
বিশ্বভারতী নয়, বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের উদ্যোগে বসবে বিকল্প পৌষমেলা
প্রায় তিনবছর পর জোড়া মেলার খবরে হইচই পড়েছে বোলপুর শহর এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে। আগামিকাল অর্থাৎ ১৮ ডিসেম্বর থেকে বোলপুর স্টেডিয়ামের মাঠে শুরু হচ্ছে ৪০তম বীরভূম জেলা বইমেলা। পাশাপাশি, বোলপুরের ডাকবাংলো মাঠে বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের উদ্যোগে শুরু হচ্ছে পৌষমেলা। একসঙ্গে দুটি মেলার আনন্দে মেতে উঠেছেন বোলপুরবাসী।
তবে উল্লেখ্য, এবছর ঐতিহ্যবাহী পৌষমেলা বিশ্বভারতীর উদ্যোগে হচ্ছে না। প্রতিবারেই এ নিয়ে লাগাতার কাদা ছোঁড়াছুড়ি হয়, এবছরেও তার অন্যথা হয়নি। শেষমেশ এই সিদ্ধান্তে আসা গিয়েছে যে, বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের উদ্যোগেই বসবে পসরা। ভুবনডাঙার মাঠ বদলে গিয়ে মেলা বসবে ডাকবাংলো মাঠে ছোটো পরিসরে। এটিকে পৌষমেলা বলতে নারাজ এলাকাবাসী। বলা যেতে পারে বিকল্প পৌষমেলা। নির্দিষ্ট দিন মেনে অর্থাৎ ৭ পৌষ থেকেই বসবে মেলার পসরা।
পৌষমেলার সঙ্গে বাঙালির আবেগ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রত্যেক বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মেলায় ঘুরতে যান, আনন্দ করেন, কিন্তু বাংলার ঐতিহ্য এই মেলাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কতজন সচেতন থাকেন? দায়সারাভাবে যেখানে সেখানে প্লাস্টিক, খাবারের টুকরো, অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ ফেলে নোংরা করেন পৌষমেলার অংশগ্রহণকারীরাই। সারা বিশ্বে পরিবেশকে বাঁচিয়েই অনেক বড়ো বড়ো মেলা হয়। তাহলে বাংলা থেকে কেন দূষণের অভিযোগে এই ধরনের ঐতিহ্যময় সব মেলা একে একে হারিয়ে যাবে? প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব কবে আম-বাঙালি উপলব্ধি করবে? মেলার ক্রেতা, বিক্রেতা, পর্যটক – সবাই যতদিন না সক্রিয়ভাবে পরিবেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেবেন, ততদিন ধীরে ধীরে প্রকৃতির সঙ্গে বিলুপ্ত হতে থাকবে বাংলার সংস্কৃতিও। বিলুপ্ত হতে থাকবে গ্রামীণ শিল্পও। পৌষমেলা না হওয়ার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পী, হস্তশিল্পী, বোলপুরে ব্যবসায়ী-সহ বিভিন্ন লোকশিল্পীরা ক্ষতিগ্রস্তের সম্মুখীন হতেন। যদিও ছোটো আকারে বিকল্প পৌষমেলা হওয়ায় তাঁদের মুখে সামান্য হাসি ফুটেছে। কিন্তু শান্তিনিকেতনবাসীর একটাই অনুরোধ, দয়া করে মেলার মাঠ নোংরা করবেন না। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হবে সকলেই।
অন্যদিকে, বইমেলার স্টল ও মঞ্চ নির্মাণ-সহ অন্যান্য প্রস্তুতি শেষ হয়ে গেছে। দুই মেলাতেই করোনার সংক্রমণ এড়াতে সবরকম সর্তকতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রশাসন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। অতিমারির জন্য গত বছরের মতো এবারেও পৌষমেলা করা থেকে কার্যত হাত গুটিয়ে নিয়েছে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। তার আগে পাশের স্টেডিয়াম মাঠে ১৮ থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বইমেলার আয়োজন করেছে স্থানীয় গ্রন্থাগার পরিষদ ও জেলা প্রশাসন। এর আগে ২০১৮ সালে শেষ বসেছিল জেলা বইমেলার আসর। এবছর মেলা চত্বরে সব মিলিয়ে প্রায় ৮০টির মতো স্টল থাকবে। পাশাপাশি সরকারি প্রচারমূলক স্টল, পুরসভা, পুলিশ-প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দপ্তরেরও স্টল করা হবে। সাধারণ মানুষের বিনোদনে মেলায় সাতদিনই নানা স্বাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অংশ নেবেন নামি-দামি প্রকাশনী সংস্থা-সহ কলকাতা, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া জেলার বই বিক্রেতারা।
বোলপুর-শান্তিনিকেতন ঐতিহ্যবাহী শহর। রবীন্দ্রনাথ নির্মিত বিশ্বভারতীর ঐতিহ্য শেষ হবার নয়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে ধীরে ধীরে সেজে উঠেছে বোলপুর, বাউল-ফকিরদের আখড়া বসেছে, আবিষ্কৃত হয়েছে বহু লোকশিল্প। এই সবকিছুর সঙ্গেই সেই শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ইতিহাস মিশে আছে। কিন্তু প্রতিবছর পৌষমেলার টানাপড়েনে আর অবাক হন না এলাকাবাসীরা। বিশ্বভারতী অধ্যাপক-অধ্যাপিকাদের মতও ফেলতে পারেন না, আবার পৌষমেলার ঐতিহ্যও ভুলতে পারেন না। শহরের ঐতিহ্য বজায় থাকে তখনই, যখন সামগ্রিক সৌন্দর্য আপনহাতে আগলানো যায়, সেটা না হলে আবেগে গা ভাসানো বৃথা চেষ্টা।
