
মহানগরের ঔপনিবেশিক ইতিহাস
আজকের সফর খানিকটা দীর্ঘ হবে। আপনি চাইলে দু’ভাগে ভাগ করে নিতে পারেন। এসপ্ল্যানেড রো ইস্ট থেকে হাঁটা শুরু করব আমরা। এখন রাস্তাটি সিধু কানহু ডহর নামে পরিচিত। তারপর যাব চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ। পুরোনো কলকাতার অভিজাত এলাকা। একের পর এক প্রখ্যাত বাঙালি পরিবার এখানে বসতবাড়ি গড়ে তুলেছে। বেশিরভাগ প্রাসাদ আজও দেখতে পাবেন। এসপ্ল্যানেড রো জুড়ে ব্রিটিশরা তৈরি করেন রাজকীয় সব অফিস ভবন। যার মধ্যে কয়েকটি ভারত সরকার অধিগ্রহণ করে নেয় স্বাধীনতার পর।
অফিসগুলোর পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে ডেকার্স লেন। ১৭৭৩ থেকে ৭৪ পর্যন্ত কলকাতার কালেক্টর এবং ১৭৭৭ থেকে ৮৪ পর্যন্ত বোর্ড অফ ট্রেডের সভাপতি ছিলেন ফিলিপ ডেকার্স। তাঁর নামেই রাস্তা। তবে অনেকেই জানেন না, রাস্তাটির নাম পালটে এখন জন অগাস্টাস হিকির নামে রাখা হয়েছে। ১৭৮০ সালে যিনি ‘হিকি’স গেজেট’ প্রকাশ শুরু করেন। সম্ভবত ভারতের প্রথম মুদ্রিত খবরের কাগজ এটি।
টিপু সুলতান মসজিদ
এসপ্ল্যানেডে জংশনে দাঁড়িয়ে পুরোনো এক স্থাপত্য। গড়ে তোলেন মহীশূরের শাসক টিপু সুলতানের ছোটো ছেলে প্রিন্স গুলাম মুহম্মদ শাহ। তাঁদের পরিবার কলকাতায় চলে আসে ১৮০৬ সালের পর। মসজিদ নির্মাণ সম্পূর্ণ হয় ১৮৪২ সালে। মাঝারি আকারের ধর্মীয় স্থান। চারদিকে ঘিরে আছে খাবারের স্টল এবং স্টেশনারি দোকান। ভালো করে দেখলে চোখে পড়বে মসজিদের উঠোনে একটি মার্বেল ফলক। লেখা আছে, ১৮৭৫ সালে প্রিন্স অফ ওয়েলসের কলকাতা আগমন উপলক্ষ্যে এই মঞ্চ তৈরি করেন ঢাকার নবাব আসানুল্লাহ খান।
মসজিদের ঠিক উল্টোদিকে লেনিন সরণিতে রয়েছে চার্চ অফ দ্য সেক্রেড হার্ট। ঠিক কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, জানা যায় না। তবে প্রবেশদ্বারের কাছে থাকা দুটি স্মৃতিফলক দেখে অনুমান করা হয়, ১৮৫০-এর দশকে গড়ে উঠেছিল। ভিতরের দৃশ্য খুবই সুন্দর। মুগ্ধ করবে রঙিন কাচের জানলা এবং থামের কারুকার্য।
চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ
এসপ্ল্যানেড ক্রসিং থেকে ডানদিকে ঘুরলেই চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ। প্রথমেই চোখে পড়বে স্টেটসম্যান হাউজ – কলকাতার সবচেয়ে পুরোনো সংবাদপত্রের অফিস। যদিও এখন সেই গরিমা আর নেই। তা সত্ত্বেও বলা যেতে পারে, তিলোত্তমার সঙ্গেই বেড়ে উঠেছে স্টেটসম্যানের ইতিহাস। বাড়িটির মেরামত হয়নি অনেকদিন। বিশাল ব্যালকনি, বড়ো বড়ো থাম এবং মোহময় খিলান দেখে পুরোনো দিনের মর্যাদা অনুমান করা যায়। কলকাতার ভূতুড়ে বাড়িগুলোর মধ্যেও এটি অন্যতম। গা ছমছমে অভিজ্ঞতার কাহিনি শুনিয়ে দিতে পারেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক।
উল্টোদিকে রয়েছে ভিক্টোরিয়া হাউজ। বর্তমানে সিইএসসি হাউজ, ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনের দপ্তর। সিইএসসি-র প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ইংল্যান্ডে ১৮৯৬ সালে। কলকাতা ছাড়া আশেপাশের অঞ্চলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ করে এখন। দানবীয় বাড়িটার ছাদের ওপরে থাকা গ্লোবে রাত্রিবেলা আলো জ্বলে। দূর থেকে দেখা যায়।
বাড়ির ঠিক সামনে রয়েছে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তি। বঙ্গীয় নবজাগরণের অন্যতম প্রাণপুরুষ তিনি। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক ছিলেন। ১৯০৬ থেকে ১৯১৪ পর্যন্ত পালন করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব। রাশভারী চরিত্র এবং পাণ্ডিত্যের জন্য ভারতীয় এবং ব্রিটিশরা সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি দেশের অন্যতম উন্নত শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত করেন।
