নতুন রূপে ‘পাঞ্চজন্য’ : গান্ধারী চরিত্রে স্বাতীলেখা ছিলেন স্থিতধী, সোহিনী হয়ে উঠলেন চঞ্চল

কলকাতার মঞ্চে ফিরে এল নান্দীকারের ‘পাঞ্চজন্য’

পরমাণু বিস্ফোরণের ব্যাপকতা দেখে বিজ্ঞানী ওপেনহাইমারের মনে পড়েছিল গীতার শ্লোকে উদ্ধৃত শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শনের প্রসঙ্গ। আর নান্দীকারের ৬৪তম জন্মদিনের শেষ লগ্নে ৮৯ বছরের ‘যুবক’ রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত বললেন “থিয়েটারে বিশ্বরূপ দর্শন হয়”। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে এই গোটা সন্ধ্যায় প্রতি পরতে যেন জড়িয়ে ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। যেমন ছিলেন রুদ্রবাবুর কথার প্রসঙ্গে, তেমনি ছিলেন মঞ্চস্থ হওয়া নাটক ‘পাঞ্চজন্য’-তেও।

এখন ভারতবর্ষে বিভিন্ন শিল্প মাধ্যমে যেমন করে মিথ-এর ভুল ব্যাখ্যা বারবার হয়ে চলেছে, সেই রকম একটি ক্ষেত্রে নান্দীকারের পাঞ্চজন্য বিরলতম নিদর্শন। এই নাটক আক্ষরিক অর্থেই শ্রীকৃষ্ণের পুনর্নির্মাণের নাটক, যেখানে কৃষ্ণ নিজে নিজেকে শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী ঈশ্বর হিসেবে দাবি করলেও তিনি নিজে জানেন তিনি একজন রক্ত মাংসের মানুষ। তিনি মানুষের সমস্ত দোষগুণের থেকে বাইরে নন। এই নাটকে কৃষ্ণ চরিত্রটি আদ্যপ্রান্তে একজন রাজনৈতিক চরিত্র, যার জীবনে প্রেম আসে কিন্তু প্রেমের থেকে বেশি সে গুরুত্ব দেয় রাজনৈতিক চেতনাকে। কৃষ্ণ গুরুত্ব দেয় ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রটিকে, গুরুত্ব দেয় গণতন্ত্রকে। কৃষ্ণের বিপ্রতীপে দাঁড়ায় কংস অথবা জরাসন্ধের মত চরিত্র। তবে নাট্যর আখ্যানের দিক থেকে কৃষ্ণের মুখ্য বিরোধী চরিত্র, অথবা বলা যায় সমান্তরাল চরিত্র গান্ধারী। এই নাটকের সব থেকে মজার জায়গা হয়তো এটিই, যে নাটকের গান্ধারী আছেন বলেই আমরা কৃষ্ণকে কৃষ্ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি।

গান্ধারী চরিত্রে সোহিনী সেনগুপ্ত

তবে যেটা সবথেকে বড়ো আকর্ষণের জায়গা ছিল প্রযোজনার এই নবতম রূপটির, সেটি অবশ্যই প্রয়াত স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত অভিনীত গান্ধারী চরিত্রটিতে সোহিনী সেনগুপ্তের অভিনয়। একই চরিত্রে দুজনের অভিনয়ের ক্ষেত্রে প্রথমিকভাবে যে ফ্যাক্টরগুলি ছিল, প্রথমত দুজনের বয়সের ভিন্নতা (যদিও এই মনে হওয়াটা সোহিনীকে মঞ্চে দেখার পর কেটে যায়) এবং দ্বিতীয়ত চরিত্রটিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। এ যেন লেডি ম্যাকবেথের চরিত্রে মিস সিডনস ও সারা বার্নহাটের দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যর মতো। গান্ধারীর চরিত্রে স্বাতীলেখা ছিলেন অনেকটা ধীর, পুত্রশোকে কাতর এবং অনেকটা ইন্টেন্সড। অন্যদিকে সোহিনী এই চরিত্রে অনেক বেশি চঞ্চল, শোকটা তার অভিনয়রীতির মধ্যে দিয়ে ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়, বাচিক অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তিনি স্বাতীলেখার অভিনীত চরিত্র থেকে সরে এসেছেন। স্বাতীলেখা মা-এর মতো অভিমানে নাটকটিকে এগিয়ে নিয়ে চলতেন, আর সোহিনী কৃষ্ণের প্রতিস্পর্ধী হয়ে নাটকটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। কৃষ্ণের ‘যথা ধর্ম তথা জয়’-এর নীতির বিপরীতে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকে গান্ধারীর ‘রক্তের বিনিময়ে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা হয় না’-র নীতি। পাঞ্চজন্য নাটক-এ সোহিনী সেনগুপ্ত একসময় রাধা-দ্রৌপদী-রুক্মিণী তিনটি চরিত্রেই অভিনয় করতেন, এখন যখন তিনি নিজের মায়ের জুতোয় পা গলালেন, তখন তিনি রেখে গেলেন এক স্বতন্ত্র অভিনয়ধারা, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে।

