শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্তর ঘোষণা দিয়ে শুরু হয় বাংলা টেলিভিশনের প্রথম সম্প্রচার

দূরদর্শন-এর বোধন – একটি একক চ্যানেলের যুগ

প্রথম দিনের ঘোষণায় শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্ত – “নমস্কার, আজ থেকে কলকাতা টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হল”

সেই শুরুর দিনের অনুষ্ঠান শ্যামবাজার এলাকার একটি টিভি সেট বিক্রির দোকানে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম। আমি ওই প্রতিষ্ঠানে যোগ দিই ১৯৭৬ সালের ৭ ডিসেম্বর। সংবাদ বিভাগে অস্থায়ী সাব-এডিটর হিসেবে। আমার নিয়োগ কর্তা ছিলেন তখনকার বার্তা সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তী।

আগামী ২০২৫ সালে দূরদর্শন কেন্দ্র কলকাতার (Kolkata Doordarshan) পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। ভারতে টেলিভিশনের সূচনা হয় ১৯৫৯ সালে, দিল্লিতে। দ্বিতীয় কেন্দ্র মুম্বই ১৯৭২-এ। কলকাতা আর চেন্নাইয়ের কেন্দ্র চালু হয় গায়ে গায়ে। ১৯৭৫ সালের ৯ অগাস্ট কলকাতা কেন্দ্রর উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়। কেন্দ্রের তথ্য ও বেতার মন্ত্রী বিদ্যাচরণ শুক্ল, রাজ্যের তথ্যমন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং আকাশবাণীর ডিরেকটর জেনারেল পি সি চ্যাটার্জি। দূরদর্শন তখনও আকাশবাণীর অধীন। টালিগঞ্জ পাড়ার পরিত্যক্ত রাধা ফিল্ম স্টুডিওতে (Radha Studio) সাময়িকভাবে দূরদর্শনের কাজ শুরু হয়। তার পেছনে সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগ বিশেষ ভাবে স্মরণীয়। কেন্দ্রের প্রথম অধিকর্তা হয়েছিলেন মীরা মজুমদার। শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্তর (Sharmistha Dasgupta) ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়, বাংলা টেলিভিশনের প্রথম সম্প্রচার।

প্রথম দিন বাংলা সংবাদ পড়েছিলেন তরুণ চক্রবর্তী

সেই শুরুর দিনের অনুষ্ঠান শ্যামবাজার (Shyambazar) এলাকার একটি টিভি সেট বিক্রির দোকানে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম। আমি ওই প্রতিষ্ঠানে যোগ দিই ১৯৭৬ সালের ৭ ডিসেম্বর। সংবাদ বিভাগে অস্থায়ী সাব-এডিটর হিসেবে। আমার নিয়োগ কর্তা ছিলেন তখনকার বার্তা সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তী। তবে, টেলিভিশন যে বড়োসড়ো আকারে আসছে তার কাহিনি আগেই শুনেছিলাম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ার সময়ে আমরা শিক্ষামূলক ভ্রমণে দিল্লি গিয়েছিলাম। সেখানে রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি এবং তথ্য ও বেতারমন্ত্রী আই কে গুজরালের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। গুজরাল টিভির উজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত বলেছিলেন। সেই বিবরণ পুঁজি করে একটি প্রবন্ধও লিখেছিলাম, যা ছাপা হয়েছিল “অভিনয় দর্পণ” পত্রিকায়। তখনও কলকাতায় টেলিভিশন আসেনি।

অন্য কোনও বিভাগের কথায় যাওয়াটা আমার পক্ষে কিছুটা অনধিকার চর্চা হবে। সেখানে অনেক যোগ্য মানুষ ছিলেন যাঁদের অনেকেই আজও জীবিত। একথা মানতেই হবে এই দেশে আকাশবাণীর (Akashvani) সূচনা যেমন অনভিজ্ঞদের হাতে হয়েছি, তেমন অবস্থা দূরদর্শনেরও। সেটাই স্বাভাবিক। আজকের চালচিত্রের সঙ্গে তার কোনও তুলনাই চলে না। এখন হাজার চ্যানেল দর্শকের হাতের মুঠোয়, কিন্তু পঞ্চাশ বছর আগে সময়টা ছিল একক চ্যানেলের যুগ। এমনকি দূরদর্শনের জাতীয় কার্যক্রমও শুরু হয়েছে ১৯৮২ সালে।

