সোনালি পাহাড় আর ভৈরবীর গল্প

৭০ বছরের বৃদ্ধার সঙ্গে ৭ বছরের বিচ্ছু বালকের বন্ধুত্ব হাত ধরে হাঁটে

ছেলেবেলায় ভুলতে থাকা ছড়াগুলো যদি আবার ফিরে আসে? যদি সাত সমুদ্রের গল্পকথায় ঝুলি খোলেন ঠাকুমা? বাংলা সিনেমায় এসব হামেশাই দেখা যায়। তবে এতকিছুর মধ্যে যদি একটা আস্ত পাহাড়-পথ থাকে, পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথের সন্ধানে বেরোয় দুই প্রজন্ম? এ গল্প খুব একটা চেনা নয়। কিংবা এ গল্প আমাদের সব্বার। ‘সোনার পাহাড়’ সিনেমায় এমনই কিছু সম্ভাবনার ছবি দেখা যাবে। পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ক্লিশে গল্প না বলে, সত্তর বছর বয়সীর একাকিত্বের সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন সাত বছরের শৈশব। মানবজমিন পার করে এই গল্প জায়গা পেল ঠিক রূপকথার মতোই। দূর থেকে দেখা যায় পাহাড়, ভোরের সূর্য। সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ি চূড়ায়। অভিমানী মেঘ আসে যায়। ছেলেবেলার ড্রয়িং খাতা ভোরে ওঠে রঙিন তুলির টানে। এই ছবির গল্প দূর থেকে ওই সোনার পাহাড় ছুঁতে চাওয়ার। যেখানে গেলেই মিলেমিশে যাবে পারিবারিক যোগাযোগ। পাহাড় আসলে এমনই মনকেমনের হাতছানি, হাওয়ায় কেটে যাওয়া ঘুড়ি আর ভালোবাসার স্মৃতি ঘুরপাক খায় এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে। আলগা হওয়া সম্পর্ক জমাট বাঁধে। হারিয়ে যাওয়ার কোনো বারণ নেই, প্রকৃতির কাছে শুধু নিজেকে উজাড় করে দেওয়া। এভাবেই গল্প এগোয় ‘সোনার পাহাড়’ সিনেমায়।

উপমা (তনুজা) আসেন ছিন্নপত্রের ধুলোর মতো। তিনি একটা প্রজন্ম। তাঁর গভীর একাকিত্বের থেকেও বড় হয়ে দাঁড়ায় নিরিবিলি হাওয়া। হাওয়ার দাপট গায়ে এসে লাগলেই তিনি ফিরে যেতে চান পরের প্রজন্মের কাছে। গল্পে আসে ছোট্ট বিটলু (শ্রীজাত)। এইডসে আক্রান্ত বিটলুও তাই যোগাযোগ স্থাপন করে ফেলতে পারে অনায়াসে। ঠাকুমার নরম কোলে মাথা রেখে গল্প শোনে। এই ছবিতে বিটলুর আসাটা মুক্ত বাতাসের মতো। আলমারির মাথায় থাকা ধুলো পড়া কিশোর সাহিত্য, পাপুনের গল্প আর শাহরুখ খানের রেস্তোঁরার খাবার জমিয়ে দেয় ৭০ বছরের বৃদ্ধার সঙ্গে ৭ বছরের বিচ্ছু বালকের বন্ধুত্ব।

বর্তমান সময়ের খুব বাস্তব ছবিটিই তুলে ধরতে চেয়েছেন পরিচালক। বিটলুর মা মারা গেলে তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন রাজদীপ (পরমব্রত)। যিনি বেশ কিছু বছর ধরে শহরে কাজ করছেন এইচআইভি পজেটিভ বাচ্চাদের সঙ্গে। এদিকে ছেলে বাবান (যিশু) আর বৌমার (অরুণিমা) সঙ্গে বনিবনা না হওয়া উপমা পড়ে থাকেন একা। দিন কাটে বই পড়ে। তাঁকে সঙ্গ দিতেই বিটলু রাজের হাত ধরে আসে তাঁর বাড়িতে। এরপর ভুল বোঝাবুঝি, জেদ, রাগের বশে সম্পর্কগুলো একটু একটু করে হারিয়ে যায়। সকলেই ভাবে বুঝি ফেরার রাস্তা নেই। কিন্তু সবকিছু ফিরে আসে।

ছবির গল্পে একটা খামতি আছে। বলা ভালো গল্প যেদিকে এগোচ্ছিল এমন সমাপতন বড্ড বেমানান। বাংলা ছবির গল্পের শেষে সব্বাইকে যেন ভালো হয়ে যাবার দিব্যি দিয়েছে কোনো এক অশরীরী। পরমব্রত, শ্রীজাত, তনুজা, সৌমিত্র- এঁদের নিয়ে বৃদ্ধ বয়সে একাকিত্বের লড়াই জমে যাচ্ছিল দিব্যি। তনুজা নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেই ছেলে-বৌমার ভালো হয়ে যাবার সুর এই ছবির অন্যতম খামতির জায়গা। এই বোধোদয়ের কোনো কারণ নেই। এই উপলব্ধি অত সহজ নয়। সহজ হলে, এত মানুষ একা হতেন না এই পৃথিবীতে। হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে নিজেকে প্রকাশ করতে অসংকোচ করতেন না।

ছবিতে অরুণিমার চরিত্র ছাড়া প্রত্যেকটি চরিত্রই অনবদ্য। রুপোলি পর্দায় আরেকবার ধরা পড়ল তনুজা-সৌমিত্র’র কেমেস্ট্রি। এ ছবির সম্পদ হলেন তনুজা। তিনিই যেন পাহাড়ি ভৈরবী। বাংলা ছবি অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য। যোগ্য চরিত্রে আবার ফিরে এলেন। ছোট্ট শ্রীজাত এই ছবির মূল সুরটি ধরতে পেরেছে। অভিনয়ে রীতিমতো ছক্কা হাঁকিয়েছে সে। আবহ এবং চিত্রগ্রহণ এ ছবির সম্পদ। নীল দত্তের আবহের সঙ্গে পাহাড়ি বাঁক মিলেমিশে গেছে। ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা দিয়েছে পাহাড়পুরীর মায়া।

বীরপুরষের খোকার মতোই বাবান তার মাকে বলে- ‘আমি বলছি, ‘ভয় পেয়ো না মা গো, ঐ দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা’। মায়ের কোলে সমস্ত সন্তান এভাবে বীরপুরুষ হয়ে যাক। প্রজন্মের সেতুবন্ধনে আমরা ঠিক খুঁজে পাব সোনালি পাহাড়ের মতো আরেকটা উপত্যকা। সুখের মতো ছোট্ট সেই জায়গায় শুধু হাসি-কান্না লেগে থাকবে।

Developed by DXDasia