নাটকটির চলনে আছে কৃষ্ণ চরিত্রের একটি প্রচণ্ড স্ববিরোধ। দু-ঘণ্টা কুড়ি মিনিটের এই নাটকে প্রথম অংশ ছাড়া প্রায় সিংহভাগ জুড়েই কৃষ্ণের ঘটিয়ে যাওয়া এক একটি ঘটনাকে নাটকের শেষ অংশে কৃষ্ণের সামনে এসেই যখন খণ্ডিত হতে দেখা যায়, তখন দর্শক ভাবতে বাধ্য কোনটি ঠিক। কৃষ্ণ কি সত্যই ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার পথে হেঁটেছেন, নাকি হেঁটেছেন নিজেকে পলিটিক্যালি কারেক্ট রাখার পথে। এই প্রসঙ্গে নাটকে আসে যাদব সমবায় রাষ্ট্রের রাজা না হয়েও কেবল একজন সামান্য মন্ত্রী হিসেবে থেকেও কৃষ্ণের রাজাসুলভ আচরণ। আসে বিচারাধীন নারায়ণী সেনাকে কৌরবপক্ষে পাঠিয়ে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়ার প্রসঙ্গ। হয়তো গান্ধারীর অভিশাপেই, অথবা গ্রিক নায়কের পরিণতির মতোই কৃষ্ণের জীবনে নেমে আসে ভাগ্যবিপর্যয়, কৃষ্ণের অভিশাপে শাম্বের কুষ্ঠর ঘটনা।

কৃষ্ণ চরিত্রে সপ্তর্ষি মৌলিক

যখন ২০১৬ সালে ‘পাঞ্চজন্য’ প্রথম মঞ্চস্থ হয়, তখন আজকে যারা নান্দীকারের মোটামুটি পরিচিত মুখ, তাঁরা ছিলেন নবাগত। এ প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত নিজে, অভিনয় করতেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, পার্থপ্রতিম দেব (এই নাটকের নাটককার)। যখন সাত বছর পর নাটকটি পুনরায় নবরূপে দর্শকদের সামনে আসে, তখন নাটকটির সামগ্রিক রূপে অনেকটাই বদল চোখে পড়ে। রুদ্রবাবু শারীরিক কারণে অভিনয় না করলেও নাটকের একটি বড়ো অংশ শোনা যায় রুদ্রবাবুর গলা, যেটি রেকর্ডিং আকারে আসে। পার্থপ্রতিমের চরিত্রে অভিনয় করেন অয়ন ঘোষ। তবে যেটা সবথেকে বড়ো আকর্ষণের জায়গা ছিল প্রযোজনার এই নবতম রূপটির, সেটি অবশ্যই প্রয়াত স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত অভিনীত গান্ধারী চরিত্রটিতে সোহিনী সেনগুপ্তের অভিনয়। একই চরিত্রে দুজনের অভিনয়ের ক্ষেত্রে প্রথমিকভাবে যে ফ্যাক্টরগুলি ছিল, প্রথমত দুজনের বয়সের ভিন্নতা (যদিও এই মনে হওয়াটা সোহিনীকে মঞ্চে দেখার পর কেটে যায়) এবং দ্বিতীয়ত চরিত্রটিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। এ যেন লেডি ম্যাকবেথের চরিত্রে মিস সিডনস ও সারা বার্নহাটের দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যর মতো। গান্ধারীর চরিত্রে স্বাতীলেখা ছিলেন অনেকটা ধীর, পুত্রশোকে কাতর এবং অনেকটা ইন্টেন্সড। অন্যদিকে সোহিনী এই চরিত্রে অনেক বেশি চঞ্চল, শোকটা তার অভিনয়রীতির মধ্যে দিয়ে ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়, বাচিক অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তিনি স্বাতীলেখার অভিনীত চরিত্র থেকে সরে এসেছেন। স্বাতীলেখা মা-এর মতো অভিমানে নাটকটিকে এগিয়ে নিয়ে চলতেন, আর সোহিনী কৃষ্ণের প্রতিস্পর্ধী হয়ে নাটকটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। কৃষ্ণের ‘যথা ধর্ম তথা জয়’-এর নীতির বিপরীতে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকে গান্ধারীর ‘রক্তের বিনিময়ে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা হয় না’-র নীতি। পাঞ্চজন্য নাটক-এ সোহিনী সেনগুপ্ত একসময় রাধা-দ্রৌপদী-রুক্মিণী তিনটি চরিত্রেই অভিনয় করতেন, এখন যখন তিনি নিজের মায়ের জুতোয় পা গলালেন, তখন তিনি রেখে গেলেন এক স্বতন্ত্র অভিনয়ধারা, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে।

