ধের মত মনে নেই। হুঁশ ফিরল চালকের ডাকে – "ম্যাডাম, সূর্য ডোবার আগে পেরোতে হবে এই পথটা।" ঘড়িতে তখন বিকেল ৫টা। গাড়ি নামতে থাকল নীচের দিকে। ক্ষণিকের অতিথি আমরা। তবু এই স্বল্প সময়ের স্বপ্নালু দেশটুকু চিরদিনের জন্য জায়গা করে নীল মনের মণি কোঠায়। চোখ বুজে হারিয়ে যাচ্ছি আমি একটা জ্যোৎস্না-ভরা রাতে। চতুর্দিক সাদা হয়ে আছে জ্যোৎস্নার আলোয়। মাথার উপর তারায় ভরা নীল আকাশ। আর নীচে স্বচ্ছ জলের উপর পূর্ণিমার চাঁদের প্রতিচ্ছবি। ভালো থেকো ইয়ুমথাং | ফিরে আমি আসবই আবার… |
