
‘বুকঝিম এক ভালোবাসা’ ফিরছে ৩০তম অভিনয় নিয়ে
একা মানুষের ভাষা এবং একা মানুষের জীবনদর্শনে ঢুকে পড়ছে রোজকার ভালোবাসা-প্রেম-বিরহ। এই আনন্দের ভাষা অমোঘ। অমোঘ তার এক একটি উচ্চারণ, শারীরিক ভঙ্গি কিংবা বেঁচে থাকার অভিব্যক্তি। এই একলা মানুষের কথন শোনাবে উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা মনসুর, চাঁদ সুলতানা, আবুল, হায়দার, মহব্বতজং, নূরজাহান কিংবা ফিরোজ শাহ্। প্রায় ছয় মাস পর আবার তাদের ভাষা, আচার ব্যবহার, যাপন পারস্পরিক সম্পর্কের বিন্যাসে উদ্ভাসিত হবে সারা মঞ্চে।

প্রায় ছয় মাস পর কলকাতার মঞ্চে আবার ফিরছে অনীক প্রযোজিত এবং শ্রমণ চট্টোপাধ্যায় নির্দেশিত ও অভিনীত নাটক ‘বুকঝিম এক ভালোবাসা’। দেশ স্বাধীন হবার পর বাংলা থিয়েটার যাকে থিয়েটার বলে চেনে, বুকঝিম সচেতনভাবেই সেখান থেকে আলাদা। এই নাটকের শিকড়ে আছে সৈয়দ শামসুল হকের একটি অখ্যাত উপন্যাস। মূল টেক্সট থেকে এতটুকুও বাইরে না বেরিয়ে তাকে গড়ে তুলেছেন সার্থক থিয়েটারের আদলে। এই নাটক দেখতে দেখতে বারবার মনে হয় যদি প্রসেনিয়ামে না হয়ে এই নাটক রাস্তায় হত, তাহলে মূল প্রযোজনার এতটুকুও ক্ষতি হত না। এই অলংকরণ আক্ষরিক অর্থেই শক্তিশালী এবং একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণও বটে। যে একা মানুষের প্রেমের চিৎকার এবং হাহাকার শ্রমণ এখানে বর্ণনা করেছেন তা পালাগানের রাস্তা ধরে হেঁটেছে। গ্রাম এবং নগরজীবনের দ্বন্দ্ব এখানেই মূর্তমান। আসলে শামসুল হকের নিজস্ব ভাষাশৈলী, যা গ্রামবাংলার অত্যন্ত আদুরে, তা এই নাটকে আস্ত একটি চরিত্র হিসাবে প্রকাশ পেয়েছে।
গোটা মঞ্চ জুড়ে জলের ঢেউয়ের মতো একা একা কথা কওয়া সলিলকি। এই অস্থির সময়ের দলিল এই নাটক। চারদিক যখন মজে রয়েছে ধর্মযুদ্ধ নিয়ে, চারদিকে মানুষ যখন ক্ষমতার হাতের পুতুল; ঠিক সেখানেই বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার কথা বলে বুকঝিম এক ভালোবাসা। আর এই ভালোবাসার উচ্চারণ অমোঘ। এই বিরহের হাহাকার আসলে কারোর একার নয়, সবার। রাজার মহল থেকে চাষির কুঁড়েঘর, নদী থেকে জঙ্গল সবকিছুর মধ্যেই বাস করে একটা বিরাট ক্যানভাস। ক্যানভাসের সেইসব দৃশ্যকল্প এই নাটকে সজীব এবং জীবন্ত হয়ে ওঠে। যোগ্য সঙ্গত দেয় মঞ্চের এককোণে বসে থাকা সংগীতশিল্পীরা। মাঝে মাঝে ধুয়ো তোলেন।

‘বঙ্গদর্শন’কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে শ্রমণ বলেছিলেন, “এই সময়ের সঙ্গে ভালোবাসা বা ঘৃণার কোনো বিরোধ নেই। এই ঘৃণা-সংঘর্ষ সবসময়ই ছিল। ঘৃণার কোনো বদল হয়েছে বলে আমার জানা নেই। বুকঝিম করার সময় এসব কিছুই মাথায় ছিল না। আমরা যারা সৌন্দর্যলোভী তারা সুন্দর কোনোকিছুর থেকে আমন্ত্রণ খুঁজে নিই। মূলত টেক্সটটার জন্যই এই নাটক বেছে নেওয়া। আমার মনে হয়েছিল, যদি ভাষাটাকে শরীরে ধারণ যায় তার মধ্যে দিয়েই ওই সৌন্দর্যের কাছে যেতে পারি, তাহলে ভারি আনন্দ পাব। এই আনন্দের লোভেই বুকঝিম এক ভালোবাসার ভাবনা।” এই নাটকের যতগুলি অভিনয় এখনও পর্যন্ত হয়েছে, দর্শক বারবার আপন করে নিয়েছে শ্রমণ-সহ গোটা বুকঝিম টিমকে। সৈয়দ শামসুল হক এবং শ্রমণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘বুকঝিম এক ভালোবাসা’ ফিরছে আবার তাদের ৩০তম অভিনয় নিয়ে। অনীকের প্রযোজনায়, তাঁদেরই গঙ্গা-যমুনা নাট্যোৎসবের অন্তিম পর্বে। আগামী ৩০ ডিসেম্বর, সন্ধে সাড়ে ছ’টায়, দক্ষিণ কলকাতার মধুসূদন মঞ্চে। শ্রমণ ছাড়াও এই নাটকে অভিনয় করেন সর্বজিৎ ঘোষ এবং সোহিনী চক্রবর্তী। সঙ্গীত পরিচালনায় শুভদীপ গুহ। বাঁশিতে সুশ্রুত গোস্বামী, বাদ্যে জয়ন্ত সাহা, তালবাদ্য ও কণ্ঠ চক্রপাণি দেব এবং শুভদীপ গুহ।