প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ

এছাড়াও অভিনয়ক্ষেত্রে যুবক কৃষ্ণের চরিত্রে সপ্তর্ষি মৌলিক নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। মূলত এই নাটক থেকেই অভিনেতা হিসাবে সপ্তর্ষির উত্থান, তিনিও যেন এই সন্ধ্যায় একটি বৃত্ত সম্পন্ন করলেন। রাধার ভূমিকায় নিবেদিতা, বৃদ্ধ কৃষ্ণের ভূমিকায় অয়ন, বলরামের ভূমিকায় অর্ঘ্য, জরাসন্ধের ভূমিকায় সৃজন যথাযথ। তবে কোরাস টিমের ক্ষেত্রে কিছু জায়গায় কিছু সমস্যা চোখে পড়ে। এছাড়া দর্শক হিসাবে একটা না পাওয়া থেকে যায় মঞ্চে লাইভ পার্থপ্রতিম দেবের গান না শুনতে পারার ক্ষেত্রে।

পাঞ্চজন্যর দুটি মূল বিষয় সংগীত ও আলো। এই গোটা নাটকের একটি বড়ো অংশ রেকর্ডেড হিসাবে আসে, তার মধ্যে যেমন আছে কিছু গান, শ্লোক ও মন্ত্র, আছে স্বাতীলেখা সেনগুপ্তের কণ্ঠস্বরও। এছাড়া সাধন পাড়ুই ও সমর পাড়ুই যে অলোক পরিকল্পনা করেছেন এই নাটকে, সেটি বাংলা থিয়েটারের ক্ষেত্রে একটি সম্পদ।

 

নাটকটির আরও একটি জোরের জায়গা এর সংলাপ। রাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত অনেক সংলাপ মনে রাখার মতো, তবে তার মধ্যে একটি সংলাপ যেটি এই ‘আদিপুরুষ’ বিতর্কের মাঝে আবার নতুন করে হৃদয়ে এসে ধাক্কা দেয়, সেটির কথা না বললেই নয়। গান্ধারী আর কৃষ্ণের কথোপকথনে গান্ধারি কথা প্রসঙ্গে বলেন – রাম লোভী ছিল, তাই নিজের স্ত্রীকে উদ্ধার করার জন্য হাজার হাজার সেনাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল, আবার সিংহাসনের লোভে নিজের সেই স্ত্রীকেই পরিত্যাগ করে রাম। দর্শক ব্যক্তিগতভাবে এই সংলাপকে সমর্থন করতেও পারেন, আবার না ও করতে পারেন, তবে একটি চরিত্রের এই ধরনের সংলাপ আজকের পরিস্থিতিতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলার জন্য কতটা স্বচ্ছতা লাগে সেটি আন্দাজ করা যায়।

এই নাটকে আগে গান্ধারীর চরিত্রে অভিনয় করতেন প্রয়াত স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত

সবশেষ এই কথাটি বলার, পাঞ্চজন্য সার্বিকভাবে কৃষ্ণের নাটক, নিজে কৃষ্ণ দেবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে, সেই মানুষ কৃষ্ণকে প্রচণ্ডভাবে খুঁজে পাওয়া যায় নাটকে। তবে তিনি যে রাষ্ট্রদর্শন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন, নাটকের শেষে যেন সেই রাষ্ট্রদর্শনটিই থেকে যায়, ব্যক্তি কৃষ্ণ সেখানে থাকেন না। যখন স্বাতীলেখা সেনগুপ্তের কণ্ঠস্বরে কানে আসে –

“ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্
নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে॥”

দর্শকদের মনে হয় কৃষ্ণদর্শনই যেন কৃষ্ণের আত্মা এবং এখানেই এই নাটকের সাফল্য। পাঞ্চজন্য-র আগামী অভিনয় ২৩ জুলাই (রবিবার) দুপুর আড়াইটে থেকে, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে।

_________________________________________
নাটক – পাঞ্চজন্য
নির্দেশনা – সোহিনী সেনগুপ্ত
প্রযোজনা – নান্দীকার

Developed by DXDasia