উত্তমকুমারের চলচ্চিত্র জীবন ছিল সংগ্রামে-সংকটে ভরপুর

আজ উত্তমকুমারের চল্লিশতম মৃত্যুবার্ষিকী

কলকাতার ভবানীপুরের সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায়  ও চপলা দেবী ঘুণাক্ষরেও জানতেন না তাঁদের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীমান অরুণ বাড়িতেই এক অ্যামেচার থিয়েটারের দল ‘সুহৃদ সমাজ’ চালু করবেন এবং স্থানীয় স্তরে বেশ নাম ডাক হবে। গোয়েঙ্কা কলেজের বাণিজ্য শাখায় পড়ার সময়ের আগে পরেই অরুণের থিয়েটারের নেশা। অভিনয় তার বেশ আয়ত্তে। অতঃপর পড়াশুনো অসমাপ্ত রেখেই ক্যালকাটা পোর্ট ট্রাস্টে চাকুরিতে যোগদান, গৌরি দেবীর সঙ্গে বিবাহ এবং এক বৈচিত্র্যুপূর্ণ নায়ক জীবনের উত্থান ও কিছু পতনের মধ্যে দিয়ে চলতে থাকা বাংলার প্রথম স্টার, ম্যাটিনি আইডল উত্তমকুমারের জীবনী প্রায় সকলেরই জানা। বাঙালি হৃদয়-মনের  মণিকোঠায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে উত্তমকুমারকে বহু সাধনা, অধ্যবসায় এবং নিশ্চিতভাবেই পরাজয় সহ্য করতে হয়েছিল, একথা বলাই বাহুল্য। ‘এলাম দেখলাম আর জয় করলাম’, উত্তমকুমারের নয়। বস্তুত, প্রাক উত্তম যুগে বাংলার সিনেমা শিল্পে ‘স্টার’ কথাটি প্রায় অজানা ছিল। প্রমথেশ বড়ুয়া-সহ বিভিন্ন নায়ক তাঁর পূর্বে অভিনয় করেছেন, মানুষের মন জয় করেছেন একথা সত্যি। কিন্তু হলিউড থেকে আগত এই স্টার তকমাটি প্রথম উত্তমকুমারের জন্যই যে প্রযোজ্য একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। 

উত্তমকুমারের শুরুটা একদমই হলিউডি তারকা গ্রেগরি পেকের মতো ছিল না বা হাল আমলের আমির খান বা হৃত্বিক রোশানদের মতোও ছিল না, যারা প্রথম সিনেমার পরেই দর্শককুলে বেজায় আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। গ্রেগরি পেকের ক্ষেত্রে শোনা যায়, তাঁর সাথে প্রথম ছবিতে কাজ করতে গিয়ে পরিচালক বেজায় বিভ্রান্ত ছিলেন, কিছুতেই সঠিক অভিনয়, অভিব্যক্তি তাঁর ভিতর থেকে বাইরে আনতে পারছিলেন না, এবং তিনি একপ্রকার মনস্থির করেই ফেলেছিলেন, আর যাই হোক এঁকে নিয়ে আর কাজ নয়। কিন্ত ছবি মুক্তির পর চিত্রটি কিছু অন্যই হয়। এত হাজার হাজার ফ্যান মেল আসতে শুরু করে গ্রেগরির জন্য যে বিস্মিত হন সকলেই, এবং গ্রেগরি রাতারাতি হলিউডের তারকা হয়ে উঠেন। শেষ অবধি তিনি নিজের জায়গায় অবিচল অক্ষত ছিলেন। উত্তমের ওঠা পড়া, লড়াই, লড়ে যাওয়া, ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন বাঁক ইত্যাদি বহুকিছুরই সঙ্গে বড়ো বেশি সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায় অমিতাভ বচ্চনের ক্যারিয়ার বা জীবনের। উত্তমের মতো, অমিতাভের শুরুর দিনগুলোও মসৃণ ছিল না মোটেই। 

১৯৪৮ সালে নীতীন বসু নামের এক চিত্র পরিচালক অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়কে দিয়ে তৈরি করেন, ‘দৃষ্টিদান’, এবং তা বক্স অফিসে ধরাশায়ী হয় অচিরেই। এরপর, আরো বেশ কিছু ছবিতে এই পরাজয়ের ধারা অব্যাহত থাকে। নিন্দুক এবং উন্নাসিক অর্বাচীনের দল এই মানুষটিকে ‘ফ্লপ মাষ্টার জেনারেল’ সহ বিভিন্ন তির্যক মন্তব্যে বিদ্ধ করতেও দ্বিধা করেননি। সেই অন্ধকার সময়ে নিজেকে নিয়ে, অভিনয় এবং নিজের নাম নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিছু কম করেননি নায়ক। প্রথমে অরুণ চ্যাটার্জী, অরুণ কুমার, উত্তম চ্যাটার্জী এবং অবশেষে সপ্রতিভ উত্তমকুমার হয়ে ওঠার জার্নি শেষ হয়, বা এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়, ১৯৫৬ সালে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ মুক্তি পাবার পর থেকেই, যদিও তার পূর্বে ‘বসু পরিবার’ ও ‘সাড়ে চুয়াত্তর-এ নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার ভিত্তিপ্রস্তর গেঁথেই ফেলেছিলেন উত্তম। কিন্তু ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘শাপমোচন’, ‘হারানো সুর’, ‘পথে হল দেরি’, ‘ইন্দ্রাণী’-সহ ইত্যাদি সিনেমা এককথায় বিপ্লব নিয়ে এল বাঙালি মনে এবং অবশ্যই বাংলা সিনেমা শিল্পে। উত্তমকুমার নিরন্তর সিনেমা প্রযোজনাও করেছেন, তার মধ্যে উল্লেখ্য ‘দেয় নেয়া, ‘হারানো সুর’ ইত্যাদি। উত্তম-সুচিত্রার রসায়নে একপ্রকার জারিত হতে থাকে এই বাংলার যুব হৃদয়ের অলিন্দ নিলয়।

