
কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অভিনেত্রী ললিতা চ্যাটার্জির শেষ ছবি দেখানো হল
একজন আশি বছরের বৃদ্ধা। স্বপ্ন দেখেন অতীতের। যেখানে ভীষণ গোপনে বাস করে তাঁর মেয়েবেলা, স্কুল-ফ্রক, অষ্টাদশী প্রেম, যৌনতা, বিয়ে সবকিছু। খুব শীতে কমলালেবুর আদর পেতে চেয়েছিলেন একসময়। পেয়েওছিলেন। কিন্তু তারপর যেন কোথা থেকে কীসব হয়ে গেল! প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ঘিরে থাকল আশি বছরের জীবনে। আশি বছরের তরুণী জোনাকি। হ্যাঁ তরুণীই। কারণ তিনি জানেন না বয়সের হিসাব। ঘুম পেলে মায়াবী নগর তাঁর হাত ধরে, আদর করে। বারবার এই মেয়েটি জন্মাতে ভালোবাসে। প্রচণ্ড ভিড়ে হারিয়ে যান দৃশ্যে। আর এভাবেই বারবার কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়। এই বৃদ্ধার চরিত্রেই অভিনয় করেছেন ললিতা চট্টোপাধ্যায়। প্রসঙ্গত এটিই তাঁর শেষ ছবি।

ছবির পরিচালক আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত বর্ণনা দিচ্ছেন কীভাবে জোনাকি এবং কেন জোনাকি। তাঁর কথায়, জোনাকির মধ্যে একটা জাদু রয়েছে। আদিত্যর দিদিমা তাঁকে বলতেন, জাপানি লোককথা অনুযায়ী মৃত মানুষের আত্মা জোনাকিতে পরিণত হয় এবং তারপর জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। দিদিমার জীবন থেকেই এই সিনেমাটি অনুপ্রাণিত। দিদিমা এমন একটা পরিবেশে বড় হয়েছেন যেখানে অভিজাত ইংরেজিভাষী মানুষেরা থাকতেন এবং প্রত্যেকের জীবনযাপনও ছিল আরবান ক্লাসিক। মাত্র ছয় বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান এবং দিদিমার মা খুব স্বেচ্ছাচারী ছিলেন। একজন খ্রিস্টান ছেলেকে ভালোবাসা সত্ত্বেও, মাত্র ষোলো বছর বয়সে জোর করে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়। শেষ আটাশ বছর তিনি তাঁর বিবাহিত জীবন থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। দিদিমা ছিলেন একজন রোমান্টিক মানুষ, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন বা দর্শন কখনও কারোর সঙ্গে শেয়ার করতে পারতেন না। তাঁর যে বয়স বাড়ছে সেটাও তিনি মেনে নিতে পারতেন না। আশেপাশের মানুষ তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে পারে, এই ভয়ে থাকতেন সবসময়। মৃত্যুর আগে তিনি চারদিন কোমায় ছিলেন এবং চোখ হালকা খোলা ছিল। বিড়বিড় করতেন সবসময়। জোনাকি হল সেই গল্প, যেখানে দিদিমা মারা যাবার পর যে দুঃস্বপ্নগুলো আদিত্য দেখতেন এবং দিদিমা বিড়বিড় করে যা বলতেন, সে সম্পর্কে আদিত্যর যে কল্পনা– তার একটা মিশ্রন। জোনাকি একটি যন্ত্রণা এবং অস্বীকৃত ভালোবাসার গল্প।
ছবির মূল ঘটনাক্রম এইভাবেই এগোয়। এখানে কোনোরকম পরিবর্তন আনেননি পরিচালক। আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তের দ্বিতীয় ছবি এটি। প্রথম ছবি ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ বিশ্ব চলচ্চিত্রে পাকাপাকি জায়গা দখল করে নিয়েছিল সেইসময়। ‘জোনাকি’ আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তের নিজেকে আরেকবার যাচাই করার ছবি। যেখানে লার্জ স্কেলে একটা প্লটকে নিয়ে যাওয়া হল, ম্যাজিক রিয়ালিজমকে গুরুত্ব দেওয়া হল আর জীবনকে দেখানো হল একটা ধূসর রঙের আবহাওয়ায়। ছবির সিনেমাটোগ্রাফি, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, এডিটিং, কালার কারেকশন, সাউন্ড মিক্সিং সবকিছুই প্রাণবন্ত এবং জীবনের খুব কাছাকাছি। জীবন তাঁকে যেভাবে পথ দেখিয়েছে, এই ছবি সেভাবেই হেঁটেছে। বাংলার দর্শককে এ কী দেখালেন আদিত্য! কোনো ভারতীয় ছবির স্কেল যে এত লার্জার হতে পারে, জোনাকি না দেখলে তা বোঝা মুশকিল হয়ে যেত। যারা আজ বলেন বাংলা সিনেমার কিচ্ছু হবে না- তাদের যোগ্য জবাব দিতে এবার চলে এসেছেন আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তর মতো পরিচালক। যিনি ভাবতে শেখান, ভাবাতে শেখান।

কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের স্পেশাল স্ক্রিনিং বিভাগে নন্দন ১-এ ছবিটি দেখানো হল। দর্শকদের ভিড়ও রীতিমতো দেখার মতো ছিল এইদিন। অনেকদিন পর আবার অভিনয়ে দেখা গেল ললিতা চট্টোপাধ্যায়কে। ছবিতে অন্যান্য চরিত্রে রয়েছেন জিম সরাভ, বুর্জর পটেল, রত্নাবলী ভট্টাচার্য প্রমুখ। বেশ কয়েকজন নন-অ্যাক্টরকেও ছবিতে নিয়েছেন পরিচালক। ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ একাধিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হওয়ার পর দর্শকের ভালবাসাও পেয়েছিল। জোনাকির গল্প, চিত্রনাট্য, সিনেম্যাটোগ্রাফি, এডিটিং— সবই আদিত্যর। আসলে এই ধরনের ছবি নিয়ে বেশি কথা লেখা যায় না। শুভমুক্তির পর সিনেমাহলে গিয়ে এই ছবিটি বারবার দেখবেন দর্শকরা। দেখতে বাধ্য হবেন। তাই এই লেখার বাকিটা সেই সমস্ত দর্শকদের জন্য তোলা রইল। তখন না হয় সবাই মিলে লেখা যাবে।
জোনাকি | সম্পাদনা, চিত্রগ্রহণ, সংলাপ, পরিচালনা- আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত | প্রোডাকশন ডিজাইনার- জোনাকি ভট্টাচার্য | মিউজিক- আলেকজান্ডার জেকে | প্রিমিয়ার- রটারডাম চলচ্চিত্র উৎসব ২০১৮।
