জন্মশতবর্ষে সুবিনয় রায় ও ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য : দুর্দান্ত গবেষণায় ফুটে উঠলেন বাংলার দুই শিল্পী

গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় চলছে ‘শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি : সুবিনয় রায় ও ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য’ শীর্ষক প্রদর্শনী

গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের ব্যবস্থাপনায় কলকাতার ১১টি মঞ্চে শুরু হয়েছে ‘বাংলা সংগীত মেলা ২০২১’। প্রায় পাঁচ হাজার সংগীতশিল্পীর কণ্ঠের পাশে জ্বলজ্বল করছে দুটি নাম। তাঁরা বাংলা সংগীত জগতের কিংবদন্তি সুবিনয় রায় এবং ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় মহাসমারোহে চলছে ‘শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি : সুবিনয় রায় ও ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনী।

ব্রিটিশ ভারতের ৮ নভেম্বর, ১৯২১ সালে জন্মগ্রহণ করেন সুবিনয় রায়। মা সুখময়ীদেবী নিয়মিত সংগীতচর্চা করতেন। কলকাতার মেট্রোপলিটন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে ইন্টারমিডিয়েটে বিজ্ঞান পড়তে শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন সুবিনয়। বিশেষ বিষয় ছিল রসায়ন। সকালে শিক্ষাভবনে পড়াশোনা আর বিকেলে রসায়নের অধ্যাপক শৈলজারঞ্জন মজুমদারের কাছে সংগীত শিক্ষা – এই ছিল তাঁর জীবন। সুবিনয় রায়ের সংগীতগুরুদের তালিকায় থাকবেন – ভিভি ওয়াঝেলওয়ার, ইন্দিরা দেবীচৌধুরানি, এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। শোনা যায়, ‘বর্ষামঙ্গল’ অনুষ্ঠান উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের কাছে রেওয়াজ চর্চা করতেন সুবিনয়। 

পরবর্তীতে বিষ্ণুপুর ঘরানার ধ্রুপদ শিখেছিলেন রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। কলকাতার ‘দক্ষিণী’ সংগীত শিক্ষায়তনের প্রতিষ্ঠা পর্ব থেকে শিক্ষক ছিলেন। যদিও এর মধ্যে শান্তিনিকেতন ছেড়ে লন্ডনে যান চাটার্ড লাইব্রেরিয়ানশিপে ডিপ্লোমা নিতে। দেশে ফিরে পিতৃবন্ধু প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবীশ স্থাপিত ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন সংগীত শিক্ষার প্রতিষ্ঠান ‘গীতবীথি’। ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত ছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। মাসিক পঞ্চাশ টাকা বেতনে তাঁর কাছে দীর্ঘদিন রবীন্দ্র সংগীত শিখেছেন পঙ্কজ এবং সুবিনয়কে ‘গুরুদেব’ বলে সম্বোধন করে গেছেন আজীবন। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় একসময় লিখেছিলেন, “স্বরলিপিসুদ্ধ রবীন্দ্রনাথের গান যদি শুধু পুঁথিবদ্ধ হয়ে থাকত, যদি তা সুবিনয় রায়দের মতো গায়কদের গলায় ধ্বনিত না হত, তা হলে আমাদের জীবনের অনেকটাই কি শূন্য হয়ে যেত না? রবি ঠাকুরের যোগ্য বাহন হওয়া কি কম ভাগ্যের কথা?”

সুবিনয় রায় বিশ্বভারতী প্রদত্ত দেশিকোত্তম এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সংগীত আকাদেমির আলাউদ্দিন পুরস্কার-সহ বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাঁকে “রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য” উপাধিতেও ভূষিত করে। সুবিনয় রায় জনসমক্ষে জীবনে শেষবারের মতো মঞ্চে গেয়েছিলেন ২০০০ সালে ‘বিশ্ব সংগীত দিবস’ উপলক্ষে, রবীন্দ্র সদনে।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যও বাংলার সংগীত জগতে অন্যতম একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ১৯৪০ সালে প্রণব রায়ের কথায় ও সুবল দাশগুপ্তর সুরে পাইওনিয়ার রেকর্ড ও ভারত রেকর্ড কোম্পানির কর্ণধার সুধীর গুহের সৌজন্যে গাওয়া তাঁর প্রথম গান ‘যদি ভুলে যাও মোরে, জানাবো না অভিমান’ অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়। বাংলা গান তো বটেই, পাশাপাশি নজরুলগীতি, শ্যামা সংগীত, উচ্চাঙ্গ সংগীতের সব শাখাতেই সমান বিচরণ ছিল তাঁর। ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ চলচ্চিত্রে তাঁর দেওয়া সুর ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। দীর্ঘ পাঁচ দশকের সংগীত জীবনে প্রায় ৫০০টি গানের রেকর্ড করেন। নিজে লিখেছেন প্রায় ৪০০টি গান। গীতিকার হিসাবে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের ছদ্মনাম ছিল শ্রীপার্থ ও শ্রীআনন্দ। এমনকি অভিনয়ও করেছেন তিনি – ‘নববিধান’, ‘পাশের বাড়ি’, ‘লেডিজ সিট’ ইত্যাদি ছবিতে।

শোনা যায় ১৯৪১-এ, ‘জীবনসঙ্গিনী’-তে প্রথম নেপথ্য গেয়েছিলেন ধনঞ্জয়। শচীন দেববর্মনের তখন তাঁর গান পছন্দ হয়নি। কয়েক বছর বাদে ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট হলে এক অনুষ্ঠানে ধনঞ্জয়ের গান শুনে সেই শচীন কর্তাই তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘গলাডারে রাইখ্য ধনঞ্জয়’। তাঁর কণ্ঠ দরাজ, চর্চিত এবং অসাধারণ তার বিস্তৃতি।

সুবিনয় রায় (জন্ম ১৯২১) এবং ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য (জন্ম ১৯২২) – একজনের শতবর্ষ শেষ হল, আরেকজনের শতবর্ষ শুরু হল। দুজন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পীকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে কলকাতা তিলোত্তমা-সহ আপামর বাংলা সংগীতপ্রেমী। যথোপযুক্ত তথ্য ও গবেষণার মাধ্যমে দুই শিল্পীকে খুবই যত্নসহকারে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মানুষও ভিড় জমাচ্ছেন। তবে গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় যাতে অতিরিক্ত ভিড় না হয়, তার জন্য সমস্ত বিধি মেনে চলতে বলা হচ্ছে। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় এই প্রদর্শনীর উপদেষ্টা তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন এবং তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের সচিব শান্তনু বসু। সমস্ত গবেষণা ও বিন্যাস করেছেন স্বপন সোম।

প্রদর্শনীটি চলবে ১ জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত, দুপুর ২টো থেকে রাত্রি ৮টা।

ছবিঃ নিজস্ব 

Developed by DXDasia