হাতে বানানো কাসুন্দি সহযোগে ফিশফ্রাই বা কবিরাজি মানেই ‘আদি মালঞ্চ কর্মীবৃন্দ রেস্টুরেন্ট’

খাঁটি স্বাদের বিশ্বস্ত ঠিকানা

ঈশ্বর গুপ্ত লিখেছিলেন—“ভাত মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙালি সকল, ধানে ভরা ভূমি তাই মাছ ভরা জল।” সেই বাঙালির হেঁশেলে আজ চাইনিজ, মোঘলাই, কন্টিনেন্টাল সহ অনেককিছুই উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। ভালো কথা। তবে, আমি আদ্যন্ত ‘মেছো’ বাঙালি, ভাত-পাতে রকমারি মাছের লোভনীয় পদ চেটেপুটে খাই। ফাস্টফুড হিসেবেও প্রথম পছন্দ ‘ফিশ-ফ্রাই’ বা ‘ফিশ-কবিরাজি’। কিছুদিন আগেই এক বন্ধুর সঙ্গে হাতিবাগান থেকে শ্যামবাজার মেট্রোর দিকে হাঁটতে হাঁটতে কী মনে হল, বললাম ‘খুব ফিশ-ফ্রাই খেতে ইচ্ছে করছে ভাই, কিন্তু পকেটে টান, সস্তায় পুষ্টিকর কোথায় পাই?’

বন্ধু খানিক ভেবে বললো, ‘চিন্তা নেই, কাছেই আছে আদি মালঞ্চ কর্মীবৃন্দ রেস্টুরেন্ট, চল যাই – খাই।’

বন্ধুর বাড়ি উত্তর কলকাতায়, তাই সেদিকের আটঘাট তার চেনা। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালাম টাউন স্কুলের সামনে, সিকদার বাগানের মোড়ে। ৮২/২সি বিধানসরণী, টাউন স্কুলের বিপরীত গলিতে ঢুকেই চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল। দেখলাম, বাঁশের খুঁটিতে ত্রিপলের ছাউনি দেওয়া একটি দোকানে মাছির মতো ভনভন করছে রসনা-রসিকরা। চড়া হলুদ বাল্বের নীচে দেখলাম জ্বলজ্বল করছে ছোট্ট চৌকো একটা নেমপ্লেট– ‘আদি মালঞ্চ কর্মীবৃন্দ রেস্টুরেন্ট’।

মনে যা চলছিল, মনে না রেখে বলে ফেললাম বন্ধুটিকে, ‘হ্যাঁ রে, এখানের ফিশ-ফ্রাই এ ফিশ থাকে?’

বন্ধুটি প্রায় গালাগাল দেওয়ার ভঙ্গিতেই উত্তর দেয়, ‘চেহারা দেখে, চটক দেখে বাছ-বিচার করাটা খুব খারাপ। পকেট-ফ্রেন্ডলি তো বটেই, উত্তর কলকাতার পুরোনো বিখ্যাত দোকান এটা।’

মুখ কাঁচুমাচু করে বললাম, ‘ও আচ্ছা, আমি কি আর উত্তর কলকাতার সবকিছু জানি! কত কী আছে… যাক গে… খালি হাতে, খালি পেটে না দাঁড়িয়ে একটা-একটা করে দু'প্লেট ফিশফ্রাই বলে দিলেই তো ঝামেলা মিটে যায়!’

ডিমের ডেভিল, চিকেন কাটলেট, ফিশ-ফ্রাই 

অর্ডার দেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কাগজের প্লেটে চলে এল স্যালাড সহযোগে ফিশ-ফ্রাই, সঙ্গে কাসুন্দির মতো কি যেন একটা দিয়েছে দেখলাম। এককামড় বসাতেই…আহা…আহা…রসালো টাটকা ভেটকির স্বাদে মুখের ভিতরটা একেবারে টইটম্বুর হয়ে উঠল।

থাকতে না পেরে শশব্যস্ত এক কর্মীকে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা এই ‘কাসুন্দির মতো’ জিনিসটা কী?

স্পেশাল কাসুন্দি

দাদা(আদি মালঞ্চ কর্মীবৃন্দের কর্মী পান্নালাল হালদার) একগাল হেসে বলেন, ‘কাসুন্দির মতো’ জিনিসটা আসলে কাসুন্দিই; ঝাঁঝ ছাড়া, হাতে বানানো।

দাদাকে পেয়ে খান কয়েক প্রশ্ন করেই ফেললাম, এ দোকানের পত্তন কবে, কীভাবে আর নামের সঙ্গে কর্মীবৃন্দ থাকার বিশেষ কোনও কারণ?

দাদা (গড়গড় করে): ১৯৮১ সাল থেকে আমরা কর্মীরাই এই রেস্টুরেন্ট চালিয়ে আসছি। তার আগে এর প্রপাইটর ছিলেন কৃষ্ণপদ ঘোষ, উনি দোকান বন্ধ করে দেওয়ার পর আমরা ১৭-১৮জন কর্মী মিলেই চালাচ্ছি। ওনার সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই, বর্তমানে আমাদের কোনও কর্ণধারও নেই। আমরা ফুটপাতের মানুষ, যা লাভ হয় আমরা ভাগ বাটোয়ারা করে নিই। সামান্য প্রফিটে ভালো খাবার দেওয়ার চেষ্টা করি আমরা। আমাদের দোকানের ‘স্পেশাল-আইটেম’ ফিশ-ফ্রাই, ফিশ কবিরাজি, মটন কবিরাজি, মটন-ব্রেস্ট কাটলেট, চিকেন কাটলেট। এমনিতে বিক্রিবাট্টা ভালোই হয়, তবে লকডাউনের পর সেই ভিড় এখন আর নেই।

উদাস দৃষ্টিতে পান্নাদা’র শেষ কথাটা একটু মন ভারী করে দিলেও তখন আমার অবস্থা:

ফিশ-ফ্রাই এ একটা করে কামড় বসাচ্ছি আর বন্ধুর দিকে তাকিয়ে ক্যাবলার মতো হাসছি, ভাবটা- ‘তুই না থাকলে এ স্বাদের ভাগ পেতাম না ভাই… আর একটা যদি তুই…হেঁ হেঁ হেঁ’।  

ছবি নিজস্ব

 

Developed by DXDasia