
ইতিহাস এবং বর্তমানের যুগলবন্দি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়
সবেমাত্র ফল বেরিয়েছে উচ্চ মাধ্যমিকের। আবার একদল নতুন পড়ুয়ার স্কুল পেরিয়ে কলেজের গণ্ডিতে পা রাখার সময় আসন্ন। নম্বরের রেষারেষি, বিষয় নির্বাচনের চিন্তা সবকিছু মিলিয়ে এক নতুন জার্নির শুরু। কোন কলেজ, কোন বিশ্ববিদ্যালয়, সবকিছু নিয়ে চলছে অবিরাম উন্মাদনা। আর ঠিক এসবের মধ্যেই জন্মদিনের আলোকে দীপ্তমান বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় (Burdwan University)। আজ ১৫ জুন। ১৯৬০ সালে আজকের দিনেই পথ চলা শুরু হয়েছিল বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের। অর্থাৎ আজ ৬৩ বছরে পা দিল বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়।

ইতিহাস বড়ো বিস্ময়কর। সে আপন গতিতে বয়ে চলে, এগিয়ে যায়। তবু ফেলে রেখে যায় স্মৃতি। কথিত আছে, জৈনদের চব্বিশতম তীর্থঙ্কর মহাবীর বা বর্ধমান স্বামী, বর্ধমানের অষ্টিকাগ্রামে নাকি বেশ কিছুদিন বসবাস করেছিলেন। তাঁর নামেই এই জনপদের নাম হয় বর্ধমান। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালেও এই শহরের নাম পাওয়া যায় ইতিহাসের পাতায়।
বর্ধমান জেলার ইট-কাঠ-পাথরের খোদাই করা সেইসব স্থাপত্যের ইতিহাস। বদলে বদলে যাওয়া এই জনপদের খোলসের আড়ালে আজও বাস করে অজানা সব ইতিহাসের কাহিনি। খানিকটা কাল্পনিক, খানিকটা সত্য। সব মিলিয়ে এই জেলার ইতিহাস অনেক অজানা ভার আজও বয়ে চলেছে।
জন্মের ৬২ বছর পেরিয়ে বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়ানো হয় প্রায় ৪৫টি বিষয়ে। বর্ধমান, হুগলি এবং বীরভূম জেলা মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বর্তমানে স্নাতক স্তরের কলেজের সংখ্যা ষাটের অধিক। বি.এড কলেজের সংখ্যা ১৬৯টির মতো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ চলা শুরু হয় বর্ধমান রাজবাড়ির মেহতাব মঞ্জিলে (Mehtab Manzil of Burdwan Rajbari)। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মকথা বলতে গেলে স্বাভাবিক ভাবেই এসে যায় বর্ধমান রাজবাড়ির প্রসঙ্গ। ইতিহাস হল অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে এক অলিখিত সেতু। এখানে অতীত প্রসঙ্গ হল, ১৮৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত বর্ধমান রাজাদের আবাসস্থল আর বর্তমান হল বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মকথা। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যে এই দুই অর্থাৎ অতীত এবং বর্তমানের কথোপকথন চলতেই থাকে।

বর্ধমান রাজবাড়ি ছিল শহরের কাঞ্চননগর এলাকায়। তখন বর্ধমানের রাজা ছিলেন মহারাজ তেজচাঁদ। তাঁর নিজের সন্তান না থাকায় দত্তক নেন, পুত্র মহাতাব চাঁদকে। ১৮৫১ সালে মহাতাবচাঁদই বন্যার হাত থেকে রাজবাড়িকে বাঁচাতে বর্ধমানের অপেক্ষাকৃত কম বন্যাপ্রবণ এলাকায় নির্মাণ করেন নয়া রাজবাড়ি। নাম দেন মহাতাব-মঞ্জিল। এর প্রায় ১০০ বছরেরও বেশি সময় পর, তৎকালীন ভারত সরকারের জমিদারি বিলুপ্তি আইনে অবসান হয় রাজতন্ত্রের। রাজত্ব চলে যায় সরকারের হাতে, কিন্তু রাজার খাস হাভেলি থেকে যায় একই রকম।
অন্যদিকে রাজ্য জুড়ে তখন একচেটিয়া ঘরানা টিকিয়ে রেখেছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু সময়ের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিতে একার কাঁধে উচ্চশিক্ষার ভার বহন করে চলা আর বেশিদিন সম্ভব ছিল না কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে। সময়টা ১৯৫৭ সাল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মের শতবর্ষ পালনে ধুমধাম কলকাতার শিক্ষামহলে। এই সমাবর্তন অনুষ্ঠানেই প্রকাশিত হয় “100 years of the university of the Calcutta” শীর্ষক গ্রন্থটি। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক নির্মল কুমার সিদ্ধান্ত সেই অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরোত্তর ছাত্র-ছাত্রী বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন। জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯০২ সালে কলেজ পড়ুয়া ছিল ৮১৫০ জন মতো, তবে শতবর্ষের পথ চলা পেরিয়ে তা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকাংশে। ১১৭ টি কলেজের মোট পড়ুয়ার সংখ্যা তখন গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫,১৪৭।

২৩ মার্চ ১৯৫৭ তারিখের রাজ্য বিধানসভার অধিবেশনে বিশিষ্ট সাংবাদিক দাশরথী দাঁ প্রশ্ন তোলেন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের। তার উত্তরে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডক্টর বিধানচন্দ্র রায় জানান, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা। উল্লেখ করেন বর্ধমান রাজবাড়ীর একটি অংশ হাতে এসেছে সরকারের, এবং সেখানেই স্থাপন করা হবে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়। ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধে রাজ পরিবারের শেষ রাজা উদয়চাঁদ, রাজ প্যালেস মহতাব মঞ্জিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দান করেন। ১৯৬০ সালে সেখানেই প্রথম জন্ম নেয় বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রথমদিকে প্রশাসনিক কাজ এবং পড়াশোনা দুইই হতো রাজবাড়ির মূল অংশে। প্রথম উপাচার্য ছিলেন আই সি এস সুকুমার সেন (Sukumar Sen)। পরবর্তীতে রাজবাড়ির গোলাপবাগ অংশ সরকারের অধিগ্রহণে আসার পর শিক্ষাদানের বিভাগ স্থান বদলে শুরু হয় সেখানে। তবে উপাচার্যের অফিস এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন থেকে যায় পুরোনো রাজবাড়ির অংশে। ২০১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে সুবর্ণ জয়ন্তী ভবন স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। পরবর্তীতে রাজ্য হেরিটেজ কমিশন (WestBengal Heritage Commission) বর্ধমান রাজবাড়িকে হেরিটেজ বিল্ডিং ঘোষণা করার পরই ঠিক হয় প্রশাসনিক ভবন স্থানান্তরিত হবে নয়া ‘সুবর্ণ জয়ন্তী’ ভবনে। যদিও করোনা পরিস্থিতে সেই স্থান বদলে সাময়িকভাবে ব্যাঘাত ঘটে।
শুরুর সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজের সংখ্যা ছিল ৩০টি। বর্ধমান, শ্রীরামপুর মহকুমা বাদে হুগলি জেলা, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া এবং বীরভূম জেলা। ২০১০ সালের পর পুরুলিয়া(Purulia), বাঁকুড়া (Bankura) এবং বর্ধমান জেলার (Barddhaman) আসানসোল ও দুর্গাপুর মহকুমার কলেজগুলি যথাক্রমে সিধু-কানহু-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে যায়। জন্মের ৬২ বছর পেরিয়ে বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়ানো হয় প্রায় ৪৫টি বিষয়ে। বর্ধমান, হুগলি এবং বীরভূম জেলা মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বর্তমানে স্নাতক স্তরের কলেজের সংখ্যা ষাটের অধিক। বি.এড কলেজের সংখ্যা ১৬৯টির মতো। এছাড়াও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, মেডিকেল বিভাগ, আইন বিভাগ, নার্সিং বিভাগ। এটি দেশের ১০০টি উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি৷ পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্যাম্পাসটিও বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়েরই।

সময়ের স্রোতে আজ বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত স্তম্ভ। গ্রাম-মফস্সলের শয়ে শয়ে পড়ুয়াদের জীবন তৈরির আস্তানা। প্রতিনিয়ত নতুন মুখেদের ভিড়ে গমগম করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। মেলবন্ধন ঘটে ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের। নতুন প্রজন্মের হাত ধরে প্রাণ ফিরে পায় চিরন্তন ঐতিহ্য। আর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় যৌবন পেরিয়ে বৃদ্ধ হয়, এগিয়ে চলে শতবর্ষের পথে।
তথ্যসূত্র –
১। মধ্যযুগের সংস্কৃতি ইউটিউব চ্যানেল
২। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, উইকিপিডিয়া
৩। adhunikitihas.com
ছবি সৌজন্যে – ‘The University Of Burdwan Unofficial’ ফেসবুক পেজ
