‘আম্মাকে না বলে মাদ্রাসা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যেতাম ছোটোবেলায়’

গতবার ঝাড়বাতির আলোয় পুরো কলকাতা যেন হাসছিল

সিটি অফ জয়ই কেবল নয়, শুনতাম সিটি অফ ফেস্টিভ্যাল বলেও ডাকা হয় শহর কলকাতাকে। কিন্তু এর আগে কখনও স্বচক্ষে উৎসবের সময় কলকাতাকে দেখার সুযোগ হয়নি। তার প্রথম সুযোগ হল ২০১৯ সালের পুজোয়। আইন পড়তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুবাদে এই শহরের নানান বৈচিত্র্য চোখে পড়ত চলতে ফিরতে। এর আগে দুইবছর ছিলাম শহর ঢাকায়, তার সঙ্গে বিভিন্ন তুলনামূলক ভালোমন্দ চোখে ও চেখে দুইভাবেই দেখছিলাম। আমাদের প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হবার কিছুদিনের মধ্যেই পুজোর ছুটি পড়ে গেল। সরকারি কাজের জন্য আমি রয়ে গেলাম শহরে। ফলত সৌভাগ্য হল এই মহোৎসবের ভাগ নেবার।
    
বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড়ো উৎসব বলা হয় দুর্গাপুজোকে। পূর্ব কিংবা পশ্চিম বাংলার সর্বত্রই এই সর্বজনীন দুর্গাপুজো বিশাল আয়োজনের সঙ্গে উদযাপিত হয়। আমি পূর্ব বাংলার মানুষ। সেখানকার পুজোর ধরন দেখেছি। কলকাতাতেও দেখেছি৷ তাই দুই দেশের ভিন্নতাটাও দারুণভাবে উপলদ্ধি করেছি। 

শোভাবাজার রাজবাড়ি

আমাদের গ্রাম দক্ষিণ শ্যামপুরে সেইভাবে দুর্গাপূজা দেখিনি, তবে পাশের গ্রাম গোবিন্দপুরে বেশ ধুমধাম করেই হয়। সাদেকপুর মাদ্রাসার ছাত্র ছিলাম। আম্মাকে না বলে কয়েকজন সমসবয়সী বন্ধুদের  সঙ্গে ‘দেবী’ দেখতে যেতাম আমরা ছোটোবেলায়। মণ্ডপে গিয়ে চেয়ে থাকতাম হাতিমুখের গণেশের দিকে বা দেবীর দশহাতের দিকে। তবে বাংলাদেশের সব গ্রামের পূজাতেই যেমন হয়, মণ্ডপের সামনে নাচগানের জায়গা থাকে। পুরুষ-মহিলাদের আলাদা বসার জায়গা করা থাকে দড়ি দিয়ে। মধ্যিখানে নাচ হয়। বলিউড-টলিউডের গানের সঙ্গে অল্পবয়সের ছেলেমেয়েরা নাচ করে। পাশে আমরা ছোটোরা, বা বোরখা পরা মহিলারা সেই আনন্দের ভাগ নেন। এসবের সঙ্গে খাবারের বিভিন্ন দোকান আর মেলা তো বসতোই। আম্মাকে না বলে, খুব সামান্য কিছু টাকা নিয়ে সেই মেলাতে গিয়ে চটপটি, ঝালমুড়ি খেয়ে জাঙ্গাল ধরে চুপচাপ নিজেদের গ্রামের দিকে চলে আসতাম দল বেঁধে। আমাদের গোমতীতে ‘দেবী’ ‘ডুবানো’ হত দশমীতে। কখনও গোবিন্দপুরের ব্রিজ থেকে দাঁড়িয়ে দেখেওছি নৌকা করে সেই ভাসান। বিসর্জনের সময় বাইচ খেলা হতেও দেখেছি গোমতীতে। 