স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন
সিইএসসি ভবন থেকে অনেকটা হেঁটে মহাত্মা গান্ধি রোড ক্রসিংয়ের দিকে যান। ক্রসিংয়ের খানিকটা আগে পড়বে স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন। ম্যালেরিয়া, কালাজ্বরের মতো ভয়ংকর সব ক্রান্তীয় রোগের যুগান্তকারী গবেষণা হয়েছে এখানে। প্রতিষ্ঠা করেন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল সার্ভিসের লিওনার্ড রজার্স (১৮৬৪-১৯৬২)। ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজের তিনি প্যাথোলজির অধ্যাপক ছিলেন। স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন ২০০৩ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। এখন ইউনিভার্সিটি অফ হেলথ সায়েন্সেসের অধীন।
স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিপরীতে একটি শিব মন্দির দেখতে পাবেন। পুরোনো ফোর্ট উইলিয়ামের দেওয়ান ত্রিলোকনাথ পাকড়াশী এটি প্রতিষ্ঠা করেন ১৭৫৮ সালে। এমজি রোড ক্রসিং গিয়ে একবার মতিলাল শীল ফ্রি কলেজ দেখে নিন। ১৮৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কলেজটি। লাল রঙের বিশাল ভবন দেখলে বুঝতে পারবেন, মতিলালবাবুর কত অনুরাগ ছিল শিক্ষাবিস্তারে। ১৭৯১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। নীল, কাপড় এবং জাহাজের ব্যবসা করে প্রচুর সম্পদের অধিকারী হন। দানশীলতার জন্যও বিখ্যাত তিনি। ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতাল গড়তে অনেকটা জমি দান করেন।
মার্কাস স্কোয়ার
এক সময় এখানে ছিল বসাকের দিঘি নামে বড়োসড়ো একটি জলাভূমি। শহরের সবচেয়ে পুরোনো অভিজাত পরিবারের সম্পত্তি। গোটা এলাকাটি কলাবাগান নামে পরিচিত ছিল তখন। অনেক আগে কলার বিশাল বাগান ছিল। এখন বস্তি অঞ্চল। স্কোয়ারের সামনে লাল ইটে গড়া একটি মসজিদ রয়েছে। এমন রঙের মসজিদ সাধারণত দেখা যায় না। ওপরের মিনারটির গঠনও অন্যরকম। রাস্তা পেরোলে বিশুদ্ধানন্দ সরস্বতী স্কুল। এটিও লাল ইট দিয়ে বানানো।
মহাজাতি সদন এবং মার্বেল প্যালেস
আট-চালা রীতির স্থাপত্য মহাজাতি সদনের পরিকল্পনা করেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। ১৯৩৯ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কয়েক বছর পর তিনি প্রয়াত হন। অবশেষে ১৯৫৮ সালে উদ্বোধন করেন তখনকার মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়। তিনতলা ভবনে লুকিয়ে আছে অতীতের অনেক স্মৃতি। প্রেক্ষাঘরটিও বহু গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সাক্ষী।
আরও পড়ুন: পুরোনো কলকাতার ‘নেটিভ’ প্রাসাদের বনেদিয়ানা
রাস্তার অন্য ফুটে মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট। গিয়ে দেখে আসুন মার্বেল প্যালেস। উনিশ শতকের ইতিহাস সংরক্ষিত রাখা হয়েছে এখানে। ১৮২১ সালে নীলমণি মল্লিক প্রতিষ্ঠা করেন এক জগন্নাথ মন্দির। নিচু সমতল ছাদওয়ালা মন্দিরটি আজও প্রাসাদ চত্বরে রয়েছে। তবে কেবল পরিবারের সদস্যরাই যেতে পারেন। ১৮৩৫ সালে নীলমণির দত্তক ছেলে রাজেন্দ্র মল্লিক তৈরি করেন এই রাজকীয় প্রাসাদ। মার্বেল প্যালেসে ঢুকতে চাইলে বিবাদী বাগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দপ্তর থেকে বিশেষ অনুপতিপত্র নিতে হবে। প্রশিক্ষিত কর্মীরা আপনাকে অট্টালিকা ঘুরে দেখাবেন। জমকালো ঠাকুর দালান। বিশাল ব্যাংকুয়েট হলের মেঝে নানা রঙের মার্বেল দিয়ে বাঁধানো। আর আছে ছোটো চিড়িয়াখানা এবং পক্ষিশালা। জোশুয়া রেনল্ড, রুবেনস এবং মুরিলোর নিজের হাতে আঁকা ছবি দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যাবে।
মার্বেল প্যালেস থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। যার কথা আগে বলেছি। আগামী সপ্তাহে মধ্য কলকাতার বিখ্যাত কিছু সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ঘুরে দেখব।
