“আমি সামান্য মানুষ, মরবার পরে আমার দেহটা যেন নীরবেই পুড়ে যেতে পারে”

প্রবাদপ্রতিম নাট্যকার শম্ভু মিত্রের ১০৪তম জন্মদিন

মৃত্যুর আগে নিজের ইচ্ছাপত্রে শম্ভু মিত্র লিখেছিলেন, “আমি সামান্য মানুষ। জীবনের অনেক জিনিস এড়িয়ে চলেছি। তাই মরবার পরে আমার দেহটা যেন তেমনই নীরবে, একটু ভদ্রতার সঙ্গে, বেশ একটু নির্লিপ্তির সঙ্গে গিয়ে পুড়ে যেতে পারে।” শেষমেশ তাই-ই হয়েছিল। তাঁর অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী-নাট্যপ্রেমীরা শম্ভু মিত্রের মৃত্যু সংবাদ পাননি। এই নীরবে থাকা মানুষটির আজ ১০৪তম জন্মদিন। নিজের জীবনে এইরকম জাঁকজমক পছন্দ করতেন না ঠিকই, কিন্তু বাংলা থিয়েটারে একটা জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ উপহার দিতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। 

১৯৫১ সালে ‘বাংলা থিয়েটার’ শিরোনামে একটি লেখায় শম্ভু মিত্র লিখেছিলেন, “বিদেশিদের কাছে ধার করা জিনিস নিয়ে নাচানাচি করছি— এই ব্যঙ্গ করলে পরাধীন জাতির আত্মাভিমানে ঘা লাগে। এবং হৃদয়ের নির্দেশ অমান্য করে জোর করে উল্টো পথে চলে আমরা প্রমাণ করতে চাই যে দেশাত্মবোধে আমরা কারও চেয়ে কম নই। কিন্তু এ প্রচেষ্টা আজও পর্যন্ত নন্দিত হয়নি সাধারণ্যে। বাঙালি থিয়েটার ভালোবাসে। শুধু শহুরে বাবুরা নয়, গ্রামের চাষীরাও। এই যাত্রা তাই থিয়েটারের পদাঙ্ক অনুসরণকারী, প্রতিপক্ষ নয়।”

‘বহুরূপী’র এই প্রধান নট ও নির্দেশক মেনে নিয়েছিলেন, ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্টের পর স্বাধীন দেশের বুকে তাঁর দল বা তাঁদের মতো আরও কেউ কেউ যে নাট্যচর্চা শুরু করেছিল, তা আসলে ওই সাহেবদের শেখানো প্রসেনিয়াম থিয়েটারের অনুকরণ করে চলা। শম্ভু মিত্র চেয়েছিলেন আজীবন থিয়েটার কর্মী হিসাবে থেকে যেতে। তাই বহুরূপীতে যতদিন ছিলেন কোনোদিন সেই দলের সভাপতি হননি, সম্পাদকও হননি।

নাটকের ফর্ম ও প্রেজেন্টেশন নিয়ে বরাবর একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে চেয়েছিলেন তিনি। ‘চার অধ্যায়’, ‘দশচক্র’, ‘পুতুল খেলা’, ‘রক্তকরবী’, ‘বিসর্জন’, ‘রাজা অয়দিপাউস’, ‘রাজা’, ‘বিভাব’, ‘উলুখাগড়া’ ইত্যাদি নাটক নির্দেশনা করেছিলেন। বাংলা থিয়েটারের দর্শককে বুঝিয়েছিলেন ‘থিয়েটারের দেশীয়করণ’ আদতে কোথায়। 

আমাদের কাছে শম্ভু মিত্রের নির্দেশক জীবনের শেষ চার বছরের কাজ খুব গুরুত্বপূর্ণ। নাট্যকার বাদল সরকারকে সর্বভারতীয় দর্শকের কাছে উপস্থাপন করার ষোলো আনা কৃতিত্ব কিন্তু তাঁর। ঘটনাচক্রে ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ করা হয়নি। কিন্তু ‘বাকি ইতিহাস’ নাটক থেকেই রিয়ালিজম থেকে খানিক সরে কিছুটা অ্যাবসার্ড থিয়েটারের দিকে বাঁক নিল বহুরূপী। শম্ভু মিত্র নিয়ে এলেন গিরিশ কারনাডকে। এমনকি বিজয় তেন্ডুলকরকে আনলেন বহুরূপীর প্রযোজনায়। ‘শানতাতা, কোর্ট চালু আহে’ থেকে ‘চোপ, আদালত চলছে’-র মতো প্রযোজনা যখন হচ্ছে, তখন দেখতে পাব বাস্তবধর্মী নাটক নির্মাণের খড়ির গণ্ডি মুছে ফেলে অনেক দূরে চলে গিয়েছেন শম্ভু মিত্র। জীবনের শেষ পর্বে এসে লিখেছিলেন, “যেকোনো নাট্যরূপই আমরা অবলম্বন করি না কেন, উদ্দেশ্য হল আজকের দিনের সমস্যাকে দর্শকের মনের সামনে তুলে ধরা, আজকের কষ্টকে আর আজকের চেষ্টাকে প্রতিফলিত করা।” থিয়েটারের দেশজ উপাদান তাতে অব্যাহত থেকেছে। তা সে রবীন্দ্রনাথ হোক বা ইবসেন কিংবা তাঁর নিজের লেখা নাটকেও। বাংলা থিয়েটার সমৃদ্ধ হয়েছে শম্ভু মিত্রের কাজে।

আপসহীন এই মানুষটি বুঝেছিলেন আমাদের সম্পূর্ণ নিজের একটা ভাষা আছে। সেই ভাষাই ব্যবহার করা যেতে পারে থিয়েটারে। তারপর তাকে নিজের মতো সাজিয়ে-গুছিয়ে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা যেতে পারে। হার না মানা শম্ভু মিত্রের আজ ১০৪তম জন্মদিন। 

Developed by DXDasia