এরপর বড়ো হয়ে ঢাকা শহরে চলে আসি দেশের সেরা মাদ্রাসায় পড়তে। সেই দু’বছর ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে ঢাকেশ্বরী মন্দির হলেও, কখনও পূজা দেখা হয়নি। আসলে আমি সব ক্ষেত্রেই ভিড় এড়িয়ে চলি। ইদের জামাতেও কোনোরকম নামাজ সেরে ছুট্টে ঘরে চলে আসি। তাই সেইভাবে ঢাকা শহরে দুর্গাপূজার উৎসব দেখা হয়নি। হল গতবছর কলকাতাতে এসে।

গতবছর শীত শীত ভাব তখন। বাংলা ক্যালেন্ডারে আশ্বিন মাস চলছে। শিয়ালদা স্টেশনে নেমে কলেজ যাওয়ার রাস্তাটা ধরে যাবার সময়ই একদিন টের পেলাম আশেপাশে ঝাড়বাতি টাঙানো হচ্ছে। রেল স্টেশনের পাশে ফুলের মালিদের প্রচণ্ড ভিড়। প্যান্ডেলের জন্য বাঁশ বসানো হচ্ছে নির্দিষ্ট সব স্থানে। পুজোর শুরুতেই যেন সবটুকু আমেজের জোয়ার। রাতে বেরিয়েই টের পেলাম শহর বদলে গেছে। ঝাড়বাতির আলোয় পুরো কলকাতা যেন হাসছে। ঢাকাতেও আমাকে পড়াশোনার জন্য থাকতে হয়েছে। কিন্তু কখনও কোন উৎসবকে ঘিরে একটা শহরকে আপাদমস্তক এভাবে সজ্জিত হতে দেখিনি। বড়োজোর কিছু নির্দিষ্ট এলাকা জুড়ে এমন সুসজ্জিত আলোর ব্যবস্থা হতে পারে। তবে দক্ষিণ থেকে উত্তর কোলকাতা পর্যন্ত এভাবে ঢালাওভাবে পুরো শহর জুড়ে রাতকে অনন্য করে দেওয়ার নজির আমি দেখিনি। 

গাড়িতে করে সোদপুর থেকে সোজা চলে যাই শ্যামবাজার। এক বন্ধু বলল, প্রথমেই দেখতে হবে বাগবাজার। এ দেখেই নাকি কলকাতার পুজো পরিক্রমা শুরু। দড়ি দেওয়া লাইন ধরে এগোতে থাকি পূজামণ্ডপের দিকে। বিরাট এরিয়া নিয়ে প্যান্ডেল। আর সেই প্যান্ডেলের ডিজাইন স্বয়ং তাজমহলের আদলে। শুনতে পাই প্রতিবছরই এরকম নতুন নতুন আর্কিটেকচারের নমুনা নিয়ে একেকবছর নতুন নতুন ডিজাইনের প্যান্ডেল করা হয়। বিশাল বড়ো মুকুট পরানো হয়েছে দুর্গার মাথায়। সেই মুকুট প্যান্ডেলের ছাদ ছুঁচ্ছে। টানা নেত্রের তীক্ষ্ণ চাহনি। ঘোর লেগে যায়। এরপর এগোই কুমোরটুলি পার্কের পুজো দেখতে। এ যেন পুজো নয়, চাঁদের হাট। সারি বেঁধে ঠাকুর দেখার জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়। একে একে লোকজন যাওয়ার পর আমাদের পালা আসে। আমি মণ্ডপের ভেতরের ঠাকুরদের মুখ দেখতে থাকি বিস্ময়ের সঙ্গে। প্যান্ডেলের বাইরে হরেকরকম দোকানপাট। খাবারের, সামগ্রীর, চরকি-সহ নানান কিছু। গ্রামের পুজোয় এত আয়োজন দেখিনি কখনও। এত কড়া সিকিউরিটির ব্যবস্থাও ছিল না। কোলকাতার মতো এমন জনবহুল শহরে সিকিউরিটির ব্যবস্থা করা উচিতই বটে। 

