‘বায়োডাইভার্সিটি হেরিটেজ সাইট’ তকমা পেল রাজ্যের একমাত্র জীবাশ্ম উদ্যান

বীরভূমের আমখই উড ফসিল পার্ক

বছর তিনেক আগে রাজ্যের প্রথম ফসিল পার্ক হিসেবে বীরভূমের পর্যটন মানচিত্রে নবতম সংযোজন। ইলামবাজারের অখ্যাত এই জঙ্গল হদিস দিয়েছিল ভূতাত্ত্বিক রত্ন ভাণ্ডারের, যা আসলে কাঠ-জীবাশ্ম। কোটি বছরের প্রাচীন প্রস্তরীভূত অরণ্য উদ্যান। প্রকৃতির এই পাঠশালায় মিলছে ইতিহাসের পাঠ।

সম্প্রতি বীরভূম জেলার ইলামবাজারের আমখই ফসিল পার্ক বা জীবাশ্ম উদ্যানটিকে ‘বায়োডাইভার্সিটি হেরিটেজ সাইট’  তকমায় ভূষিত করেছে রাজ্য সরকারের পরিবেশ বিভাগ। এই উদ্যানটিতে গেলে আপনি দেখতে পাবেন দেড় থেকে দুই কোটি বছরেরও বেশি পুরোনো কাঠের জীবাশ্ম। রাজ্য জীববৈচিত্র্য আইন ২০০৫ অনুযায়ী কমপক্ষে দেড় থেকে দু কোটি বছরের প্রাচীন উদ্ভিদ জীবাশ্ম সংরক্ষিত রয়েছে।

বীরভূমের বিভাগীয় বন আধিকারিকের দপ্তর মারফত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, “কাঠের জীবাশ্ম বলতে এমন ধরনের কাঠকে বোঝানো হয়, যা প্রাকৃতিক উপায়ে কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে সংরক্ষিত হয়ে আছে। জীবাশ্ম সাধারণত পাললিক শিলার উপরেই দেখতে পাওয়া যায়। জীবাস্মীভূত হওয়ার মূল শর্তই হল, বায়বীয় পরিস্থিতিতে অক্সিজেন কিংবা অন্য অর্গানিজম দ্বারা পচন শুরু হওয়ার আগেই দ্রুত পলির পরতে চাপা পড়ে যাওয়া।”

বীরভূম জেলার শান্তিনিকেতনের কাছেই রয়েছে মহিষদল নামের ছোট্ট একটি গ্রাম, যার একপ্রান্তের সীমারেখা ধরে এগিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া যায় রেলওয়ে ট্র্যাক। আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে যখন কোপাই নদীর উপর রেল ব্রিজ তৈরির কাজ চলছিল, তখন হঠাৎই খোঁড়াখুঁড়িতে বেড়িয়ে আসে কিছু প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ! স্থানীয় প্রশাসনের আবেদনে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ওই বিশেষ স্থানটিতে খননকার্য বন্ধ করে দেন। সেখান থেকে আর একটু এগোলেই পড়ে পারুলডাঙা, যেখানে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর স্বর্গীয় সুব্রত বসু সমগোত্রীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের একটি আকর আবিষ্কার করেন।

আবার, বীরভূমের অন্তর্গত রাজনগর, লাভপুর, ইলামবাজার প্রভৃতি অঞ্চলে ঘুরে স্বর্গীয় গবেষক অরুন চৌধুরী বিভিন্ন সময়কালের কাঠ-জীবাশ্ম (উড ফসিল) আবিষ্কার করেন। তাঁর আবিষ্কারের সংখ্যা এতই বেশি ছিল যে সেসব সামাল দিতে প্রায় হিমসিম খেয়ে যায় জেলা তথ্যদপ্তর! জিওলজিক্যাল সার্ভে ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র যে বিশেষজ্ঞরা সে সময়ের ফসিলগুলির পরীক্ষা করেছিলেন, তাঁরা জানান যে কালচে হলুদ রঙের ওই জীবাশ্মগুলির বয়স কয়েক কোটি বছরেরও বেশি! আর মজার বিষয় হল, বর্তমানেও বীরভূমের নানান এলাকায় খননকার্য চালিয়ে এমন অমূল্য জীবাশ্মগুলি হাতে এসে পড়ছে প্রত্নতাত্ত্বিকদের। 

জিওলজিক্যাল সার্ভে ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র যে বিশেষজ্ঞরা সে সময়ের ফসিলগুলির পরীক্ষা করেছিলেন, তাঁরা জানান যে কালচে হলুদ রঙের ওই জীবাশ্মগুলির বয়স কয়েক কোটি বছরেরও বেশি!

এই আবিষ্কার প্রসঙ্গে দুটি মত প্রচলিত রয়েছে এখনও অবধি। এক, আজ যে অঞ্চল বীরভূম নামে পরিচিত, তা এককালে বসতি ছিল। হয়তো ভূমিকম্প বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ধ্বংস হয়ে যায় সেটি। দুই, কোটি কোটি বছর আগের ছোটো বড়ো গাছগুলি সময়ের সঙ্গে মাটির তলায় চাপা পড়ে যায়। এবং ক্যালসিফাই হওয়ার দরুন পাথরে পরিণত হয় ও নিজে থেকেই সংরক্ষিত হয়ে যায়। 

কিছু বছর আগে ইলামবাজারের বনাঞ্চল এলাকায় পুকুর খনন করতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে আসে এমনই বিপুল সংখ্যক কাঠ-জীবাশ্ম। সেগুলিকে যথাসম্ভব অক্ষত অবস্থায় নিকটবর্তী আমখই গ্রামে নিয়ে আসা হয়। আর এভাবেই আমখইয়ের বুকে জন্ম নেয় ‘উড ফসিল পার্ক’, যা কেবল ইতিহাসবীদ ও গবেষকদের কাছেই নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও হয়ে উঠেছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। চোর ও অসামাজিক ব্যক্তিদের থেকে জীবাশ্মগুলি সযত্নে রক্ষা করে এই পার্ক। 

বনাঞ্চল থেকে বোলপুর যাওয়ার পথে, ডানদিকের একটি রাস্তা ধরে পৌঁছে যাওয়া যায় আমখই গ্রামের স্থানীয় মানুষই  পঞ্চায়েত ও জেলা আধিকারিকের সহায়তায় আমখই ফসিল পার্কের রক্ষণাবেক্ষণ করে। প্রত্যেক দর্শককে কিছুক্ষণের জন্য ইতিহাস ফিরে দেখার সুযোগ করে দেয় পার্কটি। যেসব পড়ুয়ারা এখানকার প্রকৃতি ও ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনো করতে চায়, তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।  

বর্তমানে দেড় থেকে দুই কোটি বছরের প্রাচীন জীবাশ্ম রাখা হয়েছে এই পার্কটিতে। পশ্চিমবঙ্গের বন দপ্তর আনুষ্ঠানিক ভাবে এটিকে ‘আমখই ফসিল পার্ক ইকো-ট্যুরিজম প্রোজেক্ট’-এর তকমায় ভূষিত করেছে। দশ হেক্টর জমি জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই পার্কটি বর্তমানে রাজ্যের একমাত্র ফসিল পার্ক। ভাবতে সত্যিই অবাক লাগে যে, এককালে অগুন্তি শুষ্ক পাতাঝরা গাছ ও অল্প কিছু চিরহরিৎ গাছে ভরা জঙ্গলের অবস্থান ছিল বীরভূমের উত্তর-পশ্চিম দিকে রাজমহল পাহাড় ও ছোটনাগপুর প্লেটুর বুকে। সম্ভবত, স্থানীয় নদী দ্বারা বাহিত হয়ে গাছগুলি দক্ষিণ-পশ্চিম বীরভূম, বর্ধমান, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর জেলার দিকে চলে যায়; পরবর্তীকালে যেখানে বালি ও কাদার তলায় চাপা পড়তে পড়তে কাঠ-জীবাশ্মে পরিণত হয়। 

তবে এলাকাবাসীরা এই ইতিহাস সংগ্রহে উৎসাহী থাকলেও ইতিহাসবীদ ও গবেষকদের সাহায্য ছাড়া তা কখনোই সম্ভব হবে না। সঠিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে এই প্রজন্মের হাত ধরে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যেতে পারবে এতবছর ধরে প্রকৃতির বুকে সংরক্ষিত এই প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ। যাঁরা প্রায়ই শান্তিনিকেতন যান, বোলপুর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উড ফসিল পার্কটিতে ঢুঁ মেরে আসতেই পারেন। 

Developed by DXDasia