
কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জে এক পাথুরে দেবতার জন্ম হয়েছে বেশ কয়েকবছর আগেই
শিবরাম চক্রবর্তীর বিখ্যাত ‘দেবতার জন্ম’ গল্পটি আমরা সবাই পড়েছি। একজন লোকের যাতায়াতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল একটি পাথর। সেটাকে রাস্তা থেকে সরিয়ে তাই পাশের গাছতলায় রেখে দিয়েছিলেন তিনি। পথচলতি মানুষ ভেবে নিল, সেই পাথর আর কেউ নন, স্বয়ং মহাদেব শিব। তারপর গাছতলায় তৈরি হল শিবের মন্দির। মহাধূমধামে পাথরটির হতে লাগল পুজো। যে ব্যক্তি রাস্তা থেকে পাথরটি কুড়িয়ে গাছতলায় রেখেছিলেন, একদিন তিনিও গিয়ে মাথা নত করলেন সেই পাথরের কাছে। ভয়ের কাছে হার মানল যুক্তিবোধ। এরকমই আরেকটা উদাহরণ দেখা গিয়েছে বলিউডের ‘পিকে’ ছবিতে। পানের লাল রং লাগানো পাথর সেখানে দেবতা হয়ে উঠেছিল তরুণ পরীক্ষার্থীদের কাছে। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। আমাদের চারপাশেও মাঝে মাঝে বড়ো গাছের নিচে এরকম পাথর দেবতার দেখা মেলে।
কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জেও এক পাথুরে দেবতার জন্ম হয়েছিল বেশ কয়েকবছর আগেই। তবে সেখানে রয়েছে অন্য চমক। প্রথমে সেই দেবতা কেবল পাথরেরই ছিলেন। পরে ভক্তজন সেই পাথরের ওপর চোখ-মুখ-গোঁফ এঁকে দিয়েছেন। মেখলিগঞ্জ থেকে ময়নাগুড়ি যাওয়ার রাস্তায় জল্পেশ রোডের পাশে লাল রঙের বেদিতে তিনি বিরাজমান। ঠিক কবে ভক্তরা তাঁকে জলাভূমির ধারে এই বেদিতে স্থাপন করেছেন, তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেন না। কোনো মন্দির সেভাবে গড়ে না উঠলেও দেবতার মাথায় ছাউনির ব্যবস্থা করা আছে। তবে চমক এখানেই শেষ নয়। নামেও এই দেবতা পুরোদস্তুর আধুনিক। স্থানীয় মানুষজন তাঁকে ‘টেনশন ঠাকুর’ বলে ডেকে থাকেন।
আমাদের বঙ্গজীবনে দেবদেবীর অভাব নেই। সিদ্ধিদাতা দেবতা গনেশ, বিদ্যার দেবী সরস্বতী, সম্পদের দেবী লক্ষ্মী, কারিগরির দেবতা বিশ্বকর্মা, সাপেদের দেবী মনসা – কেউ পৌরাণিক তো কেউ বা লৌকিক। তবে, টেনশন দূর করতে আলাদাভাবে কোনো দেবতা বা দেবী ছিলেন না এতদিন। অথচ, একুশ শতকের এক প্রধান সমস্যাই টেনশন। সংসার, ছাত্রজীবন, কর্মজীবন, প্রেম – সর্বত্রই আছে টেনশনের খোঁচা। সেই যন্ত্রণা থেকে আম-মানুষকে স্বস্তি দিতেই টেনশন ঠাকুরের আবির্ভাব – এরকমই মনে করেন তাঁর ভক্তরা। তাঁদের দাবি, এই দেবতার কৃপায় মানুষের দুশ্চিন্তা কেটে যায়। চাকরিপ্রার্থী যুবক-যুবতীদের কাছেও টেনশন ঠাকুর জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন।
বেকারত্বের জ্বালা নাকি তিনি দূর করে থাকেন। নিত্যসেবার পাশাপাশি গত কয়েক বছর ধরে জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তিতে ধূমধাম করে এই দেবতার পুজো হয়। কোনো পুরাণ, লোককথা অথবা প্রাচীন শাস্ত্রে টেনশন ঠাকুরের উল্লেখ নেই। তা সত্ত্বেও তাঁর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়েছে দিকে দিকে। টেনশন ঠাকুরের ভক্তরা দিনে দিনে সংখ্যায় বাড়ছেন। আজকাল বহু মানুষই বিপদে পড়লে শরণ নিচ্ছেন এই দেবতার। করোনা পরিস্থিতিতে ভক্ত বেশি হয়ে গেলে টেনশন ঠাকুর টেনশনে পড়ে যাবেন না তো? এসব নিয়েই আমাদের যা একটু টেনশন…।
