
রাজ্য বনবিভাগের বড়ো সাফল্য
পশ্চিমবঙ্গের সবথেকে কম জনঘনত্বযুক্ত পুরুলিয়া জেলা তার অবস্থানের জন্য ভারতের পর্যটন মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অর্জন করে নিয়েছে। কুড়মি, সাঁওতাল, ওঁরাং, ভূমিজ, বাউড়ি প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মানুষেরা এখানকার আদি বাসিন্দা। আদিবাসীদের সংখ্যাই এখানে সবথেকে বেশি, যা জনসংখ্যার হিসেবে প্রায় ৪ লক্ষ ৭২ হাজার। আর এই আদিবাসীদেরকেই স্বনির্ভর করে তুলবার লক্ষ্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছে রাজ্য বনবিভাগ।
আর্থিক স্বাবলম্বনের অভাবে বাধ্য হয়ে এতদিন অবধি জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করত হত এখানকার মানুষদের; ফলে উত্তরোত্তর বাড়ত বন্যপ্রাণীর হাতে মৃত্যুর ঘটনা। বনবিভাগের লক্ষ্য একদিকে যেমন পুরুলিয়ার বনজ সম্পদ বৃদ্ধি করা, তেমনই অন্যদিকে সেই সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলা এখানকার সাধারণ বাসিন্দাদের। সময়ের সঙ্গে ধরা দিয়েছে সাফল্যও। বনবিভাগের উদ্যোগে প্রায় বৃক্ষশূন্য রুক্ষ ময়ূর পাহাড়, আজ যেন আপাদমস্তক মুড়ে গিয়েছে সবুজ চাদরে।

বনদপ্তরের পক্ষ থেকে জানা যায়, “পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রণীত সবুজশ্রী প্রকল্পটি আমূল বদল এনেছে সাফল্যের মানচিত্রে। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে (নিজস্ব উদ্যোগে) যে ১,৫০,৩৩১টি চারাগাছ তৈরি করা হয়েছিল, তার মধ্যে ১,৮৯,৩৬২টি ইতিমধ্যেই বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে যে সকল ব্লকের সাফল্য চোখে পড়বার মতো, সেগুলি হল আরশা (৮১১), বাঘমুন্ডি (১০৩২), বলরামপুর (১৬৪২), বান্দোয়ান (৮১৪), ঝালদা-১ (১৩৬১), ঝালদা-২ (২৬০০), মানবাজার (১১৬৩), মানবাজার-২ (৭৯৩), পারা (১০০০), পুরুলিয়া-১ (৭৯০), পুরুলিয়া-২ (৮০০),রঘুনাথপুর-১ (৪২৫২), রঘুনাথপুর-২ (৩৭৭) প্রভৃতি।”
২০২১ সালে পুরুলিয়া জেলার ১২২০ হেক্টর জমিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল বৃক্ষরোপণের উদ্দেশ্যে, বসানো হয়েছিল ১৯ লক্ষেরও বেশি সংখ্যক গাছ। ২০২২ সালে আবার, ৭১৩ হেক্টর জমিকে গড়ে তোলা হয়েছিল ১২ লক্ষ চারাগাছের জন্মভূমি হিসেবে। ফলস্বরূপ, পুরুলিয়ার অন্তর্গত সিমুলিয়া, কাঁসাই নদী, মিশিরডি, কুলটার, লছমনপুর, সিরকাবাদ, কলাবনী, ছাতানি, মাঝিডি, গড়ধাম, মাঠা সহ বিস্তীর্ন এলাকাগুলি হয়ে উঠেছে সবুজের আবাস। বনদপ্তরের বিশ্বাস, যে চারাগাছগুলি বর্তমানে তাঁদের নার্সারিতে প্রতিপালিত হচ্ছে, তা চলতি বছরের বর্ষাকাল নাগাদই পুরুলিয়ার মাটিতে রোপণযোগ্য হয়ে উঠবে। উর্বর হয়ে উঠবে পতিত জমিগুলিও।
বর্তমান সময়ে গৃহীত প্রকল্পগুলির মধ্যে আদিবাসী গ্রামীণ অর্থনীতিকে সবথেকে বেশি প্রভাবিত করেছে পুরুলিয়া বনবিভাগের দক্ষিণ থেকে পশ্চিম চক্র জুড়ে চলা শিয়ালী পাতানির্ভর পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ার কাজ। স্বাবলম্বনের লক্ষ্যে পুরুলিয়ার মহিলাদের একধাপ এগিয়ে দিয়েছে এই প্রক্রিয়া। অপেক্ষাকৃত সহজে রোজগারের এই উপায়ের নাম তাঁরা দিয়েছেন ‘শিয়ালী পাতার বিপ্লব’। জঙ্গল থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাতা সংগ্রহ করে ফেরে আদিবাসী মহিলারা। তারপর চলে পাতা বাছাই, বাঁধাই ও শুকোনো করে তাকে থালায় রূপান্তরের পর্ব।

এছাড়াও, পুরুলিয়ার তেলিয়াভাসা, হেসাদি, কুসুমটিক্রি, চিরুবোরার প্রায় ৩০ বিঘা জমি জুড়ে শুরু করা হয়েছে ভেষজ ও সুগন্ধি গাছের চাষ। বনদপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, “চাষাবাদের এই এলাকাটিকে যাতে ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত করা যায়, সে বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন আধিকারিকেরা। অন্যদিকে, মাশরুম চাষ সংক্রান্ত উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে কেবলমাত্র দেশের ভিতরে নয়, বিদেশের বাজারেও পৌঁছে দেওয়া যায় এটি। আশা করা যায়, মাশরুম চাষ থেকে প্রত্যেক শ্রমিক মাস প্রতি কমপক্ষে ৮ হাজার টাকা উপার্জনে সক্ষম হয়ে উঠবে।”
বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক উৎসাহের সঙ্গে জানান যে, পুরুলিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী। আগামী কিছু বছরের মধ্যেই আরও আশাব্যঞ্জক অবস্থানে পৌঁছবে এখানকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের আর্থিক সঙ্গতি। আর সেই লক্ষ্যেই দ্রুত এগিয়ে চলেছে পুরুলিয়া জেলা।
