
নেপথ্যে ব্রিটিশ কূটনীতিক পল ওয়ালশ ও জাঙ্গল ক্রোজ
কলকাতায় খেলা মানেই হয় ক্রিকেট, নইলে ফুটবল। হকিও নজরে থাকে কখনও সখনও। কিন্তু রাগবি? এবছর (২০২৫) ২৯ মে কলকাতার ময়দানে রীতিমতো দাপিয়ে বেড়িয়েছিল বাংলার বিভিন্ন জেলার রাগবি খেলোয়াড়রা। প্রত্যেকেরই বয়স ১৮-র কম। প্রায় ১৫০ জন ছেলেমেয়ে ময়দানের ক্রো ফিল্ডে দিনভর রাগবি খেলেন। তীব্র গরমও হার মেনেছিল তাদের কাছে। তাদের মধ্যে কেউ এসেছিল হাওড়া থেকে, কেউ কেউ দক্ষিণ ২৪ পরগণার, ছিল উত্তর ২৪ পরগনার ছেলেমেয়েরাও। তাদের উৎসাহ দিতে এগিয়ে এসেছিল ভারতের ফরাসি দূতাবাস। খেলার সরঞ্জাম দিয়ে সাহায্য করে এক ফরাসি সংস্থা। ফরাসি ডেপুটি কনসল জেনারেল ফিলিপ কেরবিরিউ ট্রফি, মেডেল দিয়ে তাদের উৎসাহিত করেন।
ছেলেদের এবং মেয়েদের, উভয় বিভাগেই জয়ী হয়েছিল দক্ষিণ ২৪ পরগণার দুই দল। ছেলেদের রাগবি টুর্নামেন্টে রানার্স-আপ হয়েছিল হাওড়া। মেয়েদের টুর্নামেন্টে রুপোর পদক জিতেছিলেন উত্তর ২৪ পরগণার রাগবি খেলোয়াড়রা। কিন্তু মার্কিন মুলুকের ফুটবল অর্থাৎ ‘আমেরিকান সকার’ রাগবি এদেশে জনপ্রিয়তা পেল কী করে? বাংলার সঙ্গে রাগবির সম্পর্ক কতদিনের?

আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে একেবারে নিচে অবস্থানকারীদের জীবনে প্রদীপ শিখা হয়ে দেখা দিচ্ছে এই খেলা। সাত ও আটের দশকে যে ভূমিকা পালন করেছিল ফুটবল, সেই ভূমিকা আজ রাগবি পালন করছে। ফুটবলে ভিনদেশিদের বাড়বাড়ন্ত হলেও, রাগবি আজ দেশীয়দের মঞ্চ।
ভারতীয় ফুটবলের জনক নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী, তাঁর হেয়ার স্কুলের সহপাঠীদের নিয়ে তদানিন্তন কলকাতার বিখ্যাত ক্রীড়া সরঞ্জামের দোকান ম্যান্টন অ্যান্ড কোম্পানি থেকে ফুটবল কিনতে গিয়ে ভুলবশত রাগবি বল কিনে ফেলেছিলেন। হেয়ার স্কুলের মাঠে সেই রাগবি বল নিয়ে যখন তাঁরা ছোটাছুটি করছিলেন, তখন প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রফেসর জিএ স্ট্যাক দেখেই বুঝতে পারেন নগেন্দ্রদের ভুল হয়েছে। ফুটবল কিনতে গিয়ে যে তাঁরা রাগবি বল নিয়ে এসেছে তাও জানান সাহেব প্রফেসর।
ভারতের মাটিতে কলকাতাতেই প্রথমবারের জন্য রাগবি খেলা হয়। সালটা ছিল ১৮৭১। খেলাটি হয়েছিল ইংল্যান্ড বনাম স্কটল্যান্ড-ওয়েলস-আয়ারল্যান্ডের মধ্যে। ইতিহাসের কী অদ্ভুত সমাপতন! একবিংশ শতকে এক ব্রিটিশের হাত ধরেই বাংলায় রাগবির পুনর্জন্ম হয়েছে। তাঁর নাম পল ওয়ালশ।
ব্রিটিশ হাইকমিশনে চাকরি নিয়ে পল কলকাতায় এসেছিলেন ২০০২ সালে। কূটনীতিক পল আর দেশে ফিরে যাননি। ব্রিটিশ হাইকমিশনের চাকরি ছেড়ে প্রায় দু-দশক ধরে রয়ে গিয়েছেন কলকাতায়। কারণ একটাই, কিছু ছেলেমেয়ে, যাঁরা বাংলার নানান প্রান্ত থেকে একজোট হয়েছেন রাগবির নেশায়। তাঁরাই ঘিরে রয়েছেন পলকে। পল ওয়ালশ হয়ে উঠেছেন ময়দানে ‘পলদা’ আবার কারও কারও কাছে ‘পল স্যার’।

মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের পাশে স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার দপ্তরের ঠিক উল্টোদিকের মাঠই পলের কর্মভূমি। কলকাতা ময়দানের হাতে গোনা কিছু মাঠে রাগবি খেলা হয়। তৈরি হয়েছে ‘জাঙ্গল ক্রোজ’। ইংল্যান্ডের ‘জঙ্গল ক্রো’ নামের সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে রাগবির জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য কাজ করে। ভারতে তাঁরা ‘খেলো রাগবি’ স্লোগানকে সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছে। ভারতের প্রতিটি বড়ো শহরে সংস্থার দপ্তর রয়েছে। ভারতে জাঙ্গল ক্রোজ-র যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৪-’০৫ সালে। বছর কুড়ি আগে কলকাতার বুকে একটি ক্লাবের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ব্রিটিশ কূটনীতিক পল ওয়ালশ। মূলত দুঃস্থ পরিবারের ছেলেমেয়ের জন্যেই জাঙ্গল ক্রোজ-র পথ চলা শুরু হয়েছিল।
২০০৭ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও একটি খেতাব জিতেছিল ভারত। ভারতীয় জুনিয়র রাগবি টিম খেলতে গিয়েছিল ইংল্যান্ডে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা ১২ জন অনূর্ধ্ব চোদ্দো বছরের আদিবাসী কিশোরের দল মাত্র চার মাসের প্রশিক্ষণেই লন্ডনে আয়োজিত আন্তর্জাতিক স্কুল রাগবি টুর্নামেন্টের কাপ জিতে নিয়েছিল। সে’দলে জাঙ্গল ক্রোজ-র সাতজন ছিল। সে জয়ের কাহিনি নিয়ে ছবিও তৈরি হয়েছে।

ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারতের রাগবি দলের জয়ের কাহিনি নিয়ে তৈরি হওয়া ছবি
ফিউচার হোপ-এর খেলো রাগবি উদ্যোগ, সঙ্গে পলের জাঙ্গল ক্রোজ, ধীরে ধীরে ক্রিকেট-ফুটবলের ময়দানী রাজত্বের মধ্যেও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে রাগবিকে। একেবারে সাধারণ পরিবার, নিম্নবিত্ত বাড়ি থেকে উঠে আসছেন খেলোয়াড়রা। বাংলার প্রান্তিক এলাকা থেকে, দুস্থ পরিবার থেকে এসে তারা জয় করছে গোটা ভারত। বিশ্ব মঞ্চেও খ্যাতি পাচ্ছেন। শেষ এক দশকে এমন অজস্র নাম উঠে আসছে। চন্দ্রা ওরাঁও, কৃপা ওঁরাও, রুশ্মিতারা জাতীয় দলে জায়গা পাচ্ছেন। জাঙ্গল ক্রোজ-র নেতৃত্বে শিলিগুড়ির গাজলডোবা থেকে শুরু করে কাকদ্বীপ, উত্তরবঙ্গের সরস্বতীপুর চা বাগান থেকে ডুয়ার্স, দক্ষিণবঙ্গের উলুবেড়িয়া, চিংড়িঘাটা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে রাগবি। ভারতীয় রাগবি দলে বাংলার প্রতিনিধিত্ব বেশ সন্তোষজনক। সাত জনের হোক বা ১৫ জনের দল, বাংলার তিন থেকে পাঁচজন খেলোয়াড় থাকেনই। জাতীয় স্তর থেকে শুরু করে অন্তর্জাতিক ইভেন্টে, প্রতিক্ষেত্রেই তাঁরা সাফল্য পাচ্ছেন।
আদিবাসী পরিবার, জঙ্গল অধ্যুষিত এলাকার ছেলেমেয়েরা রাগবি খেলতে আসছেন। পেশাদার রাগবি তাঁদের জীবন পাল্টে দিচ্ছে। আর্থিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি তাঁদের জীবন নিয়ম-শৃঙ্খলার বাঁধন আসছে, খেলার সঙ্গে সঙ্গে পড়াশোনাও শেখা হচ্ছে। দুঃস্থ পরিবারগুলোর মুখে হাসি ফোটাচ্ছে রাগবি। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে একেবারে নিচে অবস্থানকারীদের জীবনে প্রদীপ শিখা হয়ে দেখা দিচ্ছে এই খেলা। ভারতে সাত ও আটের দশকে যে ভূমিকা পালন করেছিল ফুটবল, সেই ভূমিকা আজ রাগবি পালন করছে। ফুটবলে ভিনদেশিদের বাড়বাড়ন্ত হলেও, রাগবি আজ দেশীয়দের মঞ্চ।

অনূর্ধ্ব আঠেরো ছেলেদের রাগবি দলের সঙ্গে পল ওয়ালশ
গত দু’দশক ধরে প্রায় হাজারের বেশি রাগবি খেলোয়াড় তৈরি করেছেন পল এবং তাঁর সহযোগীরা। তাঁদের মধ্যে অন্তত পক্ষে ত্রিশজন বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। জঙ্গল ক্রোজের নানান শিবির মিলিয়ে প্রায় তিন হাজারের বেশি ছেলেমেয়ে রাগবি প্রশিক্ষণ নেয়। মীরা ওঁরাও, কৌশল্যা ওঁরাও, সহদেব ওঁরাও, নিকিতা ওঁরাওদের ‘ক্ষিতদা’ হয়ে উঠেছেন পল ওয়ালশ।
