থিয়েটার রেপার্টয়্যার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা’-য় নবনির্মিত নজরুল

ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা, নির্দেশক গগনদীপ

শেষ কিছু মাসে বাংলা তথা ভারতবাসীর কাছে নজরুল আবারও খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে দেখা দিয়েছেন। তবে শুধু ভারত বললে ভুল হবে, এই ঘটনা বাংলাদেশের পক্ষেও সমান সত্য। জনৈক প্রখ্যাত সংগীত পরিচালকের নজরুলের গানে ভুল সুর দেওয়া বা সুর বিকৃত করা যখন এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটাচ্ছে, তখন তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধও শিল্প-সংস্কৃতির বিভিন্ন পর্যায় থেকে উঠে আসছে। বাংলাদেশের একটি সংগীত মঞ্চে সম্প্রচারিত হওয়া কারার ঐ লৌহকপাট গানটির ভিডিও জনসমক্ষে এসেছিল কিছু মাস আগে এবং বিতর্কের মুখেও পড়েছিল। তার ঠিক কয়েকমাস পর মঞ্চস্থ হল রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার রেপার্টয়্যার (Theatre Repertoire Rabindra Bharati University) প্রযোজিত ‘ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা’ (Jhilimili Ankabanka) নাটকটি।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নটী বিনোদিনী মঞ্চ-এ অভিনীত হল থিয়েটার রেপার্টয়্যার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রযোজিত নজরুল ইসলামের জীবন ও দর্শন কেন্দ্রিক নাটক ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা। নির্দেশনা দিয়েছেন গগনদীপ। অভিনেতা-কলাকুশলী সকলেই নাট্যকলা বিভাগের ছাত্রছাত্রী।

সম্প্রতি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নটী বিনোদিনী মঞ্চ-এ অভিনীত হল থিয়েটার রেপার্টয়্যার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রযোজিত নজরুল ইসলামের জীবন ও দর্শন কেন্দ্রিক নাটক ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা। নির্দেশনা দিয়েছেন গগনদীপ। অভিনেতা-কলাকুশলী সকলেই নাট্যকলা বিভাগের ছাত্রছাত্রী। নাটকটি ভালো-খারাপের থেকেও বেশি করে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে মঞ্চস্থ হচ্ছে বলে। ২০২৪ সালে জীবনানন্দ দাশের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী নিয়ে জনমানুষে যে উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে, নজরুলের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী (125th Birth Anniversary of Kazi Nazrul Islam) সম্পর্কে সেই উন্মাদনার ছিটেফোঁটাও চোখে পড়ে না পশ্চিমবঙ্গে। নজরুল নিজের মুখেই বলে গিয়েছেন তিনি একটি বিশেষ যুগের হুজুগের কবি। কিন্তু তা হলেও নজরুলকে কি ভুলে থাকা সম্ভব? দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি যত পথের বাঁক নেয়, ততই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন কাজী নজরুল ইসলাম। এই নাটকও তার ব্যতিক্রম নয়।

নাটকের মঞ্চায়ন, চরিত্র নির্মাণ, মঞ্চ সামগ্রী পরিবর্তন সবকিছুর মধ্যেই অত্যন্ত সুচারুরূপে ধরা পড়েছে ‘ইলেকট্রিক্যাল অ্যাপ্রোচ’। পর্দা খোলা অবস্থায় নাট্যগৃহে দর্শক প্রবেশ এখন অনেক নাটকেই দেখা যাচ্ছে, তবে দর্শক যখন হলে প্রবেশ করছেন, তখন থেকেই মঞ্চে কলাকুশলীরা বিভিন্ন রকম কাজকর্ম করতে থাকছেন এবং বৃদ্ধ নজরুল সেগুলিকে দেখছেন – নাটক শুরু হওয়ার আগেই এই অতিরিক্ত নাট্যদৃশ্য দর্শকদের ভাবায়, তাক লাগায়। নাটকটিকে নজরুলের জীবনের চারটি পর্যায়ে ভাগ করা যায় – বাল্যকাল, যৌবন ও কৈশোর, মধ্য বয়স এবং শেষ বয়স। নাটকের শুরুতেই চার বয়সের চারজন নজরুলকে মঞ্চে দেখতে পাওয়া যায়। নাটকের কথন একরৈখিক, তবে শুরু থেকে একটি বিশেষত্ব চোখে পড়ে, সেটি হল নজরুলের শিল্পীসত্ত্বাকে একটি চরিত্র হিসেবে মঞ্চে উপস্থাপন করা।

