
শীতের কলকাতার সাধের ঠিকানা এই পার্ক স্ট্রিট
ডিসেম্বর মানে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। ঠান্ডা মানে কলকাতার পার্কস্ট্রিট (Park Street)। আর পার্কস্ট্রিট মানেই বড়োদিনের ক্রিসমাস (Christmas) উদযাপন। শীতের কলকাতার (Winter in Kolkata) সাধের ঠিকানা এই পার্ক স্ট্রিট। ডিসেম্বরের শেষ কয়েকটা দিন হইচই আর আড্ডার ভিড়ে শীত উদযাপন। ফুটপাত জুড়ে খাবারের মেলা। তাতে কাবাব থেকে থুপ্পা, মোমোর মতো ডিশ পাওয়া যাচ্ছে। এমনকী বাদ নেই বাঙালির সাধের মিষ্টি, এগরোল, চাউমিন। বাচ্চা থেকে শীতবুড়ো… পসরা সাজিয়ে বসে আছেন অনেকে। তাতে রয়েছে সান্টার টুপি থেকে দাড়ি, লাল লাইট জ্বলা হরিণের শিং, বাঁশি থেকে শুরু করে হরেকরকম আইটেম।
আরও পড়ুন: শীতের শহর: বড়োদিন ও বিষাদের আখ্যান
ইতিহাসবিদ এবং গবেষক শঙ্করলাল ভট্টাচার্য পার্ক স্ট্রিট নিয়ে একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন, বিয়ের প্রোপোজ করার ডিনারের জন্য সে সময় ছিল স্কাইরুম, ব্লু ফক্স, মোকাম্বো। আর ষাটের দশকের পার্ক স্ট্রিট বলতে বোঝাত ব্লু ফক্সে প্যান ক্রেন, ট্রিঙ্কাজে ঊষা আইয়ার। আর একটু বেরিয়ে ফারপোজের লিডো রুম ধরলে মিস শেফালি। সেই সময়ে পকেটে যদি টাকার টান থাকত, তাহলে প্রেমিক তার প্রিয় বন্ধুটিকে নিয়ে যেত দুপুরের পার্ক স্ট্রিট গোরস্থানে। সেখানে রোজ এলমারের সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে প্রেমিক বা প্রেমিকার চুম্বন ছিল এক স্বর্গীয় ব্যাপার। আজও এক শ্রেণির বাঙালির কাছে প্রেম করার আরেক নাম কি নয় পার্ক স্ট্রিট? হ্যাঁ, আজও হয়তো তাই। কিন্তু ওই, ‘এক শ্রেণির’ কাছে। অনেকেরই সাধ্যের বাইরে বিচরণ করে এই সাধের পার্ক স্ট্রিট।

১৯৭৩ সালে ট্রিঙ্কাসে ঊষা উত্থুপ (আইয়ার)
বিয়ের প্রোপোজ করার ডিনারের জন্য সে সময় ছিল স্কাইরুম, ব্লু ফক্স, মোকাম্বো। আর ষাটের দশকের পার্ক স্ট্রিট বলতে বোঝাত ব্লু ফক্সে প্যান ক্রেন, ট্রিঙ্কাজে ঊষা আইয়ার। আর একটু বেরিয়ে ফারপোজের লিডো রুম ধরলে মিস শেফালি।
পঞ্চাশ-ষাটের দশকের কলকাতার বহু মানুষ স্মৃতিচারণায় আজও বলেন, সে সময় পার্ক স্ট্রিটের পাশেই রাসেল স্ট্রিট ছিল এক ফালি লন্ডন। সেখানে জ্বলত গ্যাসলাইট। রাতের রাস্তায় হাঁটলে অনুভব করা যেত বিলেতি পথ, বিলেতি মানুষ, বিলেতি মদ, বিলেতি ভালোবাসাও। আবহে হালকা ব্লুজ। সেই ব্লুজ থেকে ছলকে উঠত প্রথম দেখা। যে দেখা শীতকালীন।
বড়োদিনের ক’টা দিন আজও জ্বলজ্বল করে ওঠে চত্বর। ট্রাম, ট্রেন, বাস, ট্যাক্সি, মেট্রো জুড়ে অসংখ্য ভিড়। আজও দিনের পার্ক স্ট্রিট মানে বিখ্যাত এশিয়াটিক সোসাইটি, সেন্ট জেভিয়ার্স, লোরেটো হাউস, অক্সফোর্ড। সন্ধে নামলে পশ্চিমি ব্যান্ড, তাদের বিদেশি সুর- কিছু সফট কিছু হার্ড রক। বাংলার বাইরের রাজ্যগুলো থেকে উড়ে আসা একঝাঁক মানুষ। রংবেরঙের পোশাক, আলুথালু চুল, নেশারু চোখ। আজও পার্ক স্ট্রিট মানে কমলকুমার মজুমদার আর অঞ্জন দত্ত। কমলকুমারের উপন্যাসের পাতা থেকে এই হঠাৎ যেন গান গেয়ে উঠবেন অঞ্জন। লাল মাটির গান থেকে ওয়েস্টার্ন ফোক – আজও কি গ্রাস করে না এক শ্রেণির মানুষদের!

এক রাত্রিকালীন জলসায় মিস শেফালি
সে সময় পার্ক স্ট্রিটের পাশেই রাসেল স্ট্রিট ছিল এক ফালি লন্ডন। সেখানে জ্বলত গ্যাসলাইট। রাতের রাস্তায় হাঁটলে অনুভব করা যেত বিলেতি পথ, বিলেতি মানুষ, বিলেতি মদ, বিলেতি ভালোবাসাও। আবহে হালকা ব্লুজ।
ক্রিসমাস উৎসবের আবহে বাড়তি মাত্রা যোগ করে দেয় এই আলোর মেলা। দুপুর গড়িয়ে সন্ধে নামে। তবু আড্ডার ছবিগুলোর বদল হয় না। একদল চলে যায়, একদল আসে। নতুন বছর না আসা পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে শীতকালীন আড্ডার রিলে।
