মৃণাল সেনের শতবর্ষ উদযাপন : কলকাতার আলিয়ঁস ফ্রসেঁজে সিনেমা-আড্ডা-প্রদর্শনী

তাঁকে স্মরণ করবেন অঞ্জন দত্ত, শেখর দাস, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, কুণাল সেন-রা

মৃণাল সেন (Mrinal Sen); সিনেমা বানানোয় আগ্রহ না থাকা সত্ত্বেও, যাঁর মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল রুডলফ আর্নহেইম-এর ফিল্ম ইসথেটিক্স ও আইজেনস্টাইনের শিষ্য নীলসেনের সিনেমা অ্যাজ এ গ্রাফিক আর্ট নামক বইগুলি। প্যারিসের নব্য তরঙ্গ আন্দোলন যাঁকে বিচলিত করে, বামপন্থী রাজনীতি যাঁকে জড়িয়ে ধরে। ছাত্রাবস্থায় যিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা গণনাট্য সংঘের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, অথচ কখনই যিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন না; নিজেকে একজন প্রাইভেট মার্ক্সিস্ট বা ইন্ডিভিজুয়াল মার্ক্সিস্ট বলতেন। বের্টোল্ট ব্রেখটের এপিক থিয়েটার এলিয়েনেশন ইফেক্ট তত্ত্ব তাঁর শিল্পভাবনায় ছাপ ফেলেছিল। যেমন ভাবে, চলচ্চিত্রে ব্রেখটিয়ান ভাবনা প্রযুক্ত করার প্রেরণা পেয়েছিলেন প্যারিসের নিউ ওয়েভ বা ন্যুভেল ভাগ ফিল্ম মুভমেন্টের জঁ লুক গোদার, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো ও ক্লদ শ্যাব্রলদের থেকে, ঠিক তেমনভাবেই সাহস ও অনুপ্রেরণা পেতেন সমসাময়িক-সমমনস্ক বন্ধু বিজন ভট্টাচার্য, বাদল সরকার, ঋত্বিক ঘটক, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজদের থেকে। মৃণাল সেন; ১৯৫৫ সালে বানানো যাঁর প্রথম ছবি ‘রাত-ভোর’ সম্পর্কে যিনি নিজেই অকপটে বলতে পেরেছিলেন, ‘অত্যন্ত জঘন্য ছবি’; যাঁর এক লাখ পঁচিশ হাজার টাকায় বানানো ‘ভুবন সোম’ গোটা ভারতকে চমকে দিয়েছিল শুধু তাই নয়, ছবিটি সম্পর্কে যিনি বলেছিলেন ‘I just wanted to make fun with this ridiculous business of bureaucracy’. বারংবার ফ্রিজ শটের ব্যবহার করে চিত্রনাট্যের সাধারণ ভঙ্গিমাকে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। দীর্ঘ চলচ্চিত্রযাত্রায় তিনি ক্রমাগত নিরীক্ষা এবং অনুশীলনের মধ্য দিয়ে সিনেমার ইতিহাসে সাবলীল পথ প্রশস্ত করেছেন। তাঁর এই সৃষ্টিশীল পথচলায় সামিল করতে চেয়েছিলেন বিশ্বদর্শকদের। অকপটে বলা যায়, মৃণাল সেন একজন ‘টোটাল ফিল্ম মেকার’; তাঁর মতো মহীরুহের ছত্রছায়ায় সাবালক হয়েছে দেশের চলচ্চিত্র ভাবনা। ২০২৩ তাঁর জন্মশতবর্ষ। সেই উপলক্ষে পার্ক স্ট্রিটের আলিয়ঁস ফ্রসেঁজে (Alliance Française du Bengale) ৩ দিন ধরে চলবে সিনেমা-আড্ডা-আলোচনা-প্রদর্শনী। তাঁকে স্মরণ করবেন অঞ্জন দত্ত (Anjan Dutt), শেখর দাশ (Shekhar Das), সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় (Sanjay Mukhopadhyay), কুণাল সেন (Kunal Sen)। আয়োজনে দৃশ্য (Drishya), ব্লু চক স্টুডিও (Blue Chalk Studio), ট্রামলাইন (Tramline)। সহযোগিতায় ওপেন ডোর এনটারটেনমেন্ট (Open Door Entertainment)।

‘আমার বয়স কুড়ি। কুড়ি বছর বয়স নিয়ে আমি আজও হেঁটে চলেছি হাজার বছর ধরে…দারিদ্র, মালিন্য আর মৃত্যুর ভিড় ঠেলে আমি পায়ে পায়ে চলেছি হাজার বছর ধরে…হাজার বছর ধরে দেখছি ইতিহাস, দারিদ্রের ইতিহাস, বঞ্চনার ইতিহাস, শোষণের ইতিহাস’, মৃণাল যখন একেবারে নতুন উত্তাপে উচ্চারণ করছেন এই কথাগুলো, সেই সময় একে একে জন্ম নিয়েছে সত্তর দশকের কলকাতায় নকশালবাড়ি আন্দোলনের রসায়নে তাঁর চিত্রত্রয়ী, ‘ইন্টারভিউ’ (১৯৭১), ‘কলকাতা ৭১’ (১৯৭২) আর ‘পদাতিক’ (১৯৭৩)। মৃণালের চলচ্চিত্র জীবনের নব পর্যায় শুরু হয় কলকাতা-চিত্রত্রয়ীর ভিতর দিয়েই। তাঁর সিনেমা বেয়ে উঠে আসে ‘আরবান গেরিলা’রা। মৃণাল সেন বরাবরই বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন, কথা বলতে চেয়েছেন, তাঁর ফেলে আসা যুবক বয়সের কলকাতা নিয়ে।

সেকারণেই এ শহরের ব্যতিক্রমী যৌবন আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে, ব্যতিক্রমী মানুষকে এক করতেই এই উদ্যোগ, জানিয়েছেন অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা-তত্ত্বাবধায়ক দেবর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়। তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত। দেবর্ষি জানালেন, “মৃণাল সেন বলতেই তাঁর মাঝ-জীবনের রাজনৈতিক পর্বটাকেই বেশি মনে রাখতে চেয়েছে বাঙালি। অন্তত ক’দিন ওঁকে নিয়ে তথ্যচিত্র বানাতে গিয়ে রাস্তায় ঘুরে সেটাই মনে হল। অথচ, তার বাইরে বারবার মৃণাল তাঁর আখ্যানের রাজনীতি দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রকে আক্রমণ করেছেন, সরাসরি রাজনীতির কথা না বলেও। তাঁর আখ্যান হয়ে উঠেছে সময়ের ডালপালা অজস্র ছোটো ছোটো সাব ন্যারেটিভের হাত ধরে আধুনিকতার আরেক নতুন পর্বান্তর।  আমরা অনেকেই কিন্তু এইসব দিক খেয়ালই করিনি। করতে চাইনি। ‘দৃশ্য’-র সুদেব, অরিজিৎ, ‘ব্লু চক স্টুডিও’র রুডি, অরিত্র, প্রলয়, চিরশ্রী, যাঁরা পোস্টার বানিয়ে দিয়েছেন এই অনুষ্ঠানের জন্য, সবার কাছেই আমি ঋণী। অঞ্জন দত্ত’র কাছে আমি কৃতজ্ঞ, যিনি ইচ্ছে প্রকাশ না করলে, এ অনুষ্ঠান হত না। কৃতজ্ঞ হিরণ মিত্র’র কাছেও।”