ভিন্নতা আরেকটাও চোখে পড়ে, সেটা ঠাকুরের মুখের আদলে। চোখদুটো আঁকা হয়েছে বাঁশপাতা স্টাইলে। বাংলাদেশের গ্রামের দুর্গাপুজোয় কখনো এইরকম চোখ দেখিনি।

এরপর আহিরীটোলা, শোভাবাজার রাজবাড়ি-সহ নানান জায়গার ঠাকুর দেখা হয়েছিল। শোভাবাজারের এক জায়গায় কাশীর আদলে পূজা মণ্ডপ। মণ্ডপের বাইরে ছোটো একটা পুকুরের মতো করা হয়েছে৷ জলের ধার ঘেঁষে এখানেও একে একে নিয়ম মেনে প্যান্ডেলের ভেতর ঢুকতে হয়। ঠিক যেন গঙ্গার ধার দিয়ে কাশীর মন্দিরে প্রবেশ করছি।  শোভাবাজার রাজবাড়ির ফটকে কামান আর ভিতরে ঝাড়বাতি অবাক হয়ে দেখি খানিকক্ষণ। তবে বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল না কোথাওই।

স্পেসশিপে দুর্গাপুজো

ঢাকার জীবনে হাঁটতে অনভ্যস্ত আমি এই ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে যে কত কিলোমিটার হেঁটে ফেলি, মনেও থাকে না। পরের দিন দক্ষিণ কলকাতা। বালিগঞ্জ কালচারাল দিয়ে শুরু। তারপর নামকরা সবপুজোগুলিই বন্ধু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখায়। রাস্তার দুধার থেকে খাবার কিনে হাঁটতে হাঁটতে যে এইভাবে খেতে খেতে এগিয়ে চলা যায়, তা আমি কলকাতায় না আসলে জানতেও পারতাম না।

নবমীর দিন আমরা যাই বেলুড় মঠে। তখন সন্ধ্যারতি শেষ। বেশ ফাঁকা ফাঁকা। একেবারে সামনে গিয়ে দেখলাম। ঢাকা রামকৃষ্ণ মিশনে ফলহারিণী কালীপূজা আর রাঁচি স্যানাটোরিয়ামে শিবরাত্রির পূজাও দেখেছি। একটা ধারণা ছিলই। লাইন দিয়ে হাত পেতে সকলে খিচুড়ি খেয়েছি। তার স্বাদই অন্যরকম।

এরকমভাবেই উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতার বিখ্যাত ঠাকুরগুলো দেখে গতবারের দুর্গাপুজোর সময়টা অপ্রত্যাশিতরকম ভালো কাটে। উৎসবের শহর কলকাতা, তা মুখে মুখে শুনলেও চোখে দেখার অভিজ্ঞতাটাও সেইবারই প্রথম হয়। গ্রামগঞ্জে ছোটোবেলায় মা-বাবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে ঠাকুর দেখার যে আনন্দ ছিল, বড়োবেলায় এসে ঝাড়বাতি টাঙানো কোলকাতার রাস্তায় হেঁটে হেঁটে ঠাকুর দেখার আনন্দের সঙ্গে কোনো অংশেই কম আনন্দের না। এবছর ফেসবুকে চোখ রাখছি বিভিন্ন শিল্পসুষমায় মণ্ডিত প্রতিমায়, প্যান্ডেলে। কোথাও পরিযায়ী শ্রমিকের আদলে প্রতিমা, কোথাও কেদারনাথ মন্দিরের মতোন প্যান্ডেল, কোথাও বা সোনার মাস্ক পরানো হয়েছে দেবীর মুখে। অতিমারীজনিত সরকারি বিধিনিষেধের কারণে এইবার ঘরে বসেই দেখতে হবে বাংলার পুজো। তাই হোক। ঈদও এবার সেভাবেই কাটিয়েছি, দুর্গাপুজোও তাই হোক। তবে দ্রুত এই অতিমারী শেষ হোক। সব মঙ্গল হোক। শুভ হোক সব।

ছবি লেখকের তোলা। প্রত্যেকটি ছবি ২০১৯ সালের দুর্গাপুজোয়। 

Developed by DXDasia