
‘এনিটাইম টেস্টি’ – এই ছিল তাদের ট্যাগলাইন
আজকের জেনারেশনের কাছে নোনতা খাবার বলতেই প্রথমেই মনে আসে হলদিরাম (Haldiram) এবং বিকানের (Bikaner) ভূজিওয়ালাদের কথা, অথচ আজ থেকে প্রায় ৬৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলার ঘরে ঘরে নোনতা স্বাদের ঘরানায় বাংলার নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘মুখরোচক’ চানাচুরের (Mukharochak Chanachur) চল শুরু হয়েছিল। ‘এনিটাইম টেস্টি’ (Anytime tasty) – ট্যাগলাইনের ভিতর দিয়েই নিজেদের আসল পরিচয় সামনে এনেছিলেন তাঁরা। টক-ঝাল-মিষ্টি মুচমুচে স্বাদের সঙ্গে কোনো আপোষ করেননি। অথচ এমন কোনো মশলা তাঁরা কোনোদিন ব্যবহার করেননি, যার সঙ্গে বাঙালি পরিচিত নয়। যখন একের পর এক মাঝারি আয়তনের বাঙালি প্রতিষ্ঠানে তালা পড়ছে, মুখরোচক চানাচুর, যাঁরা বাংলায় স্ন্যাক্সের ব্যবসার পথিকৃৎ, তাঁরা এখনও মাথা উঁচু করে চার প্রজন্মের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বাঙালির ঘরে ঘরে মুখরোচক কোম্পানিটির এতদিন যাবৎ স্বমহিমায় টিকে থাকার পিছনে রয়েছে সেই স্বাদের সঙ্গে আপোষ না করার গল্প।

শুনলে অবাক হবেন, ১৯৫০ সালে টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর (Tollygunge Tram Depot) সামনে খুবই স্বল্প পরিসরে উৎপাদন ও বিক্রয় -এর মধ্যে দিয়ে পথ চলা শুরু হয়েছিল এই কোম্পানিটির। যদিও স্বাদের মহিমায় খুব কমদিনের মধ্যেই বাঙালি পরিবারের প্রিয় সদস্য হয়ে ওঠে এই ব্র্যান্ডটি। এতো কম সময়ে প্রণব চন্দ্র-র ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং চাহিদা উপলব্ধি করে, বর্তমান মালিক এটিকে নতুন মাত্রা দেওয়ার এবং বৈচিত্র্য আনার সিদ্ধান্ত নেন। নতুন চিন্তাভাবনা এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গিই সম্ভবত এই বিশেষ বাঙালি ব্র্যান্ডটিকে ডানা মেলতে সাহায্য করেছে।
আজ মুখরোচক একটি ISO 9001:2008 & 22000:2005 প্রত্যয়িত কোম্পানি। আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতিতে এবং স্বাস্থ্যকর উপায়ে আজ একাধিক জিভে জল আনা খাবার প্রস্তুতিতে মুখরোচক ব্র্যান্ডের জুড়ি মেলা ভার। এমনকি সময়ের সঙ্গে এই কোম্পানির উল্লেখযোগ্য পণ্যগুলির মধ্যে এসেছে নানান বৈচিত্র্য। চানাচুর ছাড়াও মুখরোচক কোম্পানি ভুজিয়া (Bhujia), আলু ভুজিয়া (Alu Bhujia), কাবুলি চানা (Kabuli Chana), মুগডাল ভাজা (Moongdal), মশলা চিড়া ভাজা (Chira Mixture), ডায়েট চিড়া (Diet Chira), মশলা মুড়ি (Masala Muri), চাল ভাজা (Chaal Bhaja ) ইত্যাদি নানা ধরণের পণ্য বিক্রি করে। এছাড়াও যুগের চাহিদার কথা মাথায় রেখে নিমকি (Nimki), নোনতা কাজুবাদাম (Salted Cashew Nuts), নোনতা চিনাবাদাম (Salted Peanuts), ঘি, এলাচ ও চকলেট স্বাদের সোনপাপড়ি (Soanpapri), টিনের প্যাকেটজাত রসগোল্লা (Rosogolla) এবং গুলাব জামুন (Gulab Jamun) প্রভৃতি দ্রব্যও বিক্রয় করা হয়।

