তাকদিরা বেগমের ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান আসলে রক্ষণশীল সমাজের চৌকাঠ পেরোনোর আখ্যান

বাংলার প্রান্তিক, সংখ্যালঘু মেয়েদের আদর্শ হয়ে উঠেছেন তিনি

কেই বা জানতো, বাংলার আটপৌরে কাঁথা সেলাই বা কাঁথা স্টিচ একদিন বিশ্বদরবারে অধিষ্ঠিত হবে! কেই বা জানতো কাঁথা সেলাই কাঁথা ছাড়িয়ে এফোঁড়-ওফোঁড়ে গল্প বুনবে শাড়ি, ব্লাউজ, স্কার্ফ বা হাল ফ্যাশনের পোশাকে! তা নকশিকাঁথা-কে বাংলার অবিনশ্বর শিল্পরূপ হিসেবে উন্নীত করলেন কারা? উত্তর হবে, কারুকর্মে পারদর্শী গ্রামবাংলার অতি সাধারণ মহিলারা। পরম মমতায়, অসীম ধৈর্যে তাঁরা বাঁচিয়ে রেখেছেন সূচীশিল্পের এই পর্যায়টিকে। বীরভূম জেলার তাকদিরা বেগম এমনই এক শিল্পী। জীবনের ৬০টি বসন্ত পেরিয়ে নকশিকাঁথার জন্য ২০২৪-এ পেয়েছেন ভারত সরকারের পদ্মশ্রী সম্মান।

২০২৪ সালের পদ্ম সম্মানের তালিকায় ছিল রীতিমত চমক। রীতি মেনে এবারও পদ্ম সম্মানের তালিকা প্রজাতন্ত্র দিবসের আগের দিন অর্থাৎ ২৫ জানুয়ারি প্রকাশ করা হয় কেন্দ্রের তরফে। তালিকা প্রকাশ পেতেই দেখা যায় বাংলার একাধিক মুখ জায়গা পেয়েছে সেই তালিকায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবার বাংলার প্রান্তিক এলাকা থেকে উঠে এসেছে  একাধিক পদ্ম সম্মানের মুখ। তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায় বীরভূমের সিউড়ির লোকশিল্পী রতন কাহারের নাম রয়েছে তালিকায়। তবে শুধু রতন কাহার নয়, রতন কাহারের পাশাপাশি পদ্ম সম্মান পেয়ে বীরভূমকে গর্বিত করেছেন আরও এক পদ্মশ্রী প্রাপ্ত তাকদিরা বেগম (Padma Award 2024 Takdira Begum)।

তাকদিরা বেগম বীরভূমের বোলপুরের জামবুনি এলাকার মাদ্রাসা পাড়ার বাসিন্দা। তিনি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করছেন। এই কাজের জন্যই তাকে কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে সম্মানিত করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। তবে, এর আগেও তাঁর কাজের জন্য কখনো জেলা, কখনো রাজ্য আবার কখনো জাতীয় স্তরে পুরস্কৃত হয়েছেন তাকদিরা। ১৯৯৫ এবং ১৯৯৬ সালে পরপর দুবার তিনি জাতীয় স্তরে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। এছাড়াও ২০০৯ সালে তিনি ‘শিল্পগুরু’ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। 

কিশোরবেলায় বিয়ে হওয়ার পর এসছিল একের পর এক বাধা। সেসব অতিক্রম করেই, নিজে এই কাজ করে রোজগার এবং সংসার চালানোর পাশাপাশি এলাকার বহু মহিলাকে তিনি রোজগারের পথ দেখিয়েছেন।

 

তাকদিরা বেগম নিজের বাড়িতেই কাঁথা স্টিচের কাজ করেন এবং তা দেশের বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দেন। তার হাতে তৈরি কাঁথা স্টিচের কাজ এখন মূলত দিল্লিতে পৌঁছে যায় তার মেয়ে ও জামাইয়ের হাত ধরে। সেখানেই তাকদিরার হাতে তৈরি কাঁথা স্টিচের সারঞ্জাম বিক্রি হয়। ভারতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রান্তিক মহিলারাও এমন একটি শৈল্পিক উত্তরাধিকার লালন করে সাবলম্বী হচ্ছেন, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ স্থাপন করেছেন তাকদিরা।

Developed by DXDasia