প্রথম ‘সাহিত্য সংস্কৃতি’ অনুষ্ঠান। একদম বাঁদিকে দাঁড়িয়ে আছেন পঙ্কজ সাহা। তারপর (বাঁদিক থেকে) বনফুল, গোপাল হালদার, রাধারাণী দেবী, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও সংযোজক স্বপন মজুমদার

তার আগে পর্যন্ত কলকাতা কেন্দ্র থেকে বাংলা এবং ইংরেজি সংবাদ প্রচারিত হত। প্রথম দিন বাংলা সংবাদ পড়েছিলেন তরুণ চক্রবর্তী এবং ইংরেজি খবর এন বিশ্বনাথন। জাতীয় কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরে আমরা অনেক যোগ্য ইংরেজি সংবাদ-পাঠিকাকে হারিয়েছি। তাঁদের জাতীয় কার্যক্রমে সংবাদ পাঠের জন্য উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি।

আজ অনেক চ্যানেলে অনেক সংবাদ পাঠক আছেন। সেই হট্টমেলায় কাউকে বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করা খুব কঠিন। কিন্তু সেই সময়ে যাঁরা টিভিতে অনুষ্ঠান করতেন, তাঁরা তাড়াতাড়ি পরিচিত হয়ে যেতেন। তাঁদের চিহ্নিত করা অনেক সহজ ছিল। তবে একথাও মানতে হবে যে, একটি নবাগত মাধ্যমের যোগ্য হয়ে ওঠার জন্য তাঁদের মধ্যে গভীর আগ্রহ লক্ষ্য করা যেত। সংবাদ পাঠকদের নির্বাচিত করার জন্য অডিশনে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রয়োজন ছিল। সেই প্রক্রিয়া একেবারেই সহজ নয়।

অসমের ডিগবয়ে অবস্থিত ভারতের প্রথম তৈলকূপ। ১৮৮৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এখানে খনিজ তেল উত্তোলন শুরু হয়। ভারতের খনিজ তেল উত্তোলনের সেই ইতিহাস নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রের শুটিংয়ে তথ্যচিত্রটির পরিচালক বিভাস বোস (ডানদিকে)

ইংরেজিতে লীনা সেন, এন বিশনাথন, জয়ন্ত কৃপালনী, শর্মিষ্ঠা গুহ, কৃষ্ণা ব্যানার্জী, ইন্দ্রাণী মিশ্র এবং আরও অনেকেই যথেষ্ট সুখ্যাত হয়েছিলেন। বাংলায় অবশ্যই নাম করতে হবে ছন্দা সেন, তরুণ চক্রবর্তী, রমেন পাইন, দেবরাজ রায় এবং পরবর্তীকালে ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মধুমন্তী মৈত্রের। তার বাইরে অবশ্যই আরও অনেকে ছিলেন।

সময়টা অবশ্যই কঠিন ছিল। তখনও প্রযুক্তির বিপুল অগ্রগতি ঘটেনি। 16mm-Black and white-Reversal film দিয়ে নিউজ কভারেজ করা হত। তাকে Telecine-র মাধ্যমে টিভির পর্দায় আনার ঝকমারি নিতান্ত কম ছিল না। কাজটা সংবাদ বিভাগকে করতে হত ৩৬৫ দিন। হয়তো সকলেরই বয়স কম ছিল বলে সেই চাপ তখন গায়ে লাগেনি।

সংবাদের বাইরেও সংবাদ বিভাগকে ‘দৃষ্টিকোণ’, ‘সংবাদ প্রবাহ’, ‘একটু ভেবে দেখুন’ জাতীয় অনুষ্ঠানও করতে হত। সেই সঙ্গে বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের নির্বাচনী ভাষণ এবং ভোট পর্বের কাজের চাপ তো ছিলই।

আজকাল ২৪ ঘণ্টার চ্যানেলই রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তখন টেনেটুনে দিনে সাড়ে তিন ঘণ্টার সম্প্রচার চালানো সকলের ঘাম ছুটিয়ে দিত। নতুন মাধ্যমের সেই বোধন পর্ব আমাদের প্রজন্মের কাছে নানা কারণেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Developed by DXDasia