এইভাবে চন্দ্র পরিবারের হাত ধরে সেই সময় বাঙালির নোনতা স্বাদের ঘরানায় মুখরোচক চানাচুর যেন এক চিরন্তন সম্পর্কের গল্প লিখেছিল। মুখরোচকের সুস্বাদু উত্তরাধিকারের দক্ষ মশাল বাহক প্রণব চন্দ্র (Pranab Chandra ) যখন নির্মলেন্দু চন্দ্রের (Nirmalendu Chandra) পরে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি বিশ্বব্যাপী মান অনুযায়ী বাজার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। তিনি জানতেন একটি বিশেষ বাংলা পণ্যকে সুকৌশলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিণত করা যায়। তাই তিনি কিছুদিন পরপরই বাজারের ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে একাধিক নতুন সুস্বাদু পণ্য প্রবর্তন করার কথা ভাবতে থাকেন। তাঁর এই কৌশল সহজেই জনপ্রিয়তা লাভ করে। মুখরোচক ব্র্যান্ডের নামেই একের পর এক নতুন পণ্য বাজারে জায়গা করে নিতে শুরু করে।
‘মুখরোচক’ এই নামটিকে বাংলা তথা আন্তর্জাতিক বাজারে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি নতুন প্রযুক্তি, নতুন স্বাদ, নতুন রেসিপি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতে থাকেন। টিফিনের (Tiffin) হালকা খাবার থেকে শুরু করে, সন্ধ্যেবেলার চায়ের সঙ্গে খাওয়ার জন্য কিংবা ছোটো বড়ো কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজনে স্ন্যাকস-এর চাহিদা মেটাতে নানা রকমের টক,ঝাল, নোনতা চটকদার স্বাদের খাবার চালু করে কোম্পানিটি। আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ, উন্নত মানের খাদ্য উৎপাদন এবং নজরকাড়া প্যাকেজিং ‘মুখরোচক’ ব্র্যান্ডকে বাংলার মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে ফলে সহজেই বাঙালির অভ্যেসে জাঁকিয়ে বসতে পেরেছে ‘মুখরোচক’ ব্র্যান্ডটি।

টালিগঞ্জের একটি ছোট দোকান থেকে শুরু করে আজ ছয় একর পরিমাণ জায়গা নিয়ে ছড়িয়ে রয়েছে মুখরোচক কোম্পানির সমগ্র ইউনিট। সম্পূর্ণ ইউনিটটিকে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। এখন প্রতিদিন প্রায় ১০ টন পরিমাণ নানা ধরনের নোনতা খাবার তৈরি হয় এখানে ফলে, সবদিক দিয়ে সহজেই সবচেয়ে বিশ্বস্ত স্ন্যাকস ব্র্যান্ড হিসাবে বাজারে মুখরোচকের স্থান জোরালো হতে শুরু করে। এখন আমরা সহজেই হাতের কাছে সর্বত্র খুঁজে পাই মুখোরোচকের সবকটি পণ্য। আশেপাশের ছোটো দোকান থেকে শুরু করে নামী-দামী সুপার মার্কেট, সর্বত্রই মিলছে মুখরোচকের চানাচুর, বাদাম, চিড়া ভাজা সহ আরও নতুন নতুন স্বাদের একাধিক খাবার। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বর্তমানে অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইন শপিংও চালু করেছে ব্র্যান্ডটি। ফলে ভারতের পাশাপাশি আমেরিকা এবং ইউরোপীয় বাজারেও জায়গা করতে শুরু করেছে বাংলার নিজস্ব ব্যান্ড ‘মুখরোচক’।
যখন কোনো কোম্পানি কোনো অবস্থাতেই তার দ্রব্যের গুণমান নিয়ে আপোষ করেনা তখন সহজেই সেই কোম্পানিটির একটি বিশ্বস্ত গ্রাহক সংখ্যা তৈরি হতে পারে। বাঙালির ঘরে ঘরে মুখরোচক কোম্পানিটির এতদিন যাবৎ স্বমহিমায় টিকে থাকার পিছনে রয়েছে সেই স্বাদের সঙ্গে আপোষ না করার গল্পই। যথাসাধ্য কঠোর পরিশ্রমের সাথে প্রথমে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে খাঁটি ডাল, চিড়ে, বাদাম ইত্যাদি সংগ্রহ করা হয়। এরপর কোম্পানির নিজস্ব পরীক্ষাগারে কাঁচা অবস্থায় তার গুণমান সঠিকভাবেপরীক্ষা করা হয়। ‘মুখরোচক’ পরিবার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে সমস্ত উপাদানের গুণমান সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মানুষের জিভের স্বাদই শেষ কথা বলতে পারে। আমাদের জিভে রয়ে উন্নত মানের বায়ো-মেকানিজম যা স্বাদের ধরণ নির্ধারণে সহায়তা করে। তাই কোম্পানির যেকোনো উপাদানের সঠিক মান নির্ধারণের জন্য ‘মুখরোচক’ কোম্পানি অত্যন্ত দক্ষ শেফদের একটি দলকে নিযুক্ত করেছে, যাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচারের পর তবেই দ্রব্যটি প্যাকেটজাত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শুধু তাই নয় উন্নত অটোমেশন প্রক্রিয়ায় বারংবার পরীক্ষা করা হয়। এই অটোমেশন সিস্টেমের মাধ্যমে, পুরো প্ল্যান্টটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সুষ্ঠুভাবে বজায় রাখা হয়, যাকে সহজেই যে কোনও বৈশ্বিক মানদণ্ডের সাথে তুলনা করা যায়। কোনো ব্যবসার শুরু থেকে শেষ শব্দ পর্যন্ত গুণমানই যে একমাত্র মানদণ্ড, সেকথাই যেন বারবার প্রমাণ করে দেয় ‘মুখরোচক’। বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্যে আজও এতো বছর ধরে তাই সহজেই নিজের জায়গা ধরে রাখতে পেরেছে আমাদের ছেলেবেলা থেকে আজকের অত পরিচিত মুখরোচক ব্র্যান্ডটি।
প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন
