কী ছিল সুচিত্রা সেনের ব্যক্তিত্বে, যা আকৃষ্ট করত দর্শকমন?

‘শেষ কোথায়’ ছবিতে তাঁর অভিনয় জীবনের শুরু, সত্যিই শেষ নেই

৮৯৫ সালে সিনেমার যাত্রা শুরু। এরপর থেকে নির্বাক ও সবাক চলচ্চিত্রে অসংখ্য অভিনেতা অভিনেত্রী এসেছেন, যাঁরা সমাদৃত হয়েছেন। অনেক নায়ক নায়িকা হয়েছেন, যাঁরা তাঁদের অনুরাগীদের মনের মন্দিরে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁদেরই অন্যতম সুচিত্রা সেন। এককথায় রহস্যময়ী এক অস্তিত্ব। লাবণ্যে, মাধুর্যে, লালিত্যে পরিপূর্ণ এক অভিনব ব্যক্তিত্ব। এই অভিনবত্বই তাঁকে দর্শকমনে এক বিশেষ জায়গা তৈরি করে দিয়েছে।

১৯৫২ সালে শেষ কোথায় ছবিতে অভিনয় দিয়ে শুরু হয় সুচিত্রা সেনের চলচ্চিত্র জীবন। সত্যিই আমরা জানি না যে এই অভিনেত্রীর অভিনয় জীবনের শেষ কোথায়! যদিও প্রণয় পাশা তাঁর জীবনের শেষ অভিনীত ছবি, তবুও তাঁর অভিনয় জীবনের নানা দিক আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে অসংখ্য দর্শকের মনে।

১৯৭৮-এ তাঁর শেষ ছবি প্রণয় পাশা। তারপরই অভিনেত্রী চলে গেছেন দর্শকদের আড়ালে, ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ১৯৭৮ থেকে ২০১৪, অর্থাৎ যে সালে উনি আমাদের ছেড়ে চলে যান, প্রায় ৩৫ বছর তাঁকে কোনো স্টুডিও ফ্লোরে, কোনো মহরতে, কোনো প্রিমিয়ারে, কোনো শুটিংয়ে, কোনো মঞ্চে কেউ কোথাও দেখতে পাননি।

পরিচালক অজয় কর এক দৃশ্যে শেক্সপিয়ারের ‘ওথেলো’ নাটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ চলচ্চিত্রায়ন করেন, যেখানে উত্তমকুমারের ওথেলোর ভূমিকায় কণ্ঠ দান করেন উৎপল দত্ত এবং সুচিত্রা সেন অভিনীত ডেসডিমনার ভূমিকায় কণ্ঠ দান করেন জেনিফার কাপুর।

এই দীর্ঘ ৩৫ বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন তাঁকে আরও রহস্যময়ী করে তুলেছিল। এমনকি মৃত্যুর পরও অগণিত গুণমুগ্ধ শেষ যাত্রায় তাঁর মুখ দেখতে পায়নি। অথচ এই মুখ অগণিত দর্শককে কত আন্দোলিত করেছে, সম্ভ্রম আদায় করেছে।

কী ছিল সুচিত্রা সেনের ব্যক্তিত্বে, যা আকৃষ্ট করত দর্শকমন? সুচিত্রা সেন যে আজও উদযাপিত তার প্রধান কারণ পর্দায় তাঁর উপস্থিতি। সে সাধারণ পরিবারের কোনো মেয়ে হোক বা ধনী পরিবারের আদুরে কন্যা, পর্দা জুড়ে ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের বিচরণ।

সুচিত্রা সেন যে আজও উদযাপিত তার প্রধান কারণ পর্দায় তাঁর উপস্থিতি। সে সাধারণ পরিবারের কোনো মেয়ে হোক বা ধনী পরিবারের আদুরে কন্যা, পর্দা জুড়ে ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের বিচরণ।

যে চরিত্রটি আমার কাছে সুচিত্রা সেনের অন্যতম সেরা অভিনয় বলে মনে হয় তা হল সপ্তপদী সিনেমায় রিনা ব্রাউন-এর ভূমিকায়। বাঙালি হয়ে অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন সুচিত্রা সেন। ভূমিকা পালনে তাঁর শারীরিক ভাষার অভিব্যক্তি দৃষ্টান্ত স্বরূপ। এবং পরিচালক অজয় কর এক দৃশ্যে শেক্সপিয়ারের ‘ওথেলো’ নাটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ চলচ্চিত্রায়ন করেন, যেখানে উত্তমকুমারের ওথেলোর ভূমিকায় কণ্ঠ দান করেন উৎপল দত্ত এবং সুচিত্রা সেন অভিনীত ডেসডিমনার ভূমিকায় কণ্ঠ দান করেন জেনিফার কাপুর।

যাঁরা এই দৃশ্যটি দেখেছেন তাঁদের আজও রোমাঞ্চ হয় ভাবলে। কী নিখুঁতভাবে জেনিফারের কণ্ঠকে নিজের কণ্ঠ করে নিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন তাঁর অভিব্যক্তির অনুপম প্রদর্শনে।

যে প্রসঙ্গটি আলোচনা না হলে সুচিত্রা সেন সম্পর্কে এই প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, তা হল বহু আলোচিত, বহু সমাদৃত, অতুলনীয় উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেনের রোম্যান্টিক জুটি। এ রসায়ন পৃথিবীর চলচ্চিত্র ইতিহাসে আর হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

সে সময় যেকোনো যুগলকে তুলনা করে বলা হতো, “বাবা! একেবারে সুচিত্রা-উত্তম”। আলাদা করে সৌন্দর্য্য প্রসঙ্গে যেকোনো তরুণীকে বলা হতো, “কী ভাবিস নিজেকে? সুচিত্রা সেন?” তরুণকে বলা হতো, “নিজেকে কি উত্তমকুমার ভাবছিস?” — এই ছিল উত্তম-সুচিত্রা রসায়নের তাৎপর্য। কত ছবির নাম করব? সাগরিকা, ইন্দ্রানী, চাওয়া পাওয়া, পথে হল দেরি এবং সর্বোপরি সপ্তপদী প্রত্যেকটি ছবি আজও দর্শকদের কাছে সমান সমাদৃত। আরেকটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ব্যাপার ছিল গানে সুচিত্রা সেনের অভিনয়। ক্যামেরা ঠায় ধরে থাকতো তাঁর অপরূপ মুখে গানের চিত্রায়নের সময়। “এ শুধু গানের দিন”, “কিছুক্ষণ আরও না হয় রহিতে কাছে”, অথবা “তুমি যে আমার” — এরকম অনেক গান তাঁর মুখে শুনে মনে হত প্রেমের শেষ কথা সুচিত্রা সেন।

সবশেষে যেটা বলা প্রয়োজন সেটা হল, ‘শেষ কোথায়’ এই অভিনেত্রীর? এই ‘শেষ কোথায়’ ছবিতেই তাঁর অভিনয় জীবনের শুরু। সত্যিই শেষ নেই। তিনি কোনোদিনই শেষ হয়ে যাবেন না চলচ্চিত্র অনুরাগীদের কাছে। তাদের মনের সুচিত্রা সেন চির এনিগমা হয়ে বেঁচে থাকবেন।
 

Developed by DXDasia