তাঁর জন্ম লাহোর শহরের পাশে গুজরানওয়ালা গ্রামে
সমাজ আর পরিবারের বেড়া ভেঙে পঁচিশ বছরের পাকিস্তানি যুবক মোহাম্মদ তাহির ওয়াহিদ পড়ছেন বাংলা সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসিমউদ্দিন, ফারুক আহমেদ পাঠ করছেন মন দিয়ে। মোহাম্মদ তাহিরের (Mohammad Tahir) জন্ম লাহোর শহরের পাশে গুজরানওয়ালা গ্রামে। পাঞ্জাব সীমান্ত। জন্মসূত্রে পাওয়া ভাষা পাঞ্জাবি। আর জাতীয় ভাষা উর্দু। পরিবারে সাত পুরুষের কেউ বাংলা জানেন না। কিন্তু স্কুল জীবন শেষ করে তাহিরের ইচ্ছে হল জাতীয় ভাষা ছেড়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়বে। ইচ্ছে আর স্বপ্ন থমকে যায় সামান্য উপার্জিত অর্থে। পরিবারের সামর্থ্য নেই ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর, তাও আবার বাংলা! উর্দু বা ইংরেজির বাইরে পাকিস্তানের মতো দেশে বাংলা ভাষায় চাকরি পাবে কোথায়! অদম্য জেদ নিয়েই পরিবারের বেড়া টপকালেন তাহির। গুজরানওয়ালা ছেড়ে পড়তে এলেন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের (Karachi University) বাংলা বিভাগে। তাহিরকে যথাযম্ভব সাহায্য করলেন বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আবু তইয়ুব খান।

করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ
মোহাম্মদ তাহিরের সঙ্গে এরকম অনেক কথা হচ্ছিল। নিজের পড়াশোনার কথা বলতে গিয়ে বারবার চলে আসছিলেন স্যার আবু তইয়ুব খান। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে চলে এসেছিলেন অধ্যাপক খান। তারপর করাচি বিশ্ববিদ্যালয়েই স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল ও পিএইচডি। এ বছর অবসর নেবেন। তিনি মনের জোর আর ইতিবাচক কিছু কথা না বললে তাহিরের পক্ষে বাংলা ভাষা নিয়ে পড়া খুব মুশকিল হত। তাহির বাঙালি নন। অথচ বাংলা নিয়ে স্নাতক শেষ করেছেন। তাহির বলছিলেন, করাচির বাংলা বিভাগে হাতে গুনে পাঁচ-ছয় জন ছাত্র। প্রতি বছর দুই-তিনজন ভর্তি হয়। এক বছরের মধ্যেই কিছু ছাত্র বাংলা ছেড়ে অন্য বিভাগে চলে যায়। কিন্তু তাহির সে পথে হাঁটেননি। বুঝেছিলেন, কোনো ভাষা পড়তে হলে তার সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাপনকে গভীরভাবে জানতে হবে। একটু একটু করে বাংলাদেশে বন্ধু বাড়তে থাকে তাঁর।
তাহির বাঙালি নন। অথচ বাংলা নিয়ে স্নাতক শেষ করেছেন। তাহির বলছিলেন, করাচির বাংলা বিভাগে হাতে গুনে পাঁচ-ছয় জন ছাত্র। প্রতি বছর দুই-তিনজন ভর্তি হয়।
করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাহির যখন ভর্তি হলেন, কিছুদিনের মধ্যেই লকডাউন শুরু হয়ে যায়। অনলাইন ক্লাসে ভালো করে ভাষা শেখা যায় না। অতএব নিজেই বের করলেন উপায়। প্রচুর বাংলা নাটক আর সিরিজ দেখতে শুরু করলেন। দুই বছরের মধ্যে বাংলা বলতে শিখলেন। সিলেবাসে তিনি পড়েছেন বাংলা লিপি-বর্ণমালা, ব্যাকরণ, ছড়া-কবিতা, ইসলামিক সাহিত্য, নাটক, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ভাষাবিজ্ঞান ও ধ্বনি বিজ্ঞান, কুরআন শরিফ ও বুখারি শরিফ থেকে অনুবাদ, উর্দু সাহিত্য ও উর্দু থেকে বাংলা অনুবাদ। বোঝার চেষ্টা করেছেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জসিমউদ্দিন, ফারুক আহমেদ। মোহাম্মদ তাহির ফোনে বলছিলেন, “বাঙালি জাতি আর বাংলাদেশের ইতিহাস ভালোবেসে আমি বাংলা পড়তে এসেছি। একসময় পাকিস্তান-বাংলাদেশ এক ছিল। পরে পৃথক হয়েছে। এই পৃথক হওয়ার ইতিহাস আজকের প্রজন্ম অনেকেই জানে না। বাংলার মতো এত সমৃদ্ধ ভাষা সম্বন্ধে আমি আরও জানতে, পড়তে, বুঝতে চেয়েছিলাম। বোঝার চেষ্টা করেছিলাম এখনকার বাংলাদেশ আসলে পাকিস্তানকে কী চোখে দেখে!”

