
পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের বাস্তব জীবনের পাঠ
সময়টা বসন্তকাল, ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সদ্য পেরিয়েছে একে অন্যকে রঙিন করে তোলার উৎসব দোল। অনেকের হাতের রং হয়তো এখনও ফিকে হয়ে যায়নি। এমন সময়েই আবার নতুন করে হাতে রং মেখেছেন কলকাতার ভারতীয় বিদ্যাভবন স্কুলের শিক্ষিকা ও ছাত্র-ছাত্রীরা। রঙিন হাতে তারা বাংলার পটচিত্রের আঙ্গিকে নতুন করে সাজিয়ে তুলেছেন স্কুলের বাইরের দেওয়ালকে। ভারতীয় বিদ্যাভবন (Bharatiya Vidya Bhavan) স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উদ্যোগে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার জাতীয় পুরষ্কার প্রাপ্ত শিল্পী যুগল নুরউদ্দিন চিত্রকর এবং কল্পনা চিত্রকর হাতে কলমে ছাত্র-ছাত্রীদের শেখালেন ম্যুরাল চিত্রকলা। তাঁদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে গত ২৭ থেকে ২৯ মার্চে নবম ও একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছাত্রীরা ম্যুরাল আর্টের মাধ্যমে সাজিয়ে তুলেছে নিজেদের বিদ্যালয়ের দেওয়ালের একাংশ।

ভারতীয় বিদ্যাভবন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উদ্যোগে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার জাতীয় পুরষ্কার প্রাপ্ত শিল্পী যুগল নুরউদ্দিন চিত্রকর এবং কল্পনা চিত্রকর হাতে কলমে ছাত্র-ছাত্রীদের শেখালেন ম্যুরাল চিত্রকলা।
পিংলা পটচিত্র (Potchitra) মূলত পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীন লোকশিল্প। পুরাণ বা বিভিন্ন লোককথার কাহিনি রং-তুলিতে উজ্জ্বলভাবে ফুটে ওঠে এই শিল্পের মাধ্যমে। তবে শহরের এই স্কুলে পুরাণ কথা নয়, ছাত্র-ছাত্রীদের বিভিন্ন প্রগতিশীল দিকগুলিই রং-তুলিতে ফুটে উঠেছে দেওয়াল জুড়ে। এই বিষয়ে আর্ট শিক্ষিকা সুইটি দত্ত বণিক বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “ভারতীয় বিদ্যাভবন এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতি চর্চায় আগ্রহী করে তোলা হয়। আর শহরের ছাত্রছাত্রীদের কাছে বাংলার লোকশিল্প-লোকসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ খুব বেশি থাকে না। তাই আমরা শিক্ষক-শিক্ষিকারা চেষ্টা করি ওদের সঙ্গে বাংলার মাটির পরিচয় করাতে। এর আগেও তালপাতার সেপাই, শোলার কারুকার্য শিখিয়ে গেছেন স্বনামধন্য শিল্পীরা। এবার এসেছেন নুরউদ্দিন চিত্রকর ও তাঁর স্ত্রী কল্পনা চিত্রকর, তাঁরা দুজনেই জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী। তাঁদের হাত ধরে বাংলার এই শিল্পের পাঠ শিখছে ছাত্র-ছাত্রীরা।” তিনি আরও বলেন, শহর আর গ্রামের মেলবন্ধনই তাঁদের লক্ষ্য, তাই বিদ্যালয়ের দেওয়ালে গ্রামীণ শিল্প উঠে আসছে শহুরে চিন্তাভাবনায়।

অধ্যক্ষ অরুণ কুমার দাশগুপ্ত জানান পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের বাস্তব জীবনের পাঠ দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই ধরনের কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে নান্দনিকতার চর্চার পাশাপাশি বাস্তব জ্ঞান অর্জন হয়। আলো, রং ভৌত বিজ্ঞানের এই বিষয়গুলো নিয়েও চর্চা তারা করতে পারছে। কারণ তাদের বিভিন্ন রং নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। ফলত সেই বিষয়ে ব্যবহারিক জ্ঞানও তারা অর্জন করছে। তাই, পড়ুয়ারাও উৎসাহিত হয় নতুন সৃষ্টিতে মেতে থাকতে। অভিভাবকদের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া কী রকম? এই প্রসঙ্গে শ্রী দাশগুপ্ত বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান অনেক অভিভাবকই ছেলেমেয়েদের এই ধরনের সৃষ্টিশীল কাজে উৎসাহিত করেন। ভবিষ্যতে আরও এই ধরনের আরও গঠনমূলক কাজের পরিকল্পনা আছে।
সুদূর পূর্ব মেদিনীপুর থেকে আসা শিল্পী দম্পতি বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “এর আগে বিভিন্ন কাজ করলেও স্কুলে এই ধরনের কাজ প্রথম করছি। চিরাচরিত রামায়ণ মহাভারতের কাহিনি ছেড়ে রোজকার স্কুল জীবনের চিত্র ফুটিয়ে তুলতেও খুব ভালো লাগছে। এই বিষয়ে শিক্ষিকারা আমাদের সাহায্য করেছেন। ছাত্রছাত্রীদের কাজ করাটাও বেশ আনন্দের।” উৎসাহ পেয়েছে ছাত্রছাত্রীরাও। দুই ছাত্রী নন্দিনী দে ও মধুরা রুদ্র জানালো তাদের অভিজ্ঞতার কথা। শহুরে পরিবেশে বড়ো হওয়া দুই কিশোরীর কাছেই গ্রামের এই শিল্প হাতে কলমে শেখা এই প্রথম। দুজনের মতেই এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা, যা স্কুলের দেওয়ালের পাশাপাশি তাদের মনের ক্যানভাসেও চিত্রিত হয়েছে চিরস্থায়ী ভাবে।

কোনো শিল্পই মানে না কোনো দেশ কাল গণ্ডির বেড়াজাল। সে সুর হোক বা রং-তুলি। সৌন্দর্যের স্রোতে বারবার ভেসে গেছে গ্রাম-শহরের সীমানা, দেশের সীমারেখা। তাই কলকাতার বুকে কোথাও উঠে এলো একটু টুকরো পূর্ব মেদিনীপুর। কৈশোরের চাঞ্চল্যের সঙ্গে মিলে গেল অভিজ্ঞ শিল্পীদের মনন। এই মিলনেই বসন্ত উৎসবের পর নতুন ভাবে রঙিন হলো ভারতীয় বিদ্যাভবন বিদ্যালয়ের দেওয়াল, রঙিন হলো সদ্য বসন্তে পৌঁছনো একঝাঁক সবুজ মন। যারা হয়তো আবার রঙিন করবে তাদের পরবর্তী বসন্তের দূতকে।