মৃণাল সেনের কলকাতায় এ যেন এক অন্য ধরনের আবহ। তিন দিন ধরে এই বিকল্প উদযাপনে প্রদর্শিত হবে মৃণাল সেনের ভুবন সোম, কলকাতা ৭১, অন্তরীণ। বক্তব্য রাখবেন, অঞ্জন দত্ত, চলচ্চিত্রবেত্তা-অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, পরিচালক শেখর দাশ। দেখানো হবে মৃণাল সেনের ওপর বানানো তথ্যচিত্র। এছাড়াও ধারাবাহিক ভাবে আঁকা মৃণাল সেন ও তাঁর সিনেমা নিয়ে সামগ্রিক চিত্রকর্ম (তিনটি খাতা) জন্মশতবর্ষের এই অনুষ্ঠানের জন্য উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন শিল্পী হিরণ মিত্র। এর থেকে বাছাই কিছু ছবি অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হবে। বাবার স্মরণে আয়োজিত তিন দিনের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না পারলেও, আয়োজকদের ইতিমধ্যেই একটি ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন কুণাল সেন। “শিকাগো থেকে মৃণাল সেনের পুত্র কুণাল সেন আমাদের এই অনুষ্ঠানের জন্য একটা চমৎকার ভিডিও পাঠিয়েছেন। আমরা যেহেতু আজকের সময় দাঁড়িয়ে ওঁর রেলেভেন্সকে তারুণ্যে খুঁজছি, তাই তরুণদের সঙ্গে মৃণালবাবুর সম্পর্ক নিয়ে কিছু বলতে অনুরোধ করেছিলাম কুণালবাবুকে। সে মত তিনি চমৎকার কিছু কথা বলেছেন। বলেছেন, বেশিরভাগ তরুণরাই মৃণালবাবুর কাছে যেতেন দিনভর ওঁদের বাড়িতে, কারণ তাঁরাই ছিলেন আসলে ওঁর বন্ধু…. মৃণালবাবুর ছবিগুলি যেমন সরাসরি রাজনৈতিক, তেমনি অনেক ছবির বিষয়কে দেখার মধ্যে রাজনীতি আছে, সেখানে হয়তো সরাসরি রাজনীতি না থাকলেও। ওঁর ইচ্ছে প্রবল হচ্ছে আসার। কারণ অনুষ্ঠানটা ওঁর মনের খুব কাছের। কিন্তু অদ্দুর থেকে আসা কঠিন। আমাদের কাছে কুণালবাবুর এই ভালোলাগা যে কত বড়ো! অনুষ্ঠানের তিন দিনেই আমরা শুরুতে কুণালবাবুর এই ভিডিও বার্তাটি সম্পূর্ণটা সবার জন্য চালিয়ে দেব।” বলেন দেবর্ষি।

যা ঘটেছে, মৃণাল সেন দেখেছেন আর বলেছেন চলচ্চিত্রের ভাষায়। তিনি চলে গিয়েছেন, কখনো জানতে পারবেন না উদযাপিত হচ্ছে তাঁর জন্মশতবর্ষ। তবে, তিনি যা চেয়েছিলেন তা সুসম্পন্ন হয়েছে বলে ধরা যেতে পারে… কারণ, অতিক্রান্ত ইতিহাস খননে প্রজন্মের জিজ্ঞাসাকে সঠিক ধারনা দিতে তিনি অভিভাবকের মতো রেখে গেছেন তাঁর প্রজ্ঞা, মুক্ত বাতাস, কয়েক দশকের সিনেমা সম্পদ আর অকুতোভয়তা – যা বর্তমানে ভীষণভাবে দরকার, হয়ত ভবিষ্যতেও। কারণ, মানুষের জীবনের একটা আবশ্যিক মাত্রাই হল আজকের দিনে ‘বিদ্রোহ’, কারণ বিদ্রোহই হল আজকের মানব-সমাজের ঐতিহাসিক বাস্তবিক সত্য।‘বিপ্লব’ শুরু হয় শেষ হবার জন্য, এবং যা শেষ হয় তা আবার শুরু করার প্রয়োজন দেখা দেয়। চিরন্তণ বিদ্রোহ—রিভল্যুশন নয়, ‘রিবেলিয়ান’। মৃণাল তাঁর সময়ে যা বলে গিয়েছেন, ঘুরেফিরে সেই একই কথা বলে ওঠে আমাদের সময়ও, এই অনুষ্ঠান হয়তো আরও একবার তা বুঝিয়ে দিতে চলেছে।   

__________________

‘মৃণাল সেন জন্মশতবর্ষ’-র অনুষ্ঠানের তারিখ- ৯, ১০, ১১ অগাস্ট

সময় – ৬টা – ১০টা

স্থান – আলিয়ঁজ ফ্রঁসেজ, পার্ক স্ট্রিট

প্রবেশ অবাধ

Post Tags
Developed by DXDasia