এর পরবর্তী ধাপে নাটকের গতিপথ নিয়ে আলোচনা করতে হয়। নজরুলের জীবনের বিভিন্ন ঐতিহাসিক আখ্যান, গানের দলে যোগ দেওয়া, সৈনিক হিসেবে যুদ্ধে যাওয়া, কমিউনিস্ট পার্টি বিশেষ করে মুজাফ্ফর আহমেদের সংস্পর্শে এসে নবযুগ পরবর্তীতে ধূমকেতু পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হওয়া, গ্রেফতার, বিচার সভা, বিবাহ, বুলবুলের মৃত্যু ও রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু অতি যত্নের সঙ্গে মঞ্চে উঠে এসেছে। দেখা গেছে সাম্যবাদী নজরুল ও আস্তিক নজরুলের দ্বন্দ্ব, এসেছে চলচ্চিত্রে নজরুলের গান ও অভিনয়ের বিষয়টিও।

এই নাটকের মঞ্চ নির্মাণ অসামান্য। বড়ো এবং গ্র্যাঞ্জারফুল মঞ্চ পরিকল্পনায় না গিয়ে সাজেস্টিভ সেটের ব্যবহার, ব্লক, কাপড় বা চাঁদোয়া, খাঁটিয়া এবং ওয়ালাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে ব্যবহার এই নাটকের গতিকে প্রাণ দিয়েছে।

দর্শকদের সবসময় ধরে রাখতে পারে এই নাটক সেটা বলা যায় না, তবে বিভিন্ন দৃশ্য পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে নজরুলের জীবন যেভাবে এগিয়ে যায় নাটকে, তাতে দর্শক ধরে রাখার প্রচেষ্টা চোখে পড়ে। এই নাটকের মঞ্চ নির্মাণ অসামান্য। বড়ো এবং গ্র্যাঞ্জারফুল মঞ্চ পরিকল্পনায় না গিয়ে সাজেস্টিভ সেটের ব্যবহার, ব্লক, কাপড় বা চাঁদোয়া, খাঁটিয়া এবং ওয়ালাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে ব্যবহার এই নাটকের গতিকে প্রাণ দিয়েছে। নজরুলের গানের দলে যোগ দেওয়ার দৃশ্যটি বিশেষভাবে মনে থেকে যায়, আর মনে থেকে যায় বিভিন্ন চরিত্র পালা করে করে নজরুলের বিচারের সময়ে জবানবন্দি দেওয়ার দৃশ্যটি। আরও একটি দৃশ্য সম্পর্কে বিশেষভাবে বলতে হয়, নাটকের একদম শুরুর দিকে অন্নকষ্টের প্রতীক হিসেবে চাল থেকে কাঁকড় বাছার শব্দ ও শিল্পসত্ত্বার প্রতীক হিসেবে ঘুঙুরের শব্দকে যেভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন নির্দেশক, সেটি প্রশংসনীয়। অভিনয়ের ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি একাধিক চরিত্রে সাজেস্টিভভাবে অভিনয়ের বিষয়টা ভালো লাগে, এছাড়া প্রত্যেক চরিত্রাভিনেতারা যথাযথ।

 

আরও কয়েকটি জিনিস লক্ষনীয়। প্রথমত গান ও আবহ সংগীতের দিকে আরও যত্নবান হওয়ার প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয়। নাটকটির শেষ আধ ঘণ্টা দর্শক ধরে রাখতে কিছুটা ব্যর্থ হয়, নাটকের শুরুতে ঘোষিত সময়ের থেকেও নাটকটি অভিনীত হতে আরও ১৫ মিনিট বেশি সময় নেয়। সবশেষে বলতে হয় নাটকটির সাজসজ্জার কথা – বৃদ্ধ নজরুলের চরিত্রে অভিনয় করা তরুণ অভিনেতা মানানসয়ী অভিনয় করলেও তাঁর নকল চুলটি বড়োই পীড়াদায়ক।

ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা ভালো-খারাপের ঊর্দ্ধে যাওয়া একটি নাট্য প্রযোজনা। এক জীবনে কম অপমান, লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়নি নজরুলকে। অথচ রাষ্ট্রের কাছে মাথা নিচু করেননি তিনি। শিরদাঁড়া টানটান রেখে লিখে গেছেন কবিতা, লিখে গেছেন গান। অথচ পশ্চিমবঙ্গে নজরুল উদযাপিত হন না সেভাবে। তাঁর গান বিকৃত করা হয়, সুর বদলে দেওয়া হয়। এর পরেও অনেকে নীরব থাকেন। তরুণ প্রজন্মের কাছে নজরুলের দর্শন সহজভাবে তুলে ধরতে থিয়েটার রেপার্টয়্যার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা প্রযোজনার মাধ্যমে। এমনই প্রাসঙ্গিক কাজ করে বারবার বাংলা থিয়েটার ও ব্যক্তিত্বদের প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে রবীন্দ্রভারতী। সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হল, এই নাটকের নির্দেশক গগনদীপ একজন অবাঙালি। ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামার প্রাক্তনী গগনদীপ পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে থিয়েটার ও টেলিভিশন বিষয়ে স্বর্ণপদক নিয়ে স্নাতকোত্তর করেন। বিশেষ ভাবে পড়াশোনা করেন স্ক্রিনোগ্রাফি বিষয়ে। ড. গগনদীপ বর্তমানে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। জানা যায়, তিনি নজরুলের গান সংক্রান্ত বিতর্ক হওয়ার আগে নজরুল সম্পর্কে বিশেষ অবগত ছিলেন না। এই ঘটনার পর নিজের আগ্রহে তিনি নজরুল সম্পর্কে পড়াশোনা করেন এবং আরও অনেকের সহায়তায় গড়ে তোলেন এই নাটক। আমরা যারা বাঙালি হিসেবে অত্যন্ত গর্ববোধ করি, সমাজ-সংস্কৃতির কেবল ভালোটুকু নিই এবং সমস্যা ও লাঞ্ছনাগুলিকে সযত্নে এড়িয়ে চলি, তাদের কাছে এই উদ্যোগ কি একটি বড়ো প্রশ্নচিহ্ন রেখে গেল না? প্রশ্নটা থাকলো আপনাদের কাছেও…

_____ 
নাটক: ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা | নাট্যরূপ: রতন সন্যায়মত | সম্পাদনা, নির্দেশনা ও পোশাক পরিকল্পনা: গগনদীপ | আবহ: গৌতম ঘোষ | অভিনয়ে: শুভ্রাংশু মুখার্জী, অর্নব সেনগুপ্ত, সায়ক মুখার্জী, সুশান্ত ব্যানার্জী, তিষ্যরূপ চক্রবর্তী, ইপ্সিতা ঘোষ, সুচেতনা পাল, সায়ন্তী ঘটক এবং অন্যান্য
*নাটকটির পরবর্তী অভিনয় ১৫ মার্চ, বিকেল ৫টায় এবং ১৬ মার্চ, সন্ধে ৬:৩০টায় নটী বিনোদিনী মঞ্চে (বিটি রোড ক্যাম্পাস, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়)

Developed by DXDasia