
রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব ও সংগীতশিল্পী বিবেক কুমারের এই গানটি সদ্য প্রকাশিত হয়েছে আশা অডিও থেকে
কলকাতা শহরের অন্যতম প্রধান অঙ্গ বাংলা গান। সেই সমস্ত গানের ভিতর ঢুকে গেছে কলকাতার জল-হাওয়া। কিছু কিছু গানের সুর এখনও আন্দোলিত করে মন। সত্তরের বাংলা গানের দল ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ থেকে আশির দশকের ‘নগর ফিলোমেল’ কিংবা কবীর সুমন-অঞ্জন দত্ত, তারও পরে বেশ কিছু বাংলা ব্যান্ডের গানে সরাসরি ‘কলকাতা’ এসেছে। যদিও বহু বছর গানে সরাসরি ‘কলকাতা’-র প্রসঙ্গ তেমন একটা শোনা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব বিবেক কুমারের কণ্ঠে এবার উঠে এল ঝলমলে চেনা এক কলকাতা। শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণ – উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলোর নস্টালজিয়া সুরের মূর্চ্ছনায় নতুন মাত্রা পেয়েছে। গানটির নাম— ‘আমার কলকাতা’, সদ্য প্রকাশিত হয়েছে আশা অডিও থেকে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘স্মৃতির শহর’ কবিতার সিরিজে লিখেছিলেন, “আমাকে টান মারে রাত্রি-জাগা নদী/ আমাকে টানে গূঢ় অন্ধকার/ আমার ঘুম ভেঙে হঠাৎ খুলে যায়/ মধ্যরাত্রির বন্ধ দ্বার।” – শহরে রাত্রি নামে আর তার দ্বার হয়ে যায় অবারিত। বারবার ঘুম ভেঙে যায় পথিকদের। শহরের বুকে তারা যেন জেগে থাকা চর। তাদের বুকের কলিজায় বসত করে তিলোত্তমার অহংকার। ঐতিহাসিক মহানগরী কলকাতা – যাকে ঘিরে এত আবেগ, উন্মাদনা – কলকাতার মতো খুব কম শহরই আছে, যাকে ঘিরে এত হইহই। শহরের শিক্ষায় তরুণ-তরুণীদের অহংবোধ জন্মায়, ভালোবাসতে শেখে। শঙ্খ ঘোষ বোধহয় এই জন্যেই লিখেছিলেন, “এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটা কলকাতা” – এবং তাকে জানতে হবে, বুঝতে হবে।
বিবেক কুমার পেশাদার সংগীতশিল্পী নন। তাঁর মাতৃভাষাও বাংলা নয়, হিন্দি। যদিও ১৯৯১ সালে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক কাজে যোগ দেবার পরেই বাংলা শেখেন, বাংলায় গানও গান। কলকাতা বিষয়ক এই গান ইতিমধ্যেই বহু মানুষ শুনে ফেলেছেন। উজাড় করে জানিয়েছেন কলকাতা নিয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত আবেগ। এই গান প্রসঙ্গে বিবেক কুমার জানিয়েছেন, “কলকাতা শহরকে আমি হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছি। এই গানও সেখান থেকেই একটা পরিপূর্ণ রূপ নিয়েছে। বলা যেতে পারে, এটি আমার শহরের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। যদিও তিন মিনিটের মধ্যে এই শহরের অবর্ণনীয় আকর্ষণ বোঝানো কঠিন, তবুও আমি নিশ্চিত যে এই গানটি প্রতিটি শ্রোতাকে গভীরভাবে স্পর্শ করবে। কলকাতা এই বাংলার রাজধানী এবং একইসঙ্গে বাংলার মুখ। আমার এই গান তাই পশ্চিমবঙ্গের প্রতিও একপ্রকার শ্রদ্ধাঞ্জলি।”
‘মহীনের ঘোড়াগুলি’-র বিখ্যাত কলকাতা বিষয়ক গান ‘ভেসে আসে কলকাতা’-র কথা বাংলা গানপ্রেমী শ্রোতাদের অজানা নয়। কবীর সুমন থেকে হাল-আমলের অনুপম রায়ও কলম ধরেছেন তিলোত্তমাকে ভালোবেসে। সেই নস্টালজিয়াকে উস্কে দিয়েছে সুব্রতা ঘোষ রায়ের লেখা এবং বিবেক কুমারের সুর-কণ্ঠ। গীতিকার শ্রীমতী ঘোষ রায় ব্যক্তিগত ভালোলাগা থেকে বলেছেন, “বিবেক স্যার আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁর কর্মব্যস্ততার ছোটখাটো অবকাশে কলকাতার বিভিন্ন দিক আমার সামনে যেন উজ্জ্বল করে দিয়েছেন আলোচনার পরতে পরতে। আমি ছবির মতো দেখতে পেয়েছি আমার লেখা।” গানের শুরুতেই তিনি লিখছেন, “কলকাতা মানে আমার শহর, শহরতলির শেষে/ কলকাতা সেই মহামানবের সাগরতীরে মেশে/ কলকাতা মানে বেলুড় থেকে বারুইপুরের চলা/ কলকাতা মানে বনগাঁ-ক্যানিং গতিময় কথা বলা/ কলকাতা মানে রুজিরোজগার আমার সংস্কৃতি/ কলকাতা মানে মহাপুরুষের একাধিক উদ্ধৃতি…” — শুধুমাত্র স্থান-মাহাত্ম্য বর্ণনাই নয়, গানে মিশে গেছে এখানকার মানুষের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার গল্প।
একজন অবাঙালির মুখে দুর্দান্ত বাংলায় এই গান শুনে কলকাতাবাসী আপ্লুত। বিবেক কুমার একাধারে যেমন দক্ষ প্রশাসক, অন্যদিকে আপাদমস্তক সংগীত ও বাংলা ভাষাপ্রেমী। তাঁর ‘আমার কলকাতা’ গানে সুরের মেজাজে জায়গা করে নিয়েছে ভিক্টোরিয়ার ঘোড়াদের উল্লাস, কলেজস্ট্রিটের বইয়ের ভাঁজ, উৎসবে ভরপুর সিটি অফ জয়ের রং, সর্বোপরি সর্বধর্ম সমন্বয়ের কথা। কলকাতা এমন একটি প্রাচীন শহর, যেখানে একইসঙ্গে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী মন্দির-মসজিদ-গির্জা। এই গানে এসেছে শহরের খাবারের ঘ্রাণ এবং বারো মাসে তেরো পার্বণের জৌলুস। গানটির সুরকার এবং গায়ক বিবেক কুমার, গানের কথা সুব্রতা ঘোষ রায়ের, সংগীত আয়োজক কুণাল চক্রবর্তী।
প্রসঙ্গত, বিবেক কুমার পশ্চিমবঙ্গের ‘রাজ্য সংগীত সম্মান’ প্রাপক।