‘সপ্তপদী’ ছবিতে উত্তম-সুচিত্রা

‘সপ্তপদী’ তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে তৈরি সিনেমা, উত্তমের সিনেমা জীবনের এক উজ্জ্বল মাইল ফলক, একথা নিশ্চিত। অতঃপর সত্যজিৎ রায়ের তৈরি ক্লাসিক, ‘নায়ক’। ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমা কোথাও উত্তমকে আন্তর্জাতিক পরিধিতে নিয়ে আসে। উত্তমের অভিনয় শুধু যে প্রশংসিত হয়ে ছিল তাইই নয়, স্বয়ং পরিচালক একাধিকার বিভিন্ন আলোচনায় দ্বিধাহীন ভাবেই বলেছেন, তিনি কোনো দৃশ্যেই উত্তমের কাজের কোনো ত্রুটি পাননি। এও এক বিরাট প্রাপ্তি যে কোনো অভিনেতার পক্ষেই। অভিনেতা উত্তমকুমার ১৯৬৭ সালে সত্যজিৎ নির্মিত ‘চিড়িয়াখানা’ ও সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ‘এন্টনী ফিরিঙ্গী’ ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কার পান। এ এক গৌরবময় অধ্যায়।

শুনলে বিস্মিত হতেই হয়, উত্তমকুমার প্রায় পনেরোটি হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। ‘অগ্নিপরীক্ষা’র আদলে তিনি একটি হিন্দি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন প্রযোজক হিসেবে, সেটি, ‘ছোটিসি মুলাকাত’। শোনা যায় উত্তমকুমার তার সারা জীবনের সমস্ত গচ্ছিত পুঁজি এই সিনেমায় বিনিয়োগ করেন। অপূর্ব লোকেশন, শ্রেষ্ঠ কাস্টিং, যেখানে হিরোইন ছিলেন সেই সময়ের প্রবল জনপ্রিয় বৈজয়ন্তী মালা এবং চেষ্টার কোনো ত্রুটি তিনি করেননি। কিন্তু সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই ছবি বাণিজ্যিক মুনাফা তো পেলই না বরঞ্চ উত্তমকুমার কার্যত অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু কেন এমন হল? এমনটা হবার কথা একেবারেই নয়, এই নিয়েও অনেক মিথ হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় আজও। হিন্দি সিনেমায় অভিনয় করার সুযোগ উত্তমকুমার এর আগেও পেয়েছিলেন। রাজ কাপুর নির্মিত ‘সঙ্গম’ চলচ্চিত্রে রাজেন্দ্র কুমার যে চরিত্রটি করেছিলেন, সেই জায়গায় উত্তমের অভিনয়ের জন্য এসেছিল অফার। কিন্তু কোন জ্ঞাত বা অজ্ঞাত কারণে তিনি সেই অফার গ্রহণ করেননি। তারপরেও উত্তমকুমার নিশ্চিতভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ‘চিড়িয়াখানা’র সেটে তাঁর প্রথম মাইল্ড হার্ট এ্যাটাক হয়, ভাঙতে থাকে স্বাস্থ্য।

মানুষটি পার্থিবভাবে নেই চল্লিশ বছর। কিন্তু তিনি উত্তমকুমার, বাঙালির বড়ো আপনার জন। কিংবদন্তি কালোত্তীর্ণ। শত সৌধের মধ্যেও যেমন তাজমহল যুগান্তরেও নিজ মৌলিক উজ্জ্বলতায় অমলিনভাবে অবিনশ্বর, হিমালয়ের গৌরব যেমন উচ্চতম শৌর্যে চির জ্যোতির্ময়, বাংলা সিনেমার প্রজন্মান্তরেও উত্তমকুমার আজও নায়ক, শুধুই নায়ক। গুণীজনে বলেন, “He will remain ever alive, at the top…at the top…at the top…”

তাই হয়তো লিখতে ইচ্ছে হয়,
“যে নায়কের মৃত্যু নেই,
নিজের কোনো দশক নেই,
হাসির মানে আলো
সেই নায়কেই
ভালোবাসা, মুগ্ধ হওয়া ভালো!”

তথ্যসূত্র- সত্যজিৎ রায়ে বক্তৃতার অডিও ক্লিপ, ‘আনন্দলোক’ পত্রিকা।

Developed by DXDasia