স্বাধীন বাংলাদেশ – স্মৃতি এবং স্মৃতির কাঁটা

শীতের সকালে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা লাইনে দাঁড়িয়ে গায়ছিল ‘আমার সুনার বাংলা আমি তুমায় ভালোবাসি’

আমি সাংবাদিকতায় যোগ দিই ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে। পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তি আন্দোলনের মূল পর্বটা ঘটে গেছে তার কয়েকমাস আগে। সেই সময়ে এক বন্ধুর সঙ্গে সাইকেল চড়ে সাতসকালে সল্টলেক এলাকায় গিয়েছিলাম। যেখানে পালিয়ে আসা শরনার্থীদের আশ্রয় শিবির হয়েছিল। সেই শীতের সকালে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা লাইনে দাঁড়িয়ে গায়ছিল ‘আমার সুনার বাংলা আমি তুমায় ভালোবাসি’। ওই গান তখনও স্বাধীন বাংলার জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি।

১৯৭২-এর জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা সফরে আসেন। ব্রিগেড ময়দানে তিনি এবং ইন্দিরা গান্ধি ভাষণ দিয়েছিলেন। নতুন পত্রকার হিসেবে সেখানে উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। পরবর্তীকালে দুরদর্শন সংবাদ বিভাগে যোগ দেবার পর একে একে পরিচয় হয়েছিল আকাশবাণীর অনেকের সঙ্গে, যাঁদের মধ্যে ছিলেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রণবেশ সেন এবং উপেন তরফদার। বাংলাদেশ মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে এই তিন মূর্তির নাম আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। সেই সময়ে আকাশবাণী কলকাতার যে সংবাদ পরিক্রমা অনুষ্ঠিত হত, তাতে ভাষ্যপাঠ করতেন দেবদুলাল, বয়ান লিখতেন প্রণবেশ এবং প্রযোজনা করতেন উপেন। সেই কথিকা কেবল এই বাংলায় নয়, পুব বাংলাতেও বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। কারণ তার বড়ো অংশটাই তখন ছিল ওপার বাংলার মুক্তি আন্দোলন কেন্দ্রিক।

পশ্চিম পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পাবার পর ঢাকা ফিরে মুজিব যে সাংবাদিক বৈঠক করেন, সেখানে এঁরা তিনজনেই উপস্থিত ছিলেন। দেবদুলালদার মুখেই শুনেছি, এঁরা যে সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত সেই কথাটা কেউ মুজিবের কানে তুলেছিলেন। তিনি সাংবাদিক সম্মেলনেই দেবদুলাল বাবুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি যদি ঢাকায় ভোটে দাঁড়ান, তাহলে আমিও আপনার কাছে হেরে যাব। একজন মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে এমন স্বীকৃতি পাওয়া খুব সামান্য কথা নয়। দেবদুলালদা পরবর্তীকালে তাঁর অসামান্য ভাষ্যপাঠের জন্য ‘পদ্মশ্রী’ পেয়েছিলেন। তবে সেই প্রাপ্তির পিছনে প্রণবেশদা এবং উপেনদার কৃতিত্বও কোনো অংশে কম নয়। সেই সময়ে পুব বাংলার এই উত্থান নিয়ে আমরা নিশ্চয় অনেকটা আবেগতাড়িত ছিলাম। তবে মাঝের পঞ্চাশ বছর আমাদের অনেককিছু নতুন করে শিখিয়েছে। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে পুব বাংলার মানুষের মধ্যে প্রবল বিক্ষোভ ছিল। তার সূচনা দেশভাগের তিনবছর পরেই। ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে কমিউনিস্ট বন্দিদের গুলি করে হত্যা করা হয়। বিচারের প্রহসনে হত্যাকারীরা শেষ পর্যন্ত কোনো সাজা পায়নি। পুব বাংলাতেই জোর করে উর্দু চাপানোর প্রতিবাদে তীব্র ভাষা আন্দোলন হয় রক্তস্নানের মধ্য দিয়ে ১৯৫২ সালে। তার পরে পরেই মুসলিম বিরোধী ফজলুল হক-সতীন সেন জোট সেখানকার ভোটে জয়ী হলেও তাঁদের সরকার গড়তে দেওয়া হয়নি। এই সব বিক্ষোভের মধ্যে দিয়ে সেখানে সংগ্রামের মুখ হয়ে ওঠেন আওয়ামি লিগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং ন্যাশনাল আওয়ামি পার্টি মৌলানা ফাসানী।

তাঁদের আন্দোলন যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে স্বশস্ত্র বিদ্রোহ করার কোনো কর্মসূচি এঁদের ছিল না। একমাত্র ক্যাপ্টেন তোহার নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টির একটি ভগ্নাংশ, যাঁরা চারু মজুমদারের অনুগামী এবং সেই সময়ে চিনাপন্থী, তাঁরাই সশস্ত্র লড়াইয়ের কথা বলতেন। কিন্তু সেই গোষ্ঠী তখন গোটা মুক্তি আন্দোলনের বিরুদ্ধেই ছিল। সেই কারণেই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকাই প্রধান হয়ে ওঠে। তখন দক্ষিণ ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। তার সঙ্গে বাংলাদেশ উত্থানের তুলনা করলে পার্থক্যটা স্পষ্ট বোঝা যাবে।

ক্ষমতায় আসার চার বছরের মাথায় মুজিব খুন হয়ে যান সেনাকর্তাদের হাতে। ভারতে তার মাসদুয়েক আগে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ অবস্থার কারণেই ইন্দিরা গান্ধির পক্ষে তখন আবার একটি যুদ্ধ ঘোষণা কঠিন হয়ে পড়ে। তারপর গঙ্গা-পদ্মায় অনেক জল গড়িয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীলতা আনতে পেরেছেন মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা। কিন্তু তার পরেও ভারত-বাংলা সম্পর্কের মধ্যে অনেক কাঁটা রয়েই গেছে।

অন্তত দুটো কথা খুব সংক্ষেপে বলা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস। কিন্তু এই রাজ্যে দিনে দিনে বাংলা ভাষা চর্চার যে অধঃপতিত চেহারা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হয় বছরে কেবল এই দিনটিতে কাঁদোকাঁদো গলায় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…’ আউরে যাওয়া ছাড়া আমাদের বোধহয় আর কোনো দায় নেই।

দ্বিতীয় কথা, দুই দেশের মধ্যে বহমান নদীগুলির জল বন্টন নিয়ে যে বঞ্চনা, তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আদালতে নালিশ জানায় এবং রায় তাদের পক্ষে যায়। কিন্তু তারপরেও তিস্তার প্রাপ্য জল দেওয়া নিয়ে টানাপড়েন আজও নদীর স্রোতের মতোই বহমান। তবে সুযোগ পেলেই আমরা গলা ছেড়ে গেয়ে উঠি ‘গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা/ তোমার দুই চোখে দুই জলের ধারা মেঘনা যমুনা’।

*মতামত লেখকের নিজস্ব

Developed by DXDasia