প্রথম বাঙালি তথা ভারতীয় হিসেবে ‘ম্যানগ্রোভ ম্যান’-এর হাতে ডব্লিউ ডব্লিউ এফের পুরস্কার

গত ১২ বছর ধরে তিনি সাড়ে ছয় লক্ষ ম্যানগ্রোভ রোপণ করেছেন

পেশায় শিক্ষক হলেও সুন্দরবনের সবাই তাঁকে ‘ম্যানগ্রোভ ম্যান’ নামে চেনে৷ নাম উমাশঙ্কর মণ্ডল৷ গত ১২ বছর ধরে সাড়ে ছয় লক্ষ ম্যানগ্রোভ রোপণ করেছেন৷ এই শিক্ষকই এবার পেলেন প্রথম বাঙালি তথা ভারতীয় হিসেবে ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড (ডব্লিউ ডব্লিউ এফ)-এর ডঃ রিমিংটন পুরস্কার।

উমাশঙ্কর ম্যানগ্রোভ রোপণ ও পরিচর্যা করে চলেছেন এক যুগের বেশি। তাঁর নিজস্ব উদ্যোগে ‘পূর্বাশা ইকো হেল্পলাইন সোসাইটি’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গড়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় ম্যানগ্রোভ রোপণের আদর্শ মডেল গড়ে তুলেছেন। পাশাপাশি এলাকার আর্থ সামাজিক ছবিটাই পাল্টে দিয়েছেন সুন্দরবনের এই ম্যানগ্রোভ ম্যান। ২০১৮ থেকেই পরিবেশের রক্ষায় ডঃ রিমিংটন পুরস্কার দেওয়া হয়। মূলত ব্যাঘ্র সংরক্ষণের প্রকল্পে বিশেষ অবদান ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরার জন্যই এই পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ছাড়াও যুবদের কাজের জন্যও রিমিংটন পুরস্কার দেওয়া হয়। উমাশঙ্করের আগে এই পুরস্কার পেয়েছেন মালয়েশিয়ার শাহ রেজা। তিনি ব্যাঘ্র সংরক্ষণে দুর্দান্ত অবদানের জন্য এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। এবার প্রথম ভারতীয় হিসেবে উমাশঙ্করের এই পুরস্কার প্রাপ্তির সংবাদ সুন্দরবনের মানুষের কাছে আনন্দের।

উমাশঙ্করের বাড়ি সুন্দরবন-এর গোসাবার সাতজেলিয়া দ্বীপের চরঘেরিতে৷ মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরে হাইস্কুলে ভূগোল পড়ান তিনি৷ ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আয়লার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর তিনি পরিবেশ রক্ষায় সচেষ্ট হন৷ সেসময় নদীতে ভেসে আসা ম্যানগ্রোভের বীজ সংগ্রহ করেন৷ স্থানীয় ২২০ জন মানুষকে একত্র করে বীজ ও গাছ লাগানোর বিপুল কর্মকাণ্ড শুরু করেন৷ তারপর থেকে ম্যানগ্রোভ অরণ্য সৃজন ও রক্ষণে উমাশঙ্কর এক অতন্দ্র সৈনিক। গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর থাবা থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। নিয়েছেন কিছু অসহায় মানুষের পাশে থাকার দায়িত্ব। ছাত্র থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রামবাসী সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে তিনি অরণ্য অভিযান শুরু করেছেন। সারাবছর দরিদ্র মানুষদের দিয়ে ম্যানগ্রোভ সৃজন করেন। এর বিনিময়ে দরিদ্রদের সাধ্যমতো সাহায্য করেন তাঁর সংস্থা। পুজোয় পোশাক, ছোটোদের বইখাতা, কিংবা মহিলাদের স্যানিটারি ন্যাপকিন দেওয়ার কাজ সারাবছরই চলে। এসবই কিন্তু গাছ লাগানোর সুবাদে মেলে। আগামী বছর যুবদিবসেও চলবে তাঁর এমন নানা কর্মকাণ্ড।

মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতির পাশাপাশি বাস্তুতন্ত্রের হৃত পরিবেশের পুনরুদ্ধারের জন্য উমাশঙ্কর বরাবরই গুরুত্ব দিয়েছেন৷ একটা সময় রাজকাঁকড়া, চিংড়ি, ভেটকি, ঝিনুক, সাপ ইত্যাদি বিভিন্ন জলজ প্রাণীদের বাসস্থান মানুষের অত্যাচারে ধ্বংস হতে বসেছিল৷ ম্যানগ্রোভ সৃজনে প্রাণীকুলের বসবাসের পরিবেশ ফিরিয়ে দিয়ে আদতে জনজাতির অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করছেন উমাশঙ্কর৷ এ হেন ম্যানগ্রোভ রোপনকারী ভূগোল শিক্ষক এই পুরস্কার পেলেন কেন? প্রশ্নটা রেখেছিলাম ডব্লিউ ডব্লিউ এফ সুন্দরবন প্রোগ্রামের অধিকর্তা অনামিত্র অনুরাগ দণ্ড-র কাছে। তিনি বঙ্গদর্শনকে বলেন, “যে মা এবং বোনেরা উমাশঙ্কর বাবুর সঙ্গে বাদাবন তৈরির কাজে লেগে যান, তারা আর জীবিকার জন্য জঙ্গলে যাবেন না। ফলে বাঘের সঙ্গে মানুষের সংঘাতের সময়টা উনি কমিয়ে ফেলছেন। এই মানুষগুলোকে উনি ব্যস্ত রাখছেন অন্য কাজে। শ্রম সাধ্য এই কাজে নার্সারি করতেও অনেক সময় লাগে। এই সময় ফাঁকা পেলে ওরা জঙ্গলে যেতেন অথবা জলে নেমে যেতেন। সংঘাত যত কম ঘটবে বাঘ সংরক্ষণে তত সুবিধা হবে। তাছাড়া ম্যানগ্রোভ রোপনের উপকারিতা তো আছেই।”

প্রাকৃতির বিপর্যয় এবং লকডাউনে বাঘ এবং মানুষ উভয়েরই খাদ্যসংকট দেখা গিয়েছে। সুন্দরবনের অনেক মানুষ গভীর জঙ্গলে মধু, মোম, মীন সংগ্রহে গিয়েছেন। ফলে বাঘের কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন তারা। উমাশঙ্কর তাঁর সাধ্যমতো এদের সাহায্য করেন। এতে পরোক্ষভাবে বাঘকেও সুরক্ষা দেওয়া হয় বৈকি। অনুরাগ আরও জানান, “আমরা চাই, উনি চাকরির বাইরে যে ধরনের কাজ করেন, সেটা আরও কাউকে অনুপ্রাণিত করুক। আমরা পরিবেশ নিয়ে কাজ করি। তাই এ ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া আমাদের কর্তব্য।”

কী ভাবছেন উমাশঙ্কর? তিনি এখন পরম মমতায় তাঁদের লাগানো ম্যানগ্রোভগুলির উচ্চতা মাপেন। সুন্দরবনকে আগামী দিনে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে কংক্রিটের বা মাটির বাঁধ নয়, এই বাদাবনের সুরক্ষাই দরকার। হাসিমুখে শিক্ষক বলেন, “গাছগুলো অনেক বড়ো হয়ে গেছে। আগামী দিনে আরও গাছ লাগানোর কাজ আছে। আরও অনেক কাজ বাকি। করতে হবে।” চরৈবেতি মন্ত্র নিয়ে এগিয়ে চলেছেন পরিবেশ রক্ষায়। পাশে রয়েছে তাঁর বিশ্বস্ত বাদাবন।

Developed by DXDasia