তাহির যেভাবে বাংলা শিখলেন
তাহির বলেন পাকিস্তানে (Pakistan) প্রায় ২০০টি বাঙালি জনবসতি আছে। এর মধ্যে ১৩২টিই করাচিতে। করাচির বাঙালি বসতি অঞ্চলকে বলা হয় ‘মিনি বাংলাদেশ’। তবে জাতিগত রেষারেষির জন্য সাম্প্রতিককালে বাঙালির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তাহিরের কাছে বাংলা সাহিত্য মানে শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয়। ওঁর জীবনের আরেক অংশ জুড়ে রয়েছে পশ্চিমবাংলা। তাহির দেশভাগের যন্ত্রণা অনুভব করে। শান্তিনিকেতন আর কলকাতা এসে এখানকার মানুষদের সঙ্গে মিশে দেখতে চান। তাহির বলেন, “কলকাতায় তেমন কোনো বন্ধু ছিল না। ভিতরে কোথাও একটা জড়তা ভাব ছিল। কারণ ভারত আর পাকিস্তান আজও ঘোষিত শত্রু। কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে তো তাকে দেশদ্রোহী বলা হয়।”
অথচ ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অবিভক্ত ভারতবর্ষে করাচি-লাহোরের চিকিৎসক-আইনজীবীদের অধিকাংশই ছিলেন বাঙালি। কিন্তু সে সময় আর নেই। পাকিস্তানে বাঙালিদের অধিকাংশই আজ নিজেদের সংস্কৃতি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অতএব কেন একজন অবাঙালি বাংলা ভাষা নিয়ে পড়বে, এই ভয়ের প্রশ্নই ঘুরপাক খেত তাহিরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বাবা আব্দুল ওয়াহিদের মাথায়। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছোটো সন্তান তাহির। ছয় ভাই-বোন। বড়ো ভাই চাকরি করেন। চার বোনের দুইজন বিবাহিত, দুইজন অবিবাহিত। বাবা এখন ঘরেই থাকেন। মা গৃহবধূ। পরিবার ছেড়ে আপাতত করাচির হস্টেলে রয়েছেন তাহির। কিছু সময়ের জন্য হস্টেল থেকে বাইরে চা খেতে বেরিয়েছিলেন। সেই সময় ফোনে শুরু হয় আমাদের কথাবার্তা। তাহির বলেন, “পাকিস্তানেও কিন্তু বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা রয়েছে। সেটা বোঝার জন্য আমাদের চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। বাংলাদেশ আর কলকাতায় কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলেও বুঝেছি পাকিস্তানি বলেই যে হেয় করা হবে এমন নয়। সবকিছুর ঊর্দ্ধে মনুষ্যত্বই মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম হওয়া উচিত।”
পাকিস্তানে বাংলা ভাষা প্রায় ব্রাত্য। টেলিভিশন বা অন্যান্য মাধ্যমে বাংলা ভাষা নিয়ে চর্চা হয় না। মোহাম্মদ তাহির বাংলা ভাষায় স্নাতকোত্তর ও উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ যেতে চান।

সত্তর বছরের পুরোনো করাচির এই বাংলা বিভাগ
১৯৫৩ সালে যাত্রা শুরু করে আজ ৭০ বছর ধরে বিরতিহীন ভাবে চলছে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ। প্রথম বিভাগীয় প্রধান ছিলেন অধ্যাপক সৈয়দ আলি আহসান। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক রাজধানী করাচিতে বাংলাদেশ থেকে আসা প্রায় পনেরো লক্ষ বাংলাভাষী মানুষের বাস। করাচির মচ্ছিবাজার থেকে লায়েরির বাঙালি মার্কেট – আজও বেশিরভাগ দোকানের সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা। বাংলা ভাষায় লিটল ম্যাগাজিনও প্রকাশিত হয় করাচি থেকে। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য থেকে আধুনিক যুগের সাহিত্য ছাড়াও বিষয় বহির্ভূত অথচ প্রয়োজনীয় কিছু বিষয়ে পাঠদান করা হয় বিভিন্ন স্তরে।

মোহাম্মদ তাহির
তাহির নিজের দেশ পাকিস্তানে বাংলা ভাষাকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে চান। তিনি বলেন, “নিজের ভাষা ছেড়ে বাংলা ভাষা নিয়ে পড়তে এসেছি। আমি চাই বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসার ঘটুক এখানে। উর্দু থেকে বাংলায় অনেককিছু অনুবাদ করতে চাই। যাতে ভাষার মাধ্যমে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে পারি।”
এখন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে দূরশিক্ষা (Distance Education)। যাতে বাইরের ছাত্ররাও অংশগ্রহণ করতে পারে। তবে পাকিস্তানে বাংলা ভাষা প্রায় ব্রাত্য। টেলিভিশন বা অন্যান্য মাধ্যমে বাংলা ভাষা নিয়ে চর্চা হয় না। মোহাম্মদ তাহির বাংলা ভাষায় স্নাতকোত্তর ও উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ যেতে চান। সম্প্রতি ভিসা এসেছে তাঁর হাতে। বেশ কিছুদিন ফেসবুকে ও হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ তৈরি করে পাকিস্তানে ইচ্ছুকদের জন্য বাংলা শেখাতে উদ্যোগী হয়েছেন তাহির। উচ্চশিক্ষার জন্য অনেক খরচ। সহৃদয় মানুষদের তাঁর পাশে থাকার জন্য তিনি আহ্বান করছেন। তাহির জেদি। ওঁর স্বপ্ন সত্